sentbe-top

‘দয়া করে আমাদের বাংলাদেশী বলবেন না’

suleman‘আমরা স্বদেশী, এ মাটিরই সন্তান; দয়া করে আমাদের বাংলাদেশী বলবেন না। আমরা ভারতীয়।’ রাগান্বিত একইসঙ্গে কিছুটা আতঙ্কিত স্বরে এভাবেই কথা শুরু করেন ভারতের আসামের নেলি গ্রামের বাংলাভাষী মুসলিম যুবক সুলেমান কাশেমি। যিনি অন্য ২০ লাখ আসামিদের মত প্রতিনিয়ত বিতাড়িত হওয়ার শঙ্কায় জীবনযাপন করছেন। কারণ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এ রাজ্যটি নাগরিকদের যে তালিকা করেছে, তাতে প্রায় ২০ লাখের মতো মুসলমানকে বাংলাদেশী হিসেবে প্রচার করে অবৈধ ঘোষণা করতে যাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, এ নিয়ে সরকারিভাবে ইতোমধ্যে কার্যক্রমও শুরু করে দিয়েছে। ফলে নাগরিকত্ব হারানোর শঙ্কায় পড়েছে এসব ভারতীয়রা।

তবে সুলেমানের গ্রামে বিতাড়িত হওয়ার ভয় যে নতুন শুরু হয়েছে তা নয়, ১৯৮৩ সালে এই গ্রামেই চালান হয় বাঙ্গালি বিরোধী আন্দোলন। যে আন্দোলনে সুলেমানের ভাইসহ ২০০০ মুসলিমকে হত্যা করা হয়। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে তাদেরকে কেবল ৫০০০ রুপি ক্ষতিপূরণ ছাড়া আর কিছুই করা হয়নি। এমনকি নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন সুলেমান। কিন্তু তখন নাগরিকত্ব থাকা না থাকা নিয়ে এ হত্যাকাণ্ড চালানো হয়নি। চালানো হয়েছিল সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠরা ভোট বয়কট করার ঘোষণা দিলেও মুসলমানরা ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায়। ফলে সরকার বিরোধী আন্দোলনকারীদের রোষানলে পড়ে মুসলমানরা। চালানো হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। সুলেমানের অভিযোগ, সেসময় চালানো ওই হামলায় হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বরং তাদের পুরস্কৃত করা হয়েছে।

sentbe-adসুলেমান আরও বলেন, ২০১৬ সালে বাঙালিদের ওপর আসামিদের হামলায় ৮০০ জন নিহত হয়। ওই হামলায় বিজেপি সরকার ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৫ লাখ রুপি দেয়। কিন্তু সফল কংগ্রেস সরকার ন্যায় বিচারের জন্য কিছুই করেনি।

আসামের রাজনৈতিক ছাত্র গোষ্ঠী অল আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়ন (এএএসইউ) ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সালের দিকে কোনো ধরনের প্রমাণ ছাড়াই তখন প্রপাগান্ডা ও নিপীড়ন চালায়। অন্যদিকে বিজেপি সরকার প্রপাগান্ডা ছড়াতে থাকে যে, মুসলমানরা যে হারে সন্তান নিচ্ছে তাতে কয়েক বছরের মধ্যে তাদের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হবে। ফলে নানাভাবে বাঙালী মুসলমানদের উপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করে আসছে আসামের কট্টপন্থী দলগুলো।

তবে বর্তমানের সমস্যা হল নাগরিকত্ব নিয়ে। সম্প্রতি আসাম রাজ্য সরকার ১৯৫১ সালের পর রাজ্যে পরিচালিত প্রথম শুমারির ওপর ভিত্তি করে নাগরিকদের খসড়া তালিকাটি তৈরি করেছে। ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে থেকে যেসব পরিবার ভারতে বসবাস করত বলে প্রমাণ করতে পেরেছে, তাদেরই কেবল ওই তালিকায় নাগরিক হিসেবে বৈধতা দেয়া হয়েছে। আর তালিকায় নাম না থাকা বাসিন্দাদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে তাদেরকে দেশ ছাড়া করা হবে বলেও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

morjinaএকইগ্রামের ২৭ বছর বয়সী মর্জিনা বিবি নামের এক নারী বলেন, ২০১৬ সালের ২৯ নভেম্বর রাতের ঘটনা। ঘুমন্ত অবস্থায় আমি দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পেলাম। দরজা খুলে দেখি দুইজন নারী পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য আমার ঘরে ঢুকে বলল তাদের সঙ্গে যেতে হবে।

এরপর মর্জিনাকে পুলিশ নাগরিকত্ব আছে কিনা সেই সন্দেহে নয় মাস কয়েদখানায় আটকে রাখে। দীর্ঘ নয় মাস পর ভুল হয়েছে উল্লেখ করে ২০১৭ সালের ১৭ জুলাই তাকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।

মর্জিনা বলেন, আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। আমার অপরাধটা কোথায়, তাহলে আপনারা কেনো আমার সাথে এমন করছেন? আমি ভুল তো কিছু করিনি। কিন্তু উত্তরে তারা আমাকে নীরব থাকার নির্দেশ দেয়। তার পর দিনই তারা আমাকে ককরাজহার কয়েদখানায় পাঠিয়ে দেয়। আমি সেখানে কিছু খেতে পারছিলাম না, ঘুমাতেও পারছিলাম না। আমার মনে কেবল একটা প্রশ্নই বারবার ঘুরে ফিরে আসছিল, আমি কী করেছি? তারা কেনো আমাকে এই জাহান্নামে পুরে রেখেছে? সেখানে থাকাটা খুবই কষ্টের; বাজে খাবার আর জনবহুল জায়গা। একেকটা রুমে ৫০ থেকে ৬০ জন করে লোক থাকতো। সবাই গাদাগাদি করে ঘরের মেঝেতে ঘুমাত।

assamআন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, নাগরিকত্ব প্রমাণের যে শর্ত দেয়া হয়েছে, অনেকেই তার স্বপক্ষে দালিলিক প্রমাণ দেখাতে পারেননি। সংখ্যাটি ২০ লাখের মতো। দেশ ছাড়ার আতঙ্কে আছে এদের প্রত্যেকেই