
গোটা অনুষ্ঠানজুড়েই মনের মধ্যে বাজছিলো কথাগুলো। যেনো আবু হেনা মোস্তফা কামালের সেই কবিতার মতো করেই বলি, আপনাদের সবার জন্যে এই উদার আমন্ত্রণ, সাহিত্যের এই জমজমাট আসরে একবার ঘুরে যান। আয়োজনের এমন নিখুঁততা, বিষয়ের এমন বৈচিত্র্য আপনি ডিএমভি’র আর কোনো আয়োজনে পাবেন না। সত্যিই তাই! কবিতার সাথে’র উদ্যোগে ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই ‘বাংলা সাহিত্য উৎসব ২০২৬’ ছিলো প্রাণবন্ত এক উৎসবমুখর আয়োজন। আমরা অনেকেই তা উপভোগ করেছি। মূল উৎসব ৩০ মে (শনিবার) হলেও আগের রাতেই (২৯ মে) সন্ধ্যায় যে প্রারম্ভিক হয়ে গেলো তাতে অভ্যাগত অতিথিরা বুঝে নিলো, এবারের সাহিত্য আসর এক নতুন মাত্রা যোগ করবে। রাতেই আসর জমে উঠলো গান কবিতাসহ নানাবিধ পরিবেশনায়। সে সবের মধ্য দিয়ে নতুন কবির পরিচয় যেমন মিললো, চেনা হলো নতুন নতুন আরও অনেক প্রতিভাবানদের। সর্বোপরি তারা সকলেই সাহিত্যপ্রেমি মানুষ।
প্রযুক্তিবিদ শিক্ষা উদ্যোক্তা, ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির চ্যান্সেলর আবুবকর হানিপের লেখা কবিতা ‘ডিফ্রেন্ট শেডস, সেম সোলস’ পাঠের মধ্য দিয়ে জানা হলো তার কবিতা প্রতিভার কথা। অপর প্রযুক্তিবিদ, শিক্ষক ও উদ্যোক্তা ড. ফয়সল কাদেরের গানের ভক্ত কে- না এই ডিএমভি’তে (ডিসি, মেরিল্যান্ড, ভার্জিনিয়া)। তিনি শোনালেন তার সুললিত কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত, আধুনিক গান।
হলো নতুন বই এর মোড়ক উন্মোচন। ফরহাদ হোসেন, ড. হাসান মাশরিকী, অনামিকা নেওয়াজ, আবু লিয়াকত হোসাইন, ডা. গৌতম দত্ত, সামছুদ্দীন মাহমুদ তাদের বই নিয়ে ছিলেন মঞ্চে। উন্মোচন করলেন আনোয়ার ইকবাল কচি, কবিতা দিলাওয়ার, রোকেয়া হায়দার, সাদাত হোসাইন, আহমাদ মাযহার ও সরকার কবির উদ্দিন। কবিতা পড়লেন ভার্জিনিয়া পপি, ইনশা হক, মাহমুদ মেনন, ড. তানজিনা নওশিন, সৈয়দ হাই ও ফরিদা ইয়াসমিন। সঞ্চালনায় ছিলেন অ্যান্ড্রু বিরাজ।
রাতের খাবারে ছিলো পুরো বাঙালিয়ানা। সে অনুষ্ঠানের গালভরা নাম- মিট অ্যান্ড গ্রিট। শেষ হলো রাত ১১টা নাগাদ।
সাধারণ ডিএমভিবাসী অবশ্য তখনও অপেক্ষায়। পরের দিন সকাল থেকেই আয়োজকরা অনুষ্ঠানস্থলে হাজির। প্রধান আয়োজক কবিতা দিলাওয়ার ও আনোয়ার ইকবাল কচির নেতৃত্বে বেশ একটা বড় দল কাজ করছিলো এই আয়োজনে। একটি গোছানো আয়োজনের জন্য সকলের মেধা ও শ্রমের ব্যবহার ছিলো চোখে পড়ার মতো। সেই কবে থেকেই দলটি একতাবদ্ধ হয়ে, সকল কাজ এগিয়ে নিয়ে মূল অনুষ্ঠান পর্যন্ত নিয়ে আসে। এরপর মূল আয়োজন সম্পন্ন হওয়ার দিন সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠায় তা সফলতায় রূপ নেয়। যা নেপথ্য কারিগর হিসেবে কাজ করছিলেন ভার্জিনিয়ায় অতি পরিচিত মুখ দিলাওয়ার হোসেন। আর পুরো আয়োজন মঞ্চ, শব্দ ও আলোকসজ্জ্বায় ছিলেন জামিল আহমেদ।

