সোমবার । জুন ৮, ২০২৬
মোকাদ্দেস-এ-রাব্বী খেলা ৮ জুন ২০২৬, ৪:৩৩ অপরাহ্ন
শেয়ার

ওয়ার্ল্ডকাপ স্পেশাল

বিশ্বকাপের যত বল


Trionda c

গোল, গোল, গোলাকার ফুটবল গোলাকার। ফুটবল খেলায় দর্শক, খেলোয়াড় এমনকি রেফারির চোখ সবচেয়ে যে জিনিসটির দিকে বেশি থাকে সেটি হলো ফুটবল। ফুটবল গোলপোস্টের জালে জড়িয়ে গেলে গোল হয়। গোল হলেই আনন্দে কেঁপে উঠে গ্যালারি, হৈ-হুল্লোড় করে দর্শক। গোল, গোল চিৎকার আর আনন্দে নাঁচার দিন শুরু হচ্ছে আবার। আসছে ১১ জুন ২০২৬ হতে শুরু হচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপ। এবার ৪৮ দল খেলবে বিশ্বকাপ জেতার জন্য। এই বিশ্বকাপে জেতার জন্য এই ৪৮ দল ফুটবল নিয়ে ছুটবে সারা মাঠ। সেই ফুটবলের কিছু গল্প জেনে আসা যাক।

প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপ হয় ১৯৩০ সালে। বিশ্বকাপ শুরুর সময় যে ফুটবল দিয়ে খেলা হতো সেগুলো ছিল অনেকটা ভলিবলের মত। তা দিয়েই চলেছে ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত মোট সাতটি বিশ্বকাপ। এরপর ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো বিশেষ ধরনের ফুটবল ব্যবহার করা হয়। যাকে অফিসিয়াল বল বলে অভিহিত করা হয়েছে। এরপর নিয়মিত অফিসিয়াল বল ব্যবহার করা হচ্ছে বিশ্বকাপ এবং প্রতিটি বিশ্বকাপেই আলাদা আলাদা বল ব্যবহৃত হচ্ছে। ১৯৭০ থেকে এই ফুটবল তৈরির দায়িত্ব নেয় জার্মানির বহুজাতিক কোম্পানি অ্যাডিডাস। এবারের বলটিও বানিয়েছে অ্যাডিডাস। এ নিয়ে টানা ১৫ বারের মতো ফিফা বিশ্বকাপের বল সরবরাহ করছে বিশ্ববিখ্যাত ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুুতকারক এই প্রতিষ্ঠান।

বলগুলোকে অফিসিয়াল বল হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও প্রতিবছরই বলগুলোর কিছু বিশেষত্ব থাকে সেই সাথে থাকে আলাদা একটি করে নামও। যেমন চলতি ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে যে বল ব্যবহার করা হবে তার নাম হলো ‘ট্রিওন্ডা’।

১৯৭০- টেলস্টার
১৯৭০ সালে ব্যবহৃত বলটির নাম ছিল টেলস্টার। টেলিভিশন স্টারকে সংক্ষিপ্ত করে টেলস্টার নাম দেওয়া হয়েছিল। তখন ছিল সাদা কালো টেলিভিশনের যুগ। যে কারণে সাদা-কালো টেলিভিশনে যেন দেখার উপযোগী হয় সেই চিন্তা করে তৈরি হয়েছিল এই বলটি। এটি নিশ্চিত করার জন্য যে খেলা চলাকালীন সময়ে যেন টেলিভিশন দর্শকরা বুঝতে পারে মাঠের কোথায় বলটি রয়েছে। এই বলটিই মূলত পরবর্তীতে ফুটবলের প্রচলিত ডিজাইন হয়ে ওঠে।

১৯৭৪- টেলস্টার ডার্লাস্ট
১৯৭০ বিশ্বকাপের বল টেলস্টারের মতো একই ধরনের আর একটি বল তৈরি করা হয়। নামটি একটু পরিবর্তন করে টেলস্টার এর সংগে ডার্লাস্ট যুক্ত করে নাম রাখা হয়েছিল টেলস্টার ডার্লাস্ট।

১৯৭৮- ট্যাঙ্গো
১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপের জন্য তৈরি করা হয় ট্যাঙ্গো নামের বিশেষ বল। ট্যাঙ্গো ১৯৭৮ বিশ্বকাপের আগে গত হয়ে যাওয়া বিশ্বকাপ ফুটবল গুলোর চেয়ে একটু দামি বল ছিল।

