
ফেসবুকের যুগে জন্ম নেওয়া একজন তরুণ বা তরুণীর কাছে বিষয়টা হয়তো প্রায় অবিশ্বাস্য মনে হবে। এমন একটা সময়ও ছিল, যখন ভালো লাগার মানুষটির কোনো প্রোফাইল ছিল না, কোনো ইনবক্স ছিল না, তার ফোন ছিল না। এমনকি যদি তার বাড়িতে ফোন থেকেও থাকে সেই ফোন নম্বর জানা ছিল না। তবু মানুষ প্রেমে পড়ত। শুধু প্রেমেই পড়ত না, সেই প্রেমের জন্য অপেক্ষা করত, অস্থির হতো, বন্ধুদের সাহায্য নিত, চিঠি লিখত, মিথ্যা অজুহাত বানাত, আবার অনেক সময় কিছু না বলেই বছরের পর বছর কাউকে ভালোবেসে যেত।
ফেসবুক আসার আগে প্রেম আসলে একটু অন্যরকম ছিল। নাটকীয় অর্থে নয়, বাস্তব অর্থেই। কারণ তখন প্রেমের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সময়, দূরত্ব, অনিশ্চয়তা আর এক ধরনের সরলতা, যেটা আজকের ডিজিটাল যুগে ক্রমশ বিরল হয়ে উঠছে।
একটা পুরো প্রজন্ম প্রেমে পড়েছে এমন মানুষের, যাদের জন্মদিন তারা জানত না।
আজ এটা কল্পনা করা কঠিন। এখন একজন মানুষকে পছন্দ হলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার পছন্দের গান থেকে শুরু করে প্রিয় অভিনেতার নাম পর্যন্ত জেনে ফেলা যায়। অথচ নব্বইয়ের দশক বা দুই হাজার সালের শুরুর দিকে ভালো লাগার মানুষটি কোন বই পড়ে, কোন গান শোনে, এমনকি তার পুরো নাম কী—এসবও অনেক সময় জানা থাকত না।
জানা থাকত শুধু একটা ব্যাপার—তাকে দেখলে মনটা অদ্ভুত ভালো হয়ে যায়।
তখন প্রেমের সবচেয়ে বড় নোটিফিকেশন ছিল স্কুল ছুটির ঘণ্টা।
শেষ ক্লাসের দিকে ঘড়ির কাঁটা যেন একটু দ্রুত চলুক, এমন আশা নিয়ে বসে থাকত অনেকেই। কারণ গেটের সামনে হয়তো কয়েক সেকেন্ডের জন্য দেখা হবে। হয়তো কিছুই বলা হবে না। হয়তো শুধু বন্ধুদের সঙ্গে হেসে হেসে চলে যাবে মানুষটা। কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডের জন্যই কখনও কখনও পুরো দিন অপেক্ষা করা যেত।
স্কুল, কলেজ আর কোচিং সেন্টার তখন শুধু পড়াশোনার জায়গা ছিল না; ছিল অঘোষিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও। কে আজ এসেছে, কে আসেনি, কে নতুন চশমা পরেছে, কার চুল কাটা হয়েছে—এসব খবর ছড়িয়ে পড়ত অবিশ্বাস্য দ্রুততায়।
আর এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বন্ধু-বান্ধব।
ফেসবুকের আগে প্রেমের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি সম্ভবত বন্ধুই ছিল। কেউ খবর এনে দিচ্ছে, কেউ চিঠি পৌঁছে দিচ্ছে, কেউ ভুল সময়ে অভিভাবক চলে আসছে কি না সেদিকে নজর রাখছে। অনেক প্রেমের ইতিহাস লিখতে গেলে কয়েকজন বিশ্বস্ত বন্ধুর নাম আলাদা করে লিখতে হবে।

চিঠির কথা না বললে সেই সময়ের প্রেমের গল্পই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আজকের দিনে একটি মেসেজ লিখে পাঠাতে কয়েক সেকেন্ড লাগে। তখন একটি চিঠি লেখার জন্য অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় দিত। কী লিখবে, কীভাবে শুরু করবে, তুমি বলবে নাকি আপনি—এসব নিয়েও দ্বিধা থাকত।
