বৃহস্পতিবার । জানুয়ারি ২২, ২০২৬
বাংলা টেলিগ্রাফ ডেস্ক জাতীয় ১৭ অক্টোবর ২০২৫, ১০:১৫ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

বৈশ্বিক অঙ্গনে অগৌরবের পরিচয় হয়ে উঠছে বাংলাদেশি পাসপোর্ট


Passport

ফাইল ছবি

স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের অপেক্ষায় বাংলাদেশ। অর্থনীতির আকারে দেশটি এখন বিশ্বের ৩৫তম, বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক বাণিজ্য হয়। মাথাপিছু আয়ের দিক থেকেও অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ। কিন্তু অর্থনৈতিক এই অগ্রগতির বিপরীতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পাসপোর্ট দিন দিন হয়ে উঠছে আরও অগৌরবজনক।

প্রতি বছর বিশ্বের ১৯৯টি দেশের পাসপোর্ট ও ২২৭টি গন্তব্য বিশ্লেষণ করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স শক্তিশালী পাসপোর্ট সূচক প্রকাশ করে। ২০২৫ সালের সর্বশেষ সূচকে (৭ অক্টোবর প্রকাশিত) বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম থেকে নেমে ১০০তম স্থানে এসেছে। বর্তমানে বাংলাদেশিরা বিশ্বের ২২৭টি গন্তব্যের মধ্যে মাত্র ৩৮টি দেশে ভিসামুক্ত বা অনঅ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা পাচ্ছেন।

বাংলাদেশের সঙ্গে একই অবস্থানে রয়েছে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা উত্তর কোরিয়া। তুলনামূলকভাবে গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় থাকা মিয়ানমার (৯৬তম), লেবানন (৯৬তম) এবং দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্র দেশ ভুটান (৯২তম)—সবাই বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে। এমনকি বাংলাদেশের পাসপোর্ট সূচকে ফিলিস্তিন (৯৯তম) ও লিবিয়া (৯৯তম)-ও উপরে রয়েছে।

অর্থনীতির দিক থেকে সমমানের দেশগুলোর সঙ্গেও বাংলাদেশের পাসপোর্টের পার্থক্য স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যানুসারে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জিডিপি ৪৭৫ বিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বে ৩৫তম। কিন্তু পাসপোর্ট সূচকে দেশটি পিছিয়ে।

একই সময়ে ভিয়েতনাম (৪৮৫ বিলিয়ন ডলার) ও ফিলিপাইন (৪৯৪ বিলিয়ন ডলার) বাংলাদেশের চেয়ে সামান্য এগিয়ে থাকলেও পাসপোর্ট সূচকে যথাক্রমে ৯২তম ও ৭৯তম স্থানে রয়েছে।
আর মালয়েশিয়া (৪৭০ বিলিয়ন ডলার) অর্থনীতিতে বাংলাদেশের কাছাকাছি হলেও পাসপোর্ট শক্তির দিক থেকে রয়েছে ১২তম স্থানে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমান অবস্থানে।

এ ব্যাপারে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, “ভুটান কিংবা মিয়ানমারের মতো দেশের পাসপোর্টের মান বাংলাদেশের তুলনায় ভালো—এটা লজ্জার। পাসপোর্টের মান কোনো দেশের অর্থনীতি নয়, মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়ে মাপা হয়। বিদেশগামীদের জালিয়াতি ও প্রতারণা দেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।”

তিনি আরও বলেন, “একজন ব্যক্তির প্রতারণা পুরো জাতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সামাজিক ও নাগরিক মূল্যবোধ না বাড়ালে এ পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব নয়। দেশে কর্মসংস্থান না থাকায় তরুণরা বৈধ বা অবৈধভাবে বিদেশে ছুটছে—এটাই মূল সমস্যা।”

সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, বাংলাদেশের পাসপোর্টের অবনমনের পেছনে অর্থনৈতিক কারণ নয়, বরং কূটনৈতিক দুর্বলতা ও নীতিগত ত্রুটি দায়ী।

তিনি বলেন, “বিশ্বের অনেক দরিদ্র দেশের পাসপোর্ট আমাদের চেয়ে শক্তিশালী। বাংলাদেশিরা বিদেশে গিয়ে অপরাধ করছে—এমনও নয়। তাহলে কেন আমাদের পাসপোর্ট উত্তর কোরিয়ার সমান অবস্থানে থাকবে?”

তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “পাসপোর্টের সূচক উন্নত না হলে তরুণদের শিক্ষা, চাকরি ও চিকিৎসার সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে। কেন সূচক এত খারাপ হয়েছে, তা সরকারকে জরুরিভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।”

এদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ যেমন ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর—বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা নীতিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। অনেকে পর্যটক ভিসায় গিয়ে ফেরত না আসায় এসব দেশ ভিসা ইস্যু বন্ধ বা সীমিত করেছে। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতও গত বছর বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা ইস্যু বন্ধ করেছিল, পরে সীমিত আকারে চালু করেছে।

অর্থনীতি বাড়লেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পাসপোর্ট দিন দিন হারাচ্ছে গ্রহণযোগ্যতা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি সরকার এখনই উদ্যোগ না নেয়, তবে পাসপোর্ট সূচকে বাংলাদেশের নাম আরও নিচে নেমে যেতে পারে—যা একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য সত্যিই এক অগৌরবের প্রতীক হয়ে উঠবে।