বুধবার । মে ২০, ২০২৬
প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ১৯ মে ২০২৬, ১১:১০ অপরাহ্ন
শেয়ার

লন্ডনে এক বাংলাদেশি তরুণের প্রবাস জয়ের গল্প


UK Visa

ফাইল ছবি

প্রবাস জীবন মানেই শুধু অর্থ উপার্জনের গল্প নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অগণিত ত্যাগ, সংগ্রাম আর স্বপ্নপূরণের নিরন্তর লড়াই। দেশ ছেড়ে হাজার মাইল দূরের অচেনা শহরে নতুন করে জীবন গড়ার এমনই এক অনুপ্রেরণার নাম আশরাফুল ইসলাম হাসিব। লন্ডনের ব্যস্ত জীবনে আজ তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত প্রবাসী। তবে এই অবস্থানে পৌঁছাতে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে কঠিন এক পথ।

ঢাকা থেকে প্রথমবার লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে নামার অভিজ্ঞতা এখনো স্পষ্ট মনে আছে হাসিবের। চারপাশে ঘন কুয়াশা, কনকনে ঠান্ডা আর সম্পূর্ণ অচেনা পরিবেশ তাকে প্রথমেই বুঝিয়ে দিয়েছিল—প্রবাস জীবন সহজ নয়।

লন্ডনে গিয়ে সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল সাংস্কৃতিক পার্থক্য। হাসিব বলেন, দেশের মতো জীবনযাপন সেখানে একেবারেই চলে না। সময়নিষ্ঠ জীবন, দ্রুতগতি আর নিয়মের মধ্যে নিজেকে খাপ খাওয়াতে শুরুতে বেশ কষ্ট হয়েছিল তার। ট্রেনের রুট বুঝতে না পারা, পথ হারিয়ে ফেলা কিংবা মানুষের জীবনযাত্রা বুঝে উঠতে না পারার মতো অভিজ্ঞতা ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী।

তবে তিনি হাল ছাড়েননি। প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করেছেন, মানুষের চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তুলেছেন নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানানসই করে।

বইয়ের ইংরেজি আর ব্রিটিশদের কথ্য ভাষার মধ্যে যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে, সেটাও টের পেয়েছিলেন শুরুতেই। প্রথমদিকে অনেক কথাই বুঝতে পারতেন না। কিন্তু টিকে থাকতে হলে যোগাযোগের বিকল্প নেই বুঝতে পেরে ভুলভাল ইংরেজিতেই কথা বলা শুরু করেন তিনি।

বাস, দোকান কিংবা কর্মক্ষেত্র—সব জায়গাতেই সাহস করে কথা বলার অভ্যাসই ধীরে ধীরে তার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। আজ অনর্গল ইংরেজিতে কথা বললেও সেই পথটা মোটেও সহজ ছিল না।

বিদেশে যাওয়ার পেছনে অনেকের মতো হাসিবের জীবনেও ছিল ঋণের বোঝা। পরিবার জমি বন্ধক রেখেছিল, আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকেও ধার করতে হয়েছিল। ফলে প্রবাস জীবনের প্রথম কয়েক বছর নিজের কোনো শখ বা বিলাসিতার সুযোগ ছিল না।

তার প্রতিটি দিনের লক্ষ্য ছিল একটাই—কঠোর পরিশ্রম করে দেনামুক্ত হওয়া এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো। তিনি বলেন, প্রবাস জীবনের শুরুটা আসলে নিজের জন্য নয়, পরিবারের স্বপ্ন পূরণের জন্য যুদ্ধ করার সময়।

পরিবার থেকে দূরে থাকা যে কত বড় কষ্ট, তা কেবল প্রবাসীরাই অনুভব করতে পারেন। ঈদের দিনগুলোতে পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে আনন্দ করতে দেখে বুক ভেঙে যেত হাসিবের। আর তিনি তখন ব্যস্ত থাকতেন কাজ নিয়ে।

তবে তিনি নিজেকে সবসময় মনে করিয়ে দিয়েছেন—এই কষ্টই একদিন পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেবে। সেই মানসিক শক্তিই তাকে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।

একাকিত্ব কাটাতে স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত হন হাসিব। মসজিদ, আড্ডা, দেশি খাবার আর একে অপরের খোঁজখবর নেওয়া—এসবই তাকে মানসিকভাবে শক্ত থাকতে সাহায্য করেছে। তার মতে, প্রবাসে টিকে থাকতে হলে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো খুব গুরুত্বপূর্ণ।

হাসিব বিশ্বাস করেন, বিদেশে শুধু ডিগ্রি নয়, কাজের দক্ষতাই সবচেয়ে বড় সম্পদ। মাস্টার্স শেষ করেও তিনি ড্রাইভিং শিখেছেন, রান্নার কাজ করেছেন, ছোটখাটো টেকনিক্যাল কোর্সও করেছেন। তিনি কোনো কাজকে ছোট মনে করেননি। বরং শুরুতে শেখা এসব কাজই পরবর্তীতে তার ক্যারিয়ারের ভিত্তি তৈরি করেছে।

প্রবাস জীবনের শুরুর দিকে অপ্রয়োজনীয় খরচ না করার পরামর্শ দিয়েছেন হাসিব। তার মতে, প্রথম কয়েক বছরই ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ার সময়। তাই আয়-ব্যয়ের হিসাব ঠিক রেখে পরিবারের জন্য সঞ্চয় করা জরুরি। তিনি সবসময় বৈধ পথে দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা পরিবারকে যেমন সহায়তা করেছে, তেমনি দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রেখেছে।

বিদেশে আইনি বৈধতা বজায় রাখাকেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন হাসিব। দালালের প্রলোভনে পড়ে অবৈধ পথে না গিয়ে তিনি নিয়ম মেনে ট্যাক্স দিয়েছেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক রেখেছেন। তার মতে, প্রবাসে নিরাপদ ও স্থায়ী ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।

আশরাফুল ইসলাম হাসিবের গল্প যেন লাখো বাংলাদেশি প্রবাসীর সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। কনকনে ঠান্ডা, ভাষার বাধা, একাকিত্ব আর কঠোর পরিশ্রম পেরিয়ে আজ তিনি সফলতার জায়গায় পৌঁছেছেন। তার বিশ্বাস, ধৈর্য, সততা আর পরিশ্রম থাকলে প্রবাস জীবন কখনো কাউকে খালি হাতে ফেরায় না।