রবিবার । মার্চ ২২, ২০২৬
ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক আন্তর্জাতিক ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১:৪৯ অপরাহ্ন
শেয়ার

কাশ্মীরে মুসলিম শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় মেডিকেল কলেজ বন্ধ করল ভারত


Kashmir Cover

ভারতশাসিত কাশ্মীরে একটি মেডিকেল কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের অধিকাংশ মুসলিম হওয়ায় ডানপন্থী হিন্দু গোষ্ঠীর আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ভারতের চিকিৎসা শিক্ষা ও চিকিৎসা অনুশীলনের ফেডারেল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশন (এনএমসি) গত ৬ জানুয়ারি জম্মু বিভাগের পার্বত্য জেলা রিয়াসিতে অবস্থিত শ্রী মাতা বৈষ্ণো দেবী মেডিকেল ইনস্টিটিউটের (এসএমভিডিএমআই) সনদ বাতিল করে। এই এলাকা হিমালয়ের পির পাঞ্জাল পর্বতমালার দিকে অবস্থিত, যা জম্মুর সমতল অঞ্চলকে কাশ্মীর উপত্যকা থেকে আলাদা করেছে।

নভেম্বরে শুরু হওয়া কলেজটির প্রথম এমবিবিএস ব্যাচে মোট ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হন। তাদের মধ্যে ৪২ জনই মুসলিম, যাদের বেশিরভাগ কাশ্মীরের বাসিন্দা। সাতজন ছিলেন হিন্দু এবং একজন শিখ। হিন্দু ধর্মীয় ট্রাস্ট দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও আংশিকভাবে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এই বেসরকারি কলেজে এটিই ছিল প্রথম এমবিবিএস ব্যাচ।

ভারতে সরকারি বা বেসরকারি—সব মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয় কেন্দ্রীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (নিট/NEET)-এর মাধ্যমে। প্রতিবছর দুই কোটির বেশি শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নেয়, যেখানে মোট এমবিবিএস আসন প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার।

কাশ্মীরের বারামুল্লা জেলার ১৮ বছর বয়সী ছাত্রী সানিয়া জান (ছদ্মনাম) নিট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। “এটা আমার জীবনের স্বপ্ন ছিল,” তিনি আল জাজিরাকে বলেন। বাড়ির তুলনামূলক কাছাকাছি হওয়ায় কাউন্সেলিংয়ের সময় তিনি এসএমভিডিএমআইকেই পছন্দ করেন।

kashmir 2

কিন্তু ভর্তি হওয়ার পরই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। স্থানীয় হিন্দু গোষ্ঠীগুলো শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় পরিচয় জানতে পেরে বিক্ষোভ শুরু করে। তাদের দাবি ছিল—মাতা বৈষ্ণো দেবী মন্দিরের দানের অর্থে পরিচালিত কলেজে মুসলিম শিক্ষার্থীদের “কোনো জায়গা নেই”।

সপ্তাহের পর সপ্তাহ কলেজ গেটের সামনে বিক্ষোভ চলতে থাকে। ক্ষমতাসীন বিজেপির কয়েকজন নেতা কাশ্মীরের লেফটেন্যান্ট গভর্নরের কাছে আবেদন করে কলেজটিতে শুধু হিন্দু শিক্ষার্থীদের জন্য আসন সংরক্ষণের দাবি জানান। পরে তারা কলেজ বন্ধের দাবিও তোলে।

এই প্রেক্ষাপটে এনএমসি জানায়, কলেজটি ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় এর স্বীকৃতি বাতিল করা হয়েছে। সংস্থাটি দাবি করে, কলেজে শিক্ষক সংকট, শয্যা ও রোগীসংখ্যা কম, লাইব্রেরি ও অপারেশন থিয়েটারের ঘাটতি রয়েছে।

তবে শিক্ষার্থীদের দাবি, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। শিক্ষার্থী জাহান* (ছদ্মনাম) বলেন, “আমাদের কলেজে চারটি ক্যাডাভার ছিল, যেখানে অন্য অনেক কলেজে একটি মাত্র থাকে।” আরেক শিক্ষার্থী রফিক বলেন, “শ্রীনগরের সরকারি কলেজগুলোর তুলনায় এখানকার সুযোগ-সুবিধা ভালো ছিল।”

স্থানীয়রা বলছেন, অনুমোদনের সময় যদি ঘাটতি না থাকে, তবে হঠাৎ করে সেগুলো কীভাবে তৈরি হলো।

এদিকে শিক্ষার্থীরা কলেজ ছেড়ে বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ ঘোষণা দিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের অন্য মেডিকেল কলেজে স্থানান্তর করা হবে, যাতে তাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট না হয়।

তিনি বিজেপি ও সংশ্লিষ্ট হিন্দু গোষ্ঠীগুলোর সমালোচনা করে বলেন, “মানুষ সাধারণত এলাকায় মেডিকেল কলেজ চায়। অথচ এখানে ছাত্রদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে কলেজ বন্ধের আন্দোলন করা হয়েছে।”

জম্মু ও কাশ্মীর স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাসির খুয়েহামি বলেন, এই ঘটনা শিক্ষাব্যবস্থাকে সাম্প্রদায়িক করে তোলার ঝুঁকি তৈরি করছে।

বারামুল্লায় ফিরে সানিয়া জান এখন অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। “আমি কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় পাস করে আসন পেয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের পরিচয়ের কারণে সবকিছু শেষ হয়ে গেল। তারা মেধাকে ধর্মে পরিণত করেছে,” তিনি বলেন।

আল জাজিরা অবলম্বনে