১৯৮২- ট্যাঙ্গো ইস্পানা
১৯৮২ সালে মূলত ১৯৭৮ সালের ট্যাঙ্গো বলটাকেই একটু উন্নত করে তৈরি করা হয়। নামেও ভিন্নতা থাকে যে কারণে। নাম দেয়া ট্যাঙ্গো ইস্পানা।

১৯৮৬- এজটেক
১৩০০ থেকে ১৫২১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়কালে অধুনা মধ্য মেক্সিকোর ভূখন্ডে বিকাশ লাভ করা একটি মেসোআমেরিকান সভ্যতা। সেই সভ্যতার নাম এজটেক সভ্যতা। ১৯৮৬ সালে তৈরি করা বিশ্বকাপ ফুটবলের নাম দেয়া এজটেক। মেক্সিকোর এই প্রাচীন সভ্যতা এজটেকের ইতিহাস ঐতিহ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল এই বলের গায়ে।

১৯৯০- এট্রুসকো ইউনেকো
১৯৯০ সালের বিশ্বকাপের বলের নাম এবং নকশা প্রাচীন ইতালির ইতিহাস এবং এট্রুস্কানদের জুতা শিল্পের সম্মানে উদ্ভাবিত হয়েছিল। বলের নকশায় ব্যবহৃত ২০টি ট্রায়াডের প্রতিটিতে তিনটি হেড এট্রুস্কি সিংহ শোভা পায়। ইতালির এট্রুস্কান সভ্যতার নিদর্শন ফুটিয়ে তোলা হয় এই বলে। নাম দেয়া হয় এট্রুককো ইউনেকো।

১৯৯৪- কায়েস্ত্রো
১৯৯৪ বিশ্বকাপের বলের নাম দেয়া হয় কায়েস্ত্রো। কায়েস্ত্রো মানে হচ্ছে তারার খোঁজে।

Trionda Inner

১৯৯৮- ট্রাইকালার
বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো রঙ্গিন ফুটবল দেখে বিশ্ব। এর আগের বিশ্বকাপ গুলো নকশা ভিন্ন ভিন্ন হলেও সব গুলো বল ছিল সাদা কালো। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে এই ফুটবলের নাম ছিল ট্রাইকালার। ফ্রান্সের পতাকার তিনটি রং দিয়ে এই বলটির নকশা করা হয়েছিল।

২০০২- ফিভারনোভা
চোখ ধাঁধানো রঙের বাহারে হাজীর হয়েছিল বল ফিভারনোভা। ১৯৭৮ সাল থেকে প্রচলিত ট্যাংগো মডেলের ধারা ভেঙে একবিংশ শতাব্দীর নতুন বল হিসেবে আবির্ভাব ঘটে ফিভারনোভার। নতুন শতাব্দী, নতুন বল! বলটির সোনালি এবং লাল রং এশিয়ার সংস্কৃতি এবং বিপ্লবের প্রতীক।

২০০৬- টিমজিষ্ট
২০০৬ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মত সেলাই ছাড়া বল ব্যবহার করা হয়। বলের নাম টিমজিষ্ট। জার্মান শব্দ টিমজিস্টের মানে দলীয় সংহতি। বলটি ছিল অধিকতর গোলাকৃতির। নিখুঁত পানি প্রতিরোধক। ২০০৬ বিশ্বকাপ থেকে বলের ওপর স্টেডিয়াম, ম্যাচ প্রতিপক্ষ, ম্যাচের সময় লিখে দেওয়ার রীতি শুরু করা হয়। বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচে সোনালি আভা ছড়ানো বিশেষ একটি টিমজিস্ট বল ব্যবহার করা হয়েছিল। যেটিতে লেখা ছিল টিমজিস্ট বার্লিন।

