
আইমেন হুসেইন
ফুটবল কখনও কখনও শুধুই খেলা না; হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার দৃপ্ত ঘোষণা। কখনও এটি শোকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, কখনও হারিয়ে যাওয়া মানুষদের স্মৃতির কাছে নীরব শ্রদ্ধাঞ্জলি। ইরাকের স্ট্রাইকার আয়মেন হুসেইন এর জীবনকাহিনি সেই বিরল গল্পগুলোর একটি, যেখানে প্রতিটি গোলের পেছনে লুকিয়ে আছে রক্ত, অশ্রু, যুদ্ধ ও অবিশ্বাস্য স্থিতিস্থাপকতার ইতিহাস।
২০২৬ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে বলিভিয়ার বিপক্ষে তাঁর জয়সূচক গোল ইরাককে চার দশক পর আবার বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরিয়ে আনে। সেই মুহূর্তে কোটি ইরাকি উল্লাসে ফেটে পড়লেও খুব কম মানুষই হয়তো ভাবছিলেন—এই গোলের পথচলা শুরু হয়েছিল এক কিশোরের চোখের সামনে ভেঙে পড়া একটি পরিবারের ধ্বংসস্তূপ থেকে।
যে শিশুর স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে পারেনি মৃত্যু
১৯৯৬ সালে ইরাকের উত্তরাঞ্চলের আল-হাওয়িজা জেলার আল-সাফরা গ্রামে জন্ম নেওয়া আইমেন হুসেইনের শৈশব ছিল সাধারণ গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি। কৃষিকাজ ও ভেড়া পালনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতো তাঁর পরিবার। কিন্তু ইরাকের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সশস্ত্র সংঘাতের বাস্তবতা খুব দ্রুত সেই স্বাভাবিকতাকে গ্রাস করে।
২০০৮ সালে, মাত্র বারো বছর বয়সে, আইমেন তাঁর জীবনের প্রথম বড় ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হন। নতুন বাড়ি নির্মাণের জন্য কিছু সামগ্রী কিনতে বেরিয়েছিলেন তাঁর বাবা, যিনি ছিলেন ইরাকি সেনাবাহিনীর একজন সদস্য। কয়েক ঘণ্টা পর আসে এক ভয়াবহ সংবাদ-আল-কায়েদা জঙ্গিরা তাঁকে হত্যা করেছে।
একটি শিশুর কাছে বাবার মৃত্যু শুধু একজন অভিভাবককে হারানো নয়; বরং নিরাপত্তাবোধ, আশ্রয় এবং ভবিষ্যতের একটি বড় অংশ হারিয়ে ফেলার সমান। হাসপাতালের মর্গে বাবার নিথর দেহ দেখে যে মানসিক আঘাত তিনি পেয়েছিলেন, তা আজও তাঁর স্মৃতিতে অম্লান।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের সমাপ্তি ঘটেনি তখনও।
হারিয়ে যাওয়া ভাইয়ের অপেক্ষা
বাবার মৃত্যুর পর বড় ভাই সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। আইমেন চেয়েছিলেন পরিবারটি গ্রাম ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাক। কিন্তু তাঁর ভাই রাজি হননি।
কয়েক বছর পরে, যখন আইমেন তুরস্কে একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প থেকে দেশে ফিরছিলেন, তখন তিনি আরেকটি দুঃসংবাদ পান। ইসলামিক স্টেট (আইএসআইএল) এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সময় তাঁর বড় ভাইকে অপহরণ করা হয়।
এরপর আর কখনও তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
কোনো মৃত্যুসংবাদ নেই, কোনো সমাধি নেই, কোনো শেষ বিদায় নেই—শুধু অন্তহীন অপেক্ষা।
মানুষের জীবনে কিছু ক্ষত থাকে যা সময়ের সঙ্গে শুকায় না; বরং প্রতিটি সাফল্যের মুহূর্তে নতুন করে জ্বলে ওঠে। আইমেন হুসেইনের জন্য তাঁর ভাইয়ের অনুপস্থিতি ঠিক তেমনই একটি ক্ষত।
যে মা ছেলেকে স্বপ্ন ছাড়তে দেননি
পরিবারের ওপর পরপর দুটি বিপর্যয় নেমে আসার পর আইমেন ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল, পরিবারের দায়িত্ব নেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
কিন্তু তখনই সামনে এসে দাঁড়ান তাঁর মা।
তিনি ছেলেকে বলেছিলেন—“এটাই তোমার স্বপ্ন। তুমি জানো সেটা। আর তোমাকে স্বপ্নের পিছু ছুটতেই হবে, অর্জন করতেই হবে স্পেশাল কিছু।”
ক্রীড়াজগতের ইতিহাসে অনেক মহান খেলোয়াড়ের সাফল্যের পেছনে মায়েদের অবদান রয়েছে। আইমেন হুসেইনের ক্ষেত্রেও সেই কথাটি আক্ষরিক অর্থেই সত্য। যদি তাঁর মা সেদিন তাঁকে থামিয়ে দিতেন, তাহলে হয়তো ইরাক কখনও তার ভবিষ্যৎ নায়ককে খুঁজে পেতো না।
‘বিনা পারিশ্রমিকে খেলতেও রাজি ছিলাম’
২০১২ সালে আইমেনের জীবনে আসে মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের অন্যতম শীর্ষ ক্লাব দোহুক এফসি তাঁকে দলে ভেড়ায়।