মঞ্চ যখন প্রস্তুত হচ্ছিলো নানাবিধ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার জন্য, ওদিকে অনুষ্ঠানস্থলে হলের চারিদিকে বসে পড়ে বইয়ের স্টল। সাহিত্য উৎসবে বই বেচাকেনা প্রধান অনুসঙ্গ। তাই বাংলাদেশ থেকে পারি জমিয়ে এসেছিলো বাতিঘর, অন্যপ্রকাশ, ইউপিএল’র মতো প্রকাশনী সংস্থাগুলো। যুক্তরাষ্ট্রে সুপরিচিত নিউইয়র্কভিত্তিক মুক্তধারা সাজিয়েছিলো বইয়ের বিশাল পসার। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন এসময়ে তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় লেখক কবি সাদাত হোসাইন। এসেছিলেন বিশেষ অতিথি হয়ে ফিলিপস পুরস্কারজয়ী স্বনামধন্য সাংবাদিক আশরাফ কায়সার। লেখক আহমেদ মাযহার, অভিনেত্রী শিরিন বকুলসহ আরও অনেকেই।
তাদের সকলের উপস্থিতি আর ডিএমভির সাহিত্যপ্রেমি মানুষের পদভারে মুখরিত ছিলো গোটা অনুষ্ঠানাঙ্গন। ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির বড় মিলনায়তন ৩০ মে সকাল থেকেই ভরে উঠতে শুরু করে। অনুষ্ঠান শুরু হয় সকাল ১১টায়। সকলকে শুভেচ্ছা ও স্বাগত জানান প্রধান দুই আয়োজক কবিতা দিলাওয়ার ও আনোয়ার ইকবার। কিন্তু যখনা আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি, কিংবা কি শোভা কি ছায়া গো কি স্নেহ কি মায়া গো পরিবেশনা চলছিলো মঞ্চে এক দল সঙ্গীত শিল্পীর গলায় তখন দর্শক সারির সকলেই তাতে কণ্ঠ মেলান। তাদের চোখে মুখে যেনো ফুটে ওঠে সেই বাংলা মায়ের আচল বিছানো বটের মূল নদীর কূল। আর এরপরই যখন আবার পরিবেশিত হয় ‘ ও সে ক্যান ইউ সি, বাই দ্য ডন’স আর্লি লাইট, হোয়াট সো প্রাউডলি উই হেইল’ড অ্যাট দ্য টোয়ালাইট’স লাস্ট গ্লিমিং…’ মাহদিয়া ইশাল নামের তন্বি মেয়েটি কি যে দারুণ মর্মস্পর্শী কণ্ঠে গাইলো সে গান, আর সকলেই বুকে হাত চেপে পরম ভালোবাসায় ও শুনলো কিংবা কণ্ঠ মেলালো। সকালের আলো যেমন বলে দেয় দিনটি কেমন যাবে, তেমনি দুটি জাতীয় সঙ্গীতের পরিবেশনায় গোটা আয়োজনের মান নির্ধারণ করে দিলো। আর দর্শক অপেক্ষা করতে থাকলো তারই বাস্তব রূপ দেখবে বলে। শুরু হলো বাংলা সাহিত্য উৎসব ২০২৬। মোমবাতি প্রজ্জ্বলন হলো। ছিলো ফিতে কাটার আনুষ্ঠানিকতাও। বিশাল বই থেকে খুলে আনা ফিতে কেটে সে আনুষ্ঠানিকতা পূর্ণ করলেন প্রধান অতিথি সাদাত হোসাইন। মঞ্চে তখন বিশিষ্ট জনদের উপস্থিতি। প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথিদের সঙ্গে আরও ছিলেন ইকবাল বাহার চৌধুরী, রোকেয়া হায়দার, ড. আবদুন নূর, আবুবকর হানিপ, আনিস খান, একুশে পদকপ্রাপ্ত চিত্রশিল্পী রোকেয়া সুলতানা, তরুণ কবি তারফিয়া ফয়জুল্লাহসহ অন্য অভ্যাগত অতিথিরা। ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ধারার রাজনীতিতে অগ্রণী তরুণ স্টেট সেনেটর সাদ্দাম আজলান সেলিম। ভার্জিনিয়া স্টেটের পক্ষ বাংলা সাহিত্য উৎসবের এই আয়োজনকে সম্মানিত করতে ও স্বীকৃতি দিতে তিনি তুলে দিলেন সিনেট রেজুলেশন স্মারক। আয়োজনের মূল উদ্যোক্ত কবিতা দিলাওয়ারের হাতে স্মারক তুলে দেওয়ার আগে নিজেই তা পড়ে শোনালেন উপস্থিত দর্শকদের। প্রবাসে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চায় যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারা থেকে এমন স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে এই আয়োজনকে করে তোলে অনন্য।
গোটা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানজুয়ে ব্যাকস্টেজে বেজে চলছিলো গান ‘আমি বাংলায় গান গাই’। স্বপ্নীল সজীবের গাওয়া এই গানের মাঝে মাঝেই ভেসে আসছিলো পাঠ। সে কণ্ঠ কবিতা দিলাওয়ারের। এই বিশেষ সংযোগটি পুরো আয়োজনকে বাড়তি মাত্রা দেয়।
এরপর অনুষ্ঠানমালা এগিয়ে চলে। একের পর এক পরিবেশনা। শুরুতেই গীতি আলেখ্য, ‘আবহমান এই বাংলায়’। পরিবেশনায় ছিলো ‘ইছামতি’। ক্লিমেন্ট স্বপন গোমেজের নেতৃত্বে সংগঠনটির একটি বড় দল একের পর এক গান পরিবেশন করলো। ওরে ও তরুণ ইশান বাজা তোর প্রলয় বিষাণ, রক্ত নিশাণ উড়ুক প্রাচীণ প্রাচীর ভেদী। কার না শরীর চনমন করে ওঠে এই গানে। পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির প্রেসিডেন্ট ড. হাসান কারাবার্ক। গান শুনেই জানতে চাইলেন- ইজ ইট সামথিং রেবেলিয়াস?’ গানের জন্য কোনো ভাষা লাগে না- গান নিজেই এক ভাষা যা কেউ শুনেই বুঝতে পারে।

গীতি আলেখ্যর এই পর্বে উপস্থাপনায় ছিলেন তানিয়া পাটওয়ারি ও সুমন সামসুদ্দিন। গানের শেষে আলোচনা। বাংলার বাইরে বাংলা সাহিত্য। দীর্ঘকাল নিউইয়র্কে বসবাস আহমদ মাযহারের। তিনি ছাড়া এই আয়োজনের আলোচক আর ভালো কে-ই হবেন। সঞ্চালনায় ছিলেন আরেক বাংলার পণ্ডিত, জর্জ মেসন ইউনির্ভাসিটির শিক্ষক ড. আমীনুর রহমান। সুতরাং আলোচনা জমে উঠলো, হলো উপভোগ্যও।
গান-আলোচনার পরেই নাচ। নাচের জন্য জীবনানন্দকে বেছে নেওয়ার ঘটনা কদাচই দেখা যায়। কিংবা যায়ই না। কিন্তু সৃষ্টি নৃত্যাঙ্গন সেটাই করলো। এদেশে জন্ম নেয়া বেড়ে ওঠা ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা নাচলো রোজমেরি মিতু রেবেইরো পরিচালনায়। তারা নাচলো সুন্দর সূবর্ণ তারুণ্য লাবন্য
