
শীতের হিমেল হাওয়ায় আমরা যখন লেপ-কম্বল মুড়ি দিয়ে উষ্ণতা খুঁজি, তখন বাড়ির কোণে থাকা আদরের বিড়াল বা পশমের আবরণে তাদের ঢাকা থাকলেও অতিরিক্ত ঠান্ডায় তারা হাইপোথার্মিয়া বা নিউমোনিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত হতে পারে। কুকুরটিও ঠান্ডায় কাবু হয়ে পড়তে পারে।
অনেক সময় শীতের তীব্রতায় বিড়াল ও কুকুরের যেসব রোগ বা শারীরিক সমস্যা হতে পারে –
- ঠান্ডা–জ্বর ও নিউমোনিয়া: মানুষের মতোই পোষা প্রাণীদেরও বুকে কফ জমা, কাশি, হাঁচি এবং তীব্র জ্বর হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না করালে এটি মারাত্মক নিউমোনিয়ায় রূপ নিতে পারে।
- ক্যানেল কাফ (Kennel Cough): এটি কুকুরের একটি ছোঁয়াচে শ্বাসকষ্টজনিত রোগ। শীতে এর প্রকোপ বাড়ে, যার ফলে কুকুরের শুকনো কাশি ও শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
- হাইপোথার্মিয়া: শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে গেলে পোষ্য অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। শরীর থরথর করে কাঁপা এবং নিস্তেজ হয়ে যাওয়া এর প্রধান লক্ষণ।
- আর্থ্রাইটিস বা বাতের ব্যথা: বয়স্ক কুকুর বা বিড়ালের ক্ষেত্রে শীতে হাড়ের জয়েন্টে ব্যথা বেড়ে যায়। ফলে তারা হাঁটতে কষ্ট পায় এবং সিঁড়ি দিয়ে উঠতে বা লাফাতে চায় না।
- ত্বকের সমস্যা ও খুশকি: শীতের শুষ্ক বাতাসে বিড়াল-কুকুরের চামড়া ফেটে যায় এবং প্রচণ্ড চুলকানি হতে পারে। পশমের নিচে খুশকি হওয়া বা পশম উঠে যাওয়ার সমস্যাও দেখা দেয়।
- প–প্যাড বা থাবার ক্ষত: অতিরিক্ত ঠান্ডায় মেঝে বা রাস্তায় হাঁটার ফলে তাদের পায়ের তলার নরম চামড়া ফেটে রক্তপাত বা ইনফেকশন হতে পারে।
- ভাইরাল ফ্লু: বিড়ালের ক্ষেত্রে ‘ক্যাট ফ্লু’ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যাতে চোখ-নাক দিয়ে পানি পড়া এবং মুখে ঘা হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়।
- অ্যান্টি–ফ্রিজ পয়জনিং: গাড়ির ইঞ্জিন থেকে বের হওয়া নীল রঙের তরল (অ্যান্টি-ফ্রিজ) মিষ্টি স্বাদের হওয়ায় অনেক সময় কুকুর-বিড়াল তা চেটে ফেলে। এটি তাদের কিডনি বিকল করে দিতে পারে।

এই মৌসুমে আপনার চারপেয়ে বন্ধুর জন্য প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতা ও সঠিক যত্ন
উষ্ণ আবাসন নিশ্চিত করাঃ শীতের রাতে মেঝে অতিরিক্ত ঠান্ডা হয়ে থাকে, যা পোষা প্রাণীর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তাই তাদের সরাসরি মেঝেতে ঘুমাতে না দিয়ে নরম তোশক, কুশন বা পুরনো মোটা কম্বল দিয়ে বিছানা তৈরি করে দিন। বিছানাটি যেন ঘরের অপেক্ষাকৃত উষ্ণ কোণে থাকে এবং জানালার সরাসরি ঠান্ডা বাতাস থেকে দূরে থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন। বিড়াল সাধারণত একটু অন্ধকার ও উষ্ণ জায়গা পছন্দ করে, তাই তাদের জন্য ছোট কার্ডবোর্ড বক্সের ভেতরে আরামদায়ক বিছানা করে দেওয়া যেতে পারে।
পোশাকের ব্যবহারঃ যেসব কুকুরের গায়ের পশম ছোট, তারা শীতে বেশি কষ্ট পায়। বাজারে এখন বিড়াল ও কুকুরের জন্য হরেক রকমের সোয়েটার বা জ্যাকেট পাওয়া যায়। তাদের মাপমতো আরামদায়ক সুতি বা পশমি পোশাক পরিয়ে রাখতে পারেন। তবে খেয়াল রাখবেন পোশাকটি যেন খুব বেশি টাইট না হয় এবং তা পরে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারে।
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনঃ শীতকালে শরীর গরম রাখতে পোষা প্রাণীদের বাড়তি শক্তির প্রয়োজন হয়। তাই এই সময়ে তাদের খাবারে প্রোটিন ও ক্যালরির পরিমাণ কিছুটা বাড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। তবে সবচেয়ে জরুরি হলো পানি। ঠান্ডার কারণে অনেক সময় তারা পানি পান করা কমিয়ে দেয়, যা থেকে ডিহাইড্রেশন বা কিডনির সমস্যা হতে পারে। তাই সবসময় তাদের পাত্রে পরিষ্কার এবং সাধারণ তাপমাত্রার পানি রাখুন। হালকা কুসুম গরম পানি দিলে তারা বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
গোসল ও পরিচ্ছন্নতাঃ তীব্র শীতে পোষা প্রাণীকে ঘন ঘন গোসল করানো একদমই উচিত নয়। এতে তাদের ঠান্ডা লেগে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। খুব প্রয়োজন হলে কুসুম গরম পানি দিয়ে গোসল করিয়ে দ্রুত ড্রায়ার বা তোয়ালে দিয়ে শরীর শুকিয়ে ফেলতে হবে। গোসলের বিকল্প হিসেবে বাজারে পাওয়া যাওয়া ‘পেট ওয়াইপস’ বা ড্রাই শ্যাম্পু ব্যবহার করে তাদের শরীর পরিষ্কার রাখা যেতে পারে।
পায়ের থাবার যত্নঃ বাইরে হাঁটাতে নিয়ে গেলে ঠান্ডা রাস্তা বা ধুলোবালিতে কুকুরের পায়ের তালু ফেটে যেতে পারে। বাইরে থেকে ফেরার পর হালকা গরম পানি দিয়ে পা মুছে দিন এবং প্রয়োজনে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ‘প-বাম’ (Paw Balm) বা নারকেল তেল ব্যবহার করতে পারেন।