চুক্তির অর্থ ছিল ১৮ মিলিয়ন ইরাকি দিনার। একজন দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারের তরুণের জন্য এটি ছিল কল্পনাতীত অঙ্ক। কিন্তু অর্থ তাঁর কাছে প্রধান বিষয় ছিল না।
পরে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, তিনি প্রয়োজনে বিনা পারিশ্রমিকেও খেলতে রাজি ছিলেন। কারণ তাঁর কাছে জাতীয় দলের তারকাদের সঙ্গে একই ড্রেসিংরুম ভাগ করে নেওয়াটাই ছিল স্বপ্নপূরণের সমান।
এই বিনয়ই তাঁকে আলাদা করেছে।
দোহুক থেকে শুরু করে Al-Shorta SC, Al-Talaba SC এবং Al-Zawraa SC—একটির পর একটি ক্লাবে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন তিনি। ইরাকি লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হন।
পরবর্তীতে কাতারের Al Khor SC-এ খেলে আবার দেশে ফিরে আসেন। এক মিলিয়ন ডলারের চুক্তিমূল্যে তিনি হয়ে ওঠেন ইরাকের ইতিহাসের সবচেয়ে দামি ফুটবলার।
প্রতিটি গোলের পেছনে দুইজন মানুষ
কোনো ফুটবলারের সাফল্যের গল্প সাধারণত ট্রফি, গোল বা রেকর্ড দিয়ে লেখা হয়। কিন্তু আইমেন হুসেইনের গল্প লেখা হয়েছে স্মৃতি দিয়ে।
তিনি বহুবার বলেছেন, তাঁর সবচেয়ে বড় আক্ষেপ হলো—তাঁর বাবা ও ভাই জীবিত নেই, তাই তাঁরা তাঁর অর্জনগুলো দেখতে পারেননি।
২০১৬ সালে 2016 Rio de Janeiro Olympic Games-এর বাছাইপর্বে কাতারের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে করা গোল, ২০২৩ সালের Arabian Gulf Cup-এ সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতি কিংবা ২০২৪ সালে Paris 2024 Olympic Games-এর টিকিট নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ গোল—সব অর্জনের মুহূর্তেই তিনি তাঁদের কথা ভেবেছেন।
যারা নেই, তারাই যেন তাঁর সবচেয়ে বড় প্রেরণা।
আবার গর্জে উঠেছে মেসোপটেমিয়ার সিংহ
ইরাক জাতীয় ফুটবল দলকে বলা হয় “লায়ন্স অব মেসোপটেমিয়া”—মেসোপটেমিয়ার সিংহ।
সর্বশেষ ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ খেলেছিল ইরাক। তখন আইমেন হুসেইনের জন্মই হয়নি। চার দশক পরে আবার বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত হয়েছে, আর সেই অভিযানের কেন্দ্রীয় চরিত্র এই স্ট্রাইকার।
সাবেক অধিনায়ক Hussein Saeed এবং বর্তমান গোলরক্ষক Jalal Hassan দুজনেই মনে করেন, বিশ্বকাপে ইরাকের সম্ভাবনার অন্যতম ভিত্তি হবেন আইমেন।
কারণ তিনি শুধু একজন গোলস্কোরার নন; তিনি দলের মানসিক শক্তির প্রতীক।
ফ্রান্স, সেনেগাল ও নরওয়ের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে একই গ্রুপে পড়লেও ইরাকের সমর্থকেরা আশাবাদী। তাঁদের বিশ্বাস, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের প্রতিনিধিত্বকারী এই দল অসম্ভবকে সম্ভব করার মানসিকতা রাখে।
এক দেশের প্রতিচ্ছবি
আইমেন হুসেইনের গল্প আসলে শুধু একজন ফুটবলারের গল্প নয়। এটি সমসাময়িক ইরাকের গল্পও।
একটি দেশ, যে দেশ যুদ্ধ দেখেছে, সন্ত্রাস দেখেছে, দখলদারিত্ব দেখেছে, স্বজন হারানোর বেদনা দেখেছে—কিন্তু তবুও স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেনি।
আইমেন যখন মাঠে নামেন, তখন তিনি শুধু একজন স্ট্রাইকার হিসেবে খেলেন না। তিনি যেন সেই সব ইরাকির প্রতিনিধি, যারা জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়গুলো পার করেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস খুঁজে পেয়েছেন।
বিশ্বকাপে তাঁর প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি শট, প্রতিটি গোল তাই কেবল পরিসংখ্যান নয়; সেগুলো এক ধরনের প্রতিরোধের ভাষা।
বারো বছর বয়সে বাবার লাশ দেখেছিল যে ছেলেটি, হারিয়ে যাওয়া ভাইয়ের অপেক্ষায় যে তরুণ বহু রাত কাটিয়েছে, সেই মানুষটিই আজ কোটি মানুষের আশার কেন্দ্রবিন্দু।
ফুটবল ইতিহাসে অনেক নায়ক আছেন। কিন্তু খুব কম নায়কের গল্পেই ব্যক্তিগত শোক, জাতীয় ট্র্যাজেডি এবং অদম্য স্বপ্ন এত গভীরভাবে একাকার হয়ে গেছে।
তিনি সত্যিই মেসোপটেমিয়ার সিংহ। আর মাঠে তাঁর শক্তির প্রদর্শন দেখতেই মুখিয়ে আছে গোটা বিশ্ব।











