দেশে বই মেলায় ম্যালা বই বের হয়। তা নিয়ে আলোচনাও কম বেশি হয়। কিন্তু প্রবাসী কারো বই যদি একুশে বইমেলার আসে তা নিয়ে আলোচনা হয় না সেটা ধরেই নেওয়া যায়। কিন্তু আয়োজন যখন বিদেশেরই মাটিতে তখন এই বিদেশ বিভূইয়ে থাকা মানুষগুলো (সম্মানিত লেখক, কবি, সাহিত্যিক) যখন তাদের নতুন বই এনেছেন সেগুলো নিয়ে বাড়তি আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস আয়োজকদের শুরু থেকেই ছিলো। তাই নতুন বইয়ের আলোচনার জন্য ‘লেখক আলোচক মুখোমুখি’ পর্বটি ছিলো বেশ জমজমাট।
নতুন বই: লেখক-আলোচক মুখোমুখি নামের পর্বটি তিনটি ভাগে উপস্থাপিত হলো। প্রথম পর্বে রিয়াজুল মজুমদারের “দ্য ওয়েট আই ক্যারি” নিয়ে আলোচনা করলেন জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ নকিবউদ্দিন। রওশন হকের “তবুও ফেরা হয় না” নিয়ে তারই মুখোমুখি হলেন আলোচক ড. হাসান মাশরিকী। ফরহাদ হোসেনের “ভালোবাসা না বিভ্রম” নিয়ে আলোচনায় ছিলেন: মোস্তফা তানিম।

অনুষ্ঠানস্থলে এসেছিলেন আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল। তিনি শোনালেন তার সাইকেলে বিশ্বভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা।
আগেই বলেছি নামকরা প্রকাশণী সংস্থাগুলোও এসেছিলো এবারের সাহিত্য উৎসবে তাদের বই নিয়ে। বিকিকিনিই কেবল তাদের উদ্দেশ্য নয়। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণও ছিলো তাদের আগ্রহের। তাদের নিয়েই পর্ব ছিলো ‘লেখকের প্রশ্ন, প্রকাশকের উত্তর’। তাতে অংশ নেন ইউপিএলের শামারুখ মহিউদ্দিন, বাতিঘরের রাশেদ জাফর আহমেদ, অন্যপ্রকাশের অনামিকা নেওয়াজ, মুক্তধারার বিশ্বজিৎ সাহা ও বিদ্যাপ্রকাশের মজিবর রহমান খোকা। উপস্থাপনায় ছিলেন ড. হাসান মাশরিকী ও ফরহাদ হোসেন।
পরপরই অনুষ্ঠিত হয় নতুন বই: লেখক-আলোচক মুখোমুখি’র দ্বিতীয় পর্ব। এই পর্বে তাহমিনা কবিরের দ্য থ্রেডস অব মাইন্ড নিয়ে আলোচনা করেন অ্যান্থনি পিউস গোমেজ। হাসান মাশরিকীর ‘তুষার শুভ্র ভালোবাসা’র আলোচক ছিলেন ড. মোহাম্মদ নকিবউদ্দিন এবং এইচ বি রিতার ‘সোফিয়া’ নিয়ে আলোচনা করেন দিনা ফেরদৌস।
কবির কবিতা আবৃত্তি শিল্পীরা পাঠ করেন কিন্তু কবিকে কদাচই দেখা যায় নিজের কবিতা পড়তে। বাংলা সাহিত্য উৎসব সেটাই করলো। পর্বের নাম কবিকণ্ঠে ‘শব্দের দীপাবলি’। প্রধান অতিথি সাদাত হোসাইন ছাড়াও কবিতা পড়লেন তারফিয়া ফয়জুল্লাহ, এইচ বি রিতা, মোস্তফা তানিম, আনোয়ার ইকবাল, ড. আমীনুর রহমান, আনিস খান, আহসান জামান, কুলসুম আক্তার সুমি, আহমেদ সায়েম, ফাতেমা সিদ্দিক, গৌতম দত্ত, অনামিকা নেওয়াজ ও ইশতিয়াক রুপু। এই পর্বের সঞ্চালনায় ছিলেন লিপি দেওয়ান ও এন্ড্রু বিরাজ।