আর বানান ভুল? সেটা ছিল প্রায় অবধারিত। অনেক প্রেমপত্রে একই শব্দ তিনবার তিনভাবে লেখা হয়েছে। কোথাও কালি ছড়িয়ে গেছে। কোথাও বাক্য অসম্পূর্ণ। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো, সেসব চিঠি মানুষ ফেলে দেয়নি। বছরের পর বছর ধরে রেখেছে। কারণ মানুষ আসলে নিখুঁত বাক্য মনে রাখে না, মনে রাখে আন্তরিকতা আর ভালোবাসা।
অনেকের বুকপকেটে ভাঁজ করা চিঠি দিনের পর দিন থেকেছে। অনেকের খাতার ভেতরে শুকিয়ে গেছে লাল গোলাপ। বাংলা দ্বিতীয়পত্র, হিসাববিজ্ঞান কিংবা পদার্থবিজ্ঞানের বইয়ের ভেতরে লুকিয়ে থেকেছে ব্যক্তিগত একেকটি ইতিহাস।
তখন প্রেম শুধু মানুষকে নয়, জিনিসকেও বিশেষ করে তুলত। একটি শুকনো ফুল, একটি বইমেলা থেকে কেনা বই, একটি ছোট কাগজের টুকরো কিংবা ঈদের শুভেচ্ছা কার্ড—সবকিছুর মধ্যেই জমা হতে পারত স্মৃতি।
আর ছিল ল্যান্ডফোন। এখনকার প্রজন্মের কাছে ব্যাপারটা কিছুটা হাস্যকরও লাগতে পারে। কারণ ফোনটি একজনের নয়, পুরো পরিবারের। ফলে ফোন করা মানেই এক ধরনের ঝুঁকি।
প্রথমে ভাবতে হতো কে ধরবে। তারপর ভাবতে হতো কী বলবে।তারপর ভাবতে হতো কে শুনছে।অনেক সময় যার সঙ্গে কথা বলার জন্য ফোন করা হয়েছে, তার সঙ্গে কথা বলার আগে বাড়ির আরও তিন-চারজনের সঙ্গে কথা বলতে হতো।
তবু মানুষ ফোন করত। কারণ তখন সরাসরি কথার গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। আজ আমরা সারাদিনে অসংখ্য মেসেজ পাঠাই। কিন্তু সেই সময়ে ত্রিশ সেকেন্ডের একটি ফোনকল নিয়েও সারাদিন খুশি থাকা যেত।
ফেসবুক-পূর্ব প্রেমের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত অপেক্ষা। চিঠির অপেক্ষা,ফোনকলের অপেক্ষা। ঈদের অপেক্ষা,বইমেলার অপেক্ষা।স্কুল খোলার অপেক্ষা,এমনকি বিকেল হওয়ার অপেক্ষাও।
আজকের দ্রুতগতির পৃথিবীতে অপেক্ষাকে অনেক সময় বিরক্তিকর মনে হয়। কিন্তু তখন অপেক্ষা ছিল অনুভূতিরই অংশ। অপেক্ষা না থাকলে হয়তো উত্তেজনাও থাকত না।
অবশ্য সেই সময়কে রূপকথা বানিয়ে ফেলারও কোনো কারণ নেই। ভুল বোঝাবুঝি ছিল, বিচ্ছেদ ছিল, অপূর্ণতা ছিল। অনেক প্রেম শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেছে। অনেক মানুষ কোনো দিন জানতেই পারেনি, যাকে সে পছন্দ করত, সেও তাকে পছন্দ করত কি না।
তবু ফেসবুকের আগের প্রেমের কথা উঠলে মানুষ বারবার ফিরে যায় সেই সময়টায়। হয়তো চিঠির জন্য নয়।হয়তো ল্যান্ডফোনের জন্যও নয়।
বরং সেই অনুভূতির জন্য, যখন একজন মানুষকে জানার জন্য তার প্রোফাইল নয়, তার উপস্থিতিই যথেষ্ট ছিল। যখন একটি স্কুল ছুটির বিকেল, বুকপকেটে ভাঁজ করা একটি চিঠি কিংবা খাতার পাতার ভেতর চাপা পড়ে থাকা একটি শুকনো ফুলও হৃদয়ের ভেতর অনেকটা জায়গা নিয়ে থাকতে পারত।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প















