২০১০- জাবুলানি
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত বল এটিই। দক্ষিন আফ্রিকার প্রধান আদিবাসী জনগোষ্টী হচ্ছে জুলু। তাদের ব্যবহৃত ভাষার নামও জুলু। এই জুলু শব্দ জাবুলানির মানে হচ্ছে উল্লাস বা উদযাপন করা। বাতাসে এই বলের কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য বাইরের আচ্ছাদনে গ্রিপ এন গ্রæভ নামে বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। জাবুলানি বলে সাদা পটভূমির ওপর ১১টি ভিন্ন রঙের ত্রিভুজ প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হয়। এই ‘১১’ ছিল মাঠের ১১ জন খেলোয়াড়, দক্ষিণ আফ্রিকার ১১টি ভাষা, দক্ষিণ আফ্রিকার ১১টি বিখ্যাত গোষ্ঠীর প্রতীক।

২০১৪- ব্রাজুকা
২০১৪ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল ‘ব্রাজুকা’। ব্রাজুকা মূলত পর্তুগিজ শব্দ। যার অর্থ দাঁড়ায় ‘ব্রাজিলিয়ান’ বা ‘ব্রাজিলিয়ানদের জীবনধারা’। এছাড়া আরও কয়েকটি আঞ্চলিক অর্থ রয়েছে ব্রাজুকার। তবে রংয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা আনা হয়েছে। রং নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ব্রাজিলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে। ব্রাজুকার নীল, সোনালি আর সবুজ রঙে ব্রাজিলীয়দের বর্ণিল জীবনের রং ফুটে তোলা হয়েছে।

২০১৮- টেলস্টার এইটটিন
মূলত ১৯৭০ বিশ্বকাপের বলের আদলে পাকিস্তানের শিয়ালকোট ভিত্তিক ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান ফরোয়ার্ড স্পোর্টস অ্যাডিডাসের হয়ে এই টেলেস্টার এইটটিন বলটি তৈরি করেন। সাদা-কালো যুগের বলকে রঙিন দুনিয়ায় নতুন করে উপস্থাপন করছেন অ্যাডিডাস। ১৯৭০ ও ১৯৭৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা হয়েছিল টেলস্টার বল দিয়ে। সেই সময় পেলে ও বেকেন বাওয়ারের মতো কিংবদন্তিরা এই বল দিয়ে খেলেছিলেন।

২০২২- আল রিহলা
কাতার বিশ্বকাপে মেসি-নেইমার-রোনালদো-এমবাপ্পেদের পায়ে যে ফুটবল এবার নেচেছে সেই বলের নাম আল রিহলা। আল রিহলা আরবি শব্দ। বাংলায় যার অর্থ ‘সফর’। ইবনে বতুতার ভ্রমণ আর জীবনের গল্প নিয়ে যে বই লেখা, তার নামও আল রিহলা। ইবনে বতুতার ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই এই বলের নাম রাখা হয়েছে আল রিহলা। ফিফার ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপ ইতিহাসে বাতাসে সবচেয়ে দ্রæতগতির বল এটি। ম্যাচে গতি আরও বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই বলটির নকশা এভাবে করা হয়েছে।

২০২৬- ট্রিওন্ডা
ট্রিওন্ডা নামটি এসেছে দুটি শব্দ থেকে ট্রাই ও ওন্ডা। ট্রাই মানে তিন আর ওন্ডা মানে ঢেউ। বলে লাল, সবুজ ও নীল এই তিন রঙের ঢেউ দিয়ে আয়োজক দেশগুলোকে বোঝানো হয়েছে। বলের নকশায় আছে তিন দেশের জাতীয় প্রতীক। যুক্তরাষ্ট্রের তারকা, কানাডার ম্যাপল পাতা এবং মেক্সিকোর ঈগল। এসব প্রতীক গ্রাফিক্স আকারেও খোদাই করা হয়েছে। বলটিতে সোনালি রঙের ছোঁয়াও আছে। এর মাধ্যমে বিশ্বকাপ ট্রফির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে এবং মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে, এই বল ফুটবলের সর্ববৃহৎ মঞ্চের জন্য।

এই ট্রিওন্ডা বলের নতুনত্ব হলো অ্যাডিডাসের কানেক্টেড বল প্রযুক্তি। বলের ভেতরের একপাশে থাকা ৫০০ হার্জ সেন্সর ভিএআর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের রিয়েল টাইম তথ্য দেব। এর ফলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অফসাইড ধরা যাবে। এ ছাড়া হ্যান্ডবল বা ফাউলের মতো বিতর্কিত পরিস্থিতি সহজেই চিহ্নিত করা যাবে।

বাংলা টেলিগ্রাফ স্পোর্টস- বিটিএস