নতুন বই: লেখক-আলোচক মুখোমুখি’র তৃতীয় পর্বে ইব্রাহীম চৌধুরীর ‘মক্কা থেকে মারাকেশ’ নিয়ে আলোচনা করলেন স্থপতি লেখক আনোয়ার ইকবাল। সামছুদ্দীন মাহমুদের ট্রাঙ্কুইট ভ্যালি নিয়ে আলোচনা করেন শিক্ষক, সাংবাদিক মাহমুদ মেনন আর আশরাফ কায়সারের ‘আধা’ নিয়ে আলোচনা করেন ড. আমীনুর রহমান।
আলোচনা শেষে আবার গান। কিন্তু এসবের ফাঁকে ফাঁকে প্রত্যেক কবি, সাহিত্যিক, আলোচককে সম্মানিত করা হয় বাংলা সাহিত্য উৎসবের পক্ষ থেকে। পরিয়ে দেওয়া হয় উত্তরীয়। অভ্যাগত অতিথিরাও বাদ পড়েননি। তাদেরও মঞ্চে ডেকে সম্মানিত করা এবং তাদের মুখ থেকেই সাহিত্য বিষয়ে তাদের বক্তব্য, আয়োজন বিষয়ে তাদের উপলব্দি শোানারও সুযোগ হয় দর্শকদের। উত্তরীয় পরাতে কখনো মঞ্চে আসেন প্রধান আয়োজক কবিতা দিলাওয়ার, কখনোবা প্রধান অতিথি সাদাত হোসাইন।
‘দাঁড়ালে দুয়ারে মোর’ শিরোনামে গানের আসরে ছোট্ট মেয়ে মাহদিয়া ইশাল দর্শক মাত করে রাখলো বেশ খানিকটা সময়। নজরুল গীতি গেয়ে শোনালো পরদেশি মেঘ যাও রে ফিরে কিংবা কী দিয়ে জুড়াই ব্যথা, কেমনে কোথায় রাখি, কোন প্রিয় নামে ডাকি? দাঁড়ালে দুয়ারে মোর কে তুমি ভিখারিনী… শ্রোতার মাঝে ফিসফিস- মেয়েটির কণ্ঠে যাদু আছে।

গানের রেশ কাটতে না কাটতেই আবার আলোচনা- ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ’। সাহিত্য জগতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কতটা প্রভাব এরই মধ্যে ফেলেছে কিংবা ভবিষ্যতে কি হতে যাচ্ছে তার নান দিক উঠে আসে মোস্তফা তানিম, শামারুখ মহিউদ্দিন ও ডা. গৌতম দত্তের আলোচনায়।
লিপি দেওয়ানের সঞ্চালনায় ‘নতুন মাটি, নতুন ভাষা’ শিরোনামে যে অনুষ্ঠানটি হয়ে গেলো তাতে অংশ নিলেন নতুন প্রজন্মের আরেক প্রতিভা তারফিয়া ফয়জুল্লাহ। বললেন, কবিতা এখনও মাঝে মাঝে তার কাছে আসে। সৃষ্টিশীলতা নিয়ে এই দামী কথাটি মনে গেঁথে থাকবে বহুদিন।
আর পরপরই “মৃতের স্ফুলিঙ্গ” শিরোনামে সমস্বর আবৃত্তি সংগঠনটির যে পরিবেশনাটি হয়ে গেলো তাতে ফের মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়লো দর্শক সারিতে। অদিতি সাদিয়া রহমান ছিলেন যার পরিচালনায়।
অতিথিদের মধ্যে প্রধান দুই ব্যক্তিত্ব আশরাফ কায়সার ও সাদাত হোসাইন দু’জনের এসব আয়োজনে কখনো দর্শক সারিতে বসে। কখনোবা বইয়ের স্টলগুলোতে ঘুরে ঘুরে ক্রেতা তথা ভক্তদের অটোগ্রাফ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এবার তাদের মঞ্চে দেখা গেলো ‘কলমের দুই ধারা: সাহিত্য ও সাংবাদিকতা’ এই শীর্ষক আলোচনায়। দুজনই তাদের স্বভাবসুলভ দর্শকগ্রাহ্য ভঙ্গিমায় যে যার পক্ষের কথাগুলো বলছিলেন। দর্শক প্রিয়তা পেয়েছে সে আলোচনাও।
ততক্ষণে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। মঞ্চে আবৃত্তির আরেকটি পরিবেশনা হললো আবৃত্তিকথার সাথে সাথে। পরিবেশনায় ছিলেন রেজা অনিরুদ্ধ ও সিলিকা কনা। এরপরপর আবার মঞ্চ মাতিয়ে সুরের লহরী “প্রতিধ্বনির পথে”। গাইলেন ক্লেমেন্ট স্বপন গমেজ।
নতুন বই: লেখক-আলোচক মুখোমুখি’র তখনও একপর্ব বাকি। এ পর্যায়ে সে উপস্থাপনায় মঞ্চে এলেন জিয়াউদ্দিন চৌধুরী তার “অস্থির সময়” নিয়ে। আলোচনা করলেন ড. নজরুল ইসলাম। গৌতম দত্তের “সময়ের গীত” নিয়ে আলোচনা করলেন লিপি দেওয়ান। আর অনামিকা নেওয়াজের “নক্ষত্র ফুল” নিয়ে আলোচনা করলেন স্বয়ং সাদাত হোসাইন।
শেখ মাওলা মিলন ভার্জিনিয়া-মেরিল্যান্ড বাসীর কাছে একটি প্রিয় নাম। তার “বেনুর হিয়া” শীর্ষক পরিবেশনা কখন হবে সে নিয়ে অপেক্ষার পালা শেষ হলো। তিনি গেয়ে শোনালেন বেশ কটি জনপ্রিয় গান। বেনুর হিয়া’য় ছিলো গানের সাথে কবিতা। পাঠ করেন প্রজ্ঞা আহমেদ। পরিচালনায় ছিলেন তালহা রহমান।
শ্রুতি নাটক “রক্তকরবী”র জন্য দর্শকের অপেক্ষা ছিলো। কারণ এতে তারা দেখতে পান তাদের সকলের প্রিয় অভিনেত্রী, এক সময় বাংলাটেলিভিশন নাটকের জনপ্রিয় মুখ শিরিন বকুলকে। সঙ্গে ছিলেন অপর অভিনেতা রেজা অনিরুদ্ধ।
এভাবেই গল্প-কবিতা-গান-নাচ-নাটকে দিনটি ছিলো ভরপুর। কিন্তু দর্শকের আগ্রহ তাতেও শেষ নেই। আয়োজকদের পরিবেশনার ডালিতে তখনো জমেছিলো আকর্ষণীয় কিছু। এ পর্যায়ে মঞ্চে দেখা গেলো কবিতা দিলাওয়ার ও সাদাত হোসাইকে। অনুষ্ঠানের নাম “সাদাতের গল্পঘরে পাঠক”। পাঠক হিসেবে উপস্থাপক নিজেই প্রশ্নে প্রশ্নে খুললেন জনপ্রিয় এই গল্পকারের গল্পের অন্দরমহল।
অবশেষে অদিতি মহসিন। রাত নেমে এলেও দর্শকে তখন হলরুম কানায় কানায় পূর্ণ। মঞ্চে উঠে এলেন ড. ফয়সাল কাদের। অদিতি মহসিনের পরিচয় পাঠ তথা তাকে মঞ্চে তুলে আনার গুরু দায়িত্ব ছিলো তারই হাতে। সেটা যখন হয়ে গেলো তখন আর বাকি শুধু গান। সবশেষে গাইলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনন্য সৃষ্টি ‘তবু মনে রেখো’। সেই ১৮৮৭ সালে লেখা কবিতা ও গানটি বিরহ, প্রেম এবং না-পাওয়ার এক গভীর আকুলতা প্রকাশ করে যা স্পষ্ট করে ফুটে উঠলো অদিতি মহসিনের কণ্ঠে। দর্শক স্রোতা সেই সুর কানে নিয়ে ধীরে ধীরে অনুষ্ঠানস্থল ছাড়তে শুরু করলো।
কবিতা দিলাওয়ার মঞ্চে উঠে শিল্পীকে উত্তরীয় পরিয়ে দিলেন। সাঙ্গ হলো সাহিত্য উৎসবের ২০২৬ এর আয়োজন। হলফ করে বলতে পারি, আগামী বছরের আয়োজনের জন্য সকলেই অপেক্ষা করবে। আমিও করবো।
বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজ্যুয়াল
















































