শনিবার । জুন ৬, ২০২৬
ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক আন্তর্জাতিক ৫ জুন ২০২৬, ৯:৪৭ অপরাহ্ন
শেয়ার

এক্সপ্লেইনার

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কি যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে, নাকি সমঝোতার পথে?


Trump Khomeni

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি

গেলো এপ্রিল মাসে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একের পর এক প্রস্তাব ও পাল্টা প্রস্তাব বিনিময় করে আসছে। তবে একই সঙ্গে উভয় দেশের নেতারাই বারবার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে প্রয়োজন হলে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করতেও প্রস্তুত।

৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পরও বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যা নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে।

শুক্রবার (৫ জুন) ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো আগ্রাসন চালানোর ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করবে ইরান।

গত কয়েক সপ্তাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা ও অবকাঠামোর ওপর হামলার ঘটনার পর তিনি এই মন্তব্য করেন। একই দিন ইরানের নৌবাহিনী জানায়, ওমান উপসাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের দিকে সতর্কতামূলক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, মার্কিন নৌবাহিনী বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাঙ্কার আটক করে সমুদ্রপথে হয়রানি চালাচ্ছে।

তাহলে এখন কোন সম্ভাবনা বেশি—শান্তি নাকি নতুন যুদ্ধ? চলুন দেখা যাক, দুই পক্ষ কী বলছে।

সাম্প্রতিক হামলাগুলো কোথায় হয়েছে?
গত বুধবার সকালে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কুনা জানিয়েছে। এতে হতাহত ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি বিমান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ওই হামলায় একজন ভারতীয় নাগরিক নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন।

তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, কুয়েতের দিকে ছোড়া দুটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় অথবা মাঝপথে ভেঙে পড়ে। তাদের দাবি, বেশ কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারেনি।

ইরানের তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানায়, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কুয়েতকে ইঙ্গিত করে বলেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে মার্কিন হেলিকপ্টার লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে তারা। তবে বিমানবন্দরের ক্ষয়ক্ষতি সরাসরি হামলায় হয়েছে নাকি ক্ষেপনাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের কারণে হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।

তাসনিম আরও দাবি করে, বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর ও একটি বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। যদিও সেন্টকম জানায়, এসব হামলা প্রতিহত করা হয়েছে এবং কোনো মার্কিন সেনা বা সম্পদের ক্ষতি হয়নি।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গোরুক ও কেশম দ্বীপে রাডার ও ড্রোন স্থাপনায় হামলা চালায়। কেশমে একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এছাড়া বেসামরিক জাহাজ লক্ষ্য করে পাঠানো কয়েকটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করার কথাও জানায় যুক্তরাষ্ট্র।

তেহরানের অভিযোগ, হরমুজ প্রণালির কাছে একটি ইরানি তেলবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে মার্কিন বাহিনী। এর জবাবে আইআরজিসি নৌবাহিনী ‘পানায়া’ নামের একটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে ইরানি গণমাধ্যম জানায়।

এর আগেও উপসাগরীয় অঞ্চলে বেশ কিছু উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে।

১৭ মে আবুধাবি কর্তৃপক্ষ জানায়, বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাইরের এলাকায় একটি ড্রোন হামলায় বিদ্যুৎ জেনারেটরে আগুন লাগে। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি এবং তেজস্ক্রিয়তার মাত্রাও স্বাভাবিক ছিল।

মে মাসের শুরুতে সংযুক্ত আরব আমিরাত অভিযোগ করে, তাদের ফুজাইরাহ বন্দরে ইরান ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে তিন ভারতীয় নাগরিক আহত হন এবং একটি তেল শোধনাগারে আগুন লাগে।

কখন যুক্তরাষ্ট্র ইঙ্গিত দিয়েছে যে সমঝোতা কাছাকাছি?
মার্কিন নেতারা একাধিকবার বলেছেন যে ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি চুক্তির কাছাকাছি রয়েছে অথবা যুদ্ধ দ্রুত শেষ হতে পারে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গেলো মঙ্গলবার কংগ্রেসে বলেছেন, ইরান যদি তার পারমাণবিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে পারে।

তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে।’

রুবিও আরও দাবি করেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি আলোচনায় ক্রমশ সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। ফেব্রুয়ারিতে তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় আহত হওয়ার পর থেকে তাকে জনসমক্ষে খুব কমই দেখা গেছে।

এদিকে গত ৬ মে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘তারা চুক্তি করতে চায়। গত ২৪ ঘণ্টায় খুব ভালো আলোচনা হয়েছে। চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।’

ইরান কি সমঝোতার ইঙ্গিত দিয়েছে?
শুক্রবার সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) এক বৈঠকের ফাঁকে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি এবং ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির বৈঠক হয়।

পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দুই মন্ত্রীই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন।

২২ মে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির তেহরান সফর করে ইরানি নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সেসময় বলেছেন, এর অর্থ এই নয় যে পরিস্থিতি কোনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

২৮ মে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) পৌঁছেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়। এতে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো এবং স্থায়ী শান্তি আলোচনার কাঠামো তৈরির কথা বলা হয়। তবে ওয়াশিংটন বা তেহরান কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে এ তথ্য নিশ্চিত করেনি।

এরপরও দুই পক্ষের মধ্যে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ চলতে থাকে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প তার সহযোগীদের বলেছেন, ইরানের হামলায় কোনো মার্কিন সেনা নিহত হলে তিনি যুদ্ধবিরতি বাতিলের কথা বিবেচনা করবেন। তবে তিনি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে অনাগ্রহী বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র কি আবার সামরিক অভিযানের হুমকি দিয়েছে?
১৯ মে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ‘আমরা এমন কোনো চুক্তি করব না যাতে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ পায়। আমরা প্রস্তুত আছি। আমরা যুদ্ধ চাই না, কিন্তু প্রয়োজন হলে প্রেসিডেন্ট পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।’

১৭ মে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ‘ইরানের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে তাদের জন্য আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

২০ এপ্রিল পিবিএস নিউজের এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেলে ‘তখন চারদিকে বোমা বিস্ফোরণ শুরু হবে।’

ইরান কি আবার সংঘাতের ইঙ্গিত দিয়েছে?
শুক্রবার আব্বাস আরাঘচি বলেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্রধারী শক্তির বিরুদ্ধে ৪০ দিন দাঁড়িয়ে থাকা কোনো সহজ বিষয় নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আঞ্চলিক দেশগুলোকে সতর্ক করেছি যে ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় ব্যবহৃত মার্কিন ঘাঁটিগুলো বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে।’

ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ মঙ্গলবার লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরির সঙ্গে আলোচনায় বলেন, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকলে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা থেকে সরে এসে মুখোমুখি সংঘাতের পথেও যেতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই একদিকে কূটনৈতিক আলোচনার দরজা খোলা রেখেছে, অন্যদিকে সামরিক প্রস্তুতি ও পাল্টা হুমকিও অব্যাহত রেখেছে। ফলে শান্তি চুক্তি ও নতুন সংঘাত—দুই সম্ভাবনাই এখনো সমানভাবে বিদ্যমান বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।