শীতের তীব্রতা থেকে আপনার আদরের বিড়াল বা কুকুরকে সুরক্ষিত রাখতে কিছু কার্যকরী ঘরোয়া টিপস:
- আপনার পোষ্যটি যেখানে ঘুমায়, সেখানে একটি পানির বোতলে হালকা গরম পানি ভরে মোটা মোজা বা কাপড়ে পেঁচিয়ে রেখে দিন। এটি দীর্ঘক্ষণ বিছানাকে উষ্ণ রাখবে। তবে খেয়াল রাখবেন পানি যেন খুব বেশি গরম না হয়।
- সরাসরি মেঝেতে শোয়াবেন না। খাটের ওপর বা সোফায় জায়গা না হলে মেঝের ওপর কয়েক স্তর পুরনো খবরের কাগজ বিছিয়ে তার ওপর মোটা চট বা কম্বল দিন। কাগজ খুব ভালো তাপ নিরোধক হিসেবে কাজ করে।
- শীতে ওদের চামড়া খসখসে হয়ে যায়। সপ্তাহে দু-তিন দিন সামান্য নারকেল তেল হাতের তালুতে ঘষে হালকা করে ওদের শরীরে ম্যাসাজ করে দিন। এতে রক্ত সঞ্চালন বাড়বে এবং ত্বক ভালো থাকবে।
- এই সময় ওদের ফ্রিজের খাবার একদম দেবেন না। খাবার হালকা গরম করে দিন। খাওয়ার পানিও যেন খুব বেশি ঠান্ডা না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
- যদি নাক বন্ধ বা হালকা সর্দি মনে হয়, তবে বাথরুমে গরম পানি ছেড়ে ভাপ তৈরি করুন এবং সেখানে আপনার পোষ্যকে ৫-১০ মিনিট রাখুন (সরাসরি গরম পানির কাছে নয়)। এতে ওদের শ্বাস নিতে সুবিধা হবে।
- দিনের বেলা যখন রোদ ওঠে, তখন জানালার পাশে বা বারান্দায় ওদের বসার ব্যবস্থা করুন। প্রাকৃতিক এই উষ্ণতা এবং ভিটামিন-ডি ওদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবে।
- বাইরে থেকে ঘুরে এলে পা ধুয়ে দেওয়ার বদলে ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে দিন। পা শুকনো রাখা খুব জরুরি, নয়তো আঙুলের ফাঁকে ফাঙ্গাস হতে পারে।
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খুব সামান্য মধু বা সেদ্ধ ডিমের কুসুম খাবারে মিশিয়ে দিতে পারেন, যা শরীর ভেতর থেকে গরম রাখতে সাহায্য করে। (তবে মিষ্টি বা মধু দেওয়ার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন আপনার পোষ্যের এতে কোনো অ্যালার্জি আছে কি না)।

যদি দেখেন আপনার পোষ্যটি সারাক্ষণ গুটিসুটি মেরে বসে আছে, কাঁপছে, খাবার খাচ্ছে না কিংবা তার নাক দিয়ে পানি পড়ছে—তবে দেরি না করে দ্রুত অভিজ্ঞ কোনো চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, সময়মতো সঠিক যত্নই আপনার অবলা বন্ধুটিকে এই শীতে সুস্থ ও চনমনে রাখতে পারে।
আপনার আদরের পোষা প্রাণীটি হয়তো মুখে বলে তার কষ্টের কথা প্রকাশ করতে পারে না কিন্তু তার আচরণ আর শারীরিক পরিবর্তনই বলে দেয় সে কতটা স্বস্তিতে আছে। হাড়কাঁপানো এই শীতে সামান্য একটু বাড়তি সতর্কতা আর একটু উষ্ণ আদরই পারে আপনার অবলা বন্ধুটিকে প্রাণবন্ত রাখতে। মনে রাখবেন, আপনার দেওয়া সঠিক পুষ্টি, নিরাপদ আশ্রয় আর সঠিক সময়ে ঘরোয়া যত্নই তাকে বড় কোনো রোগবালাই থেকে দূরে রাখবে। এই শীতে নিজের পাশাপাশি ঘরের এই খুদে সদস্যটির প্রতিও যত্নবান হোন, যাতে শীতের আমেজ আপনাদের দুজনের জন্যই আনন্দদায়ক হয়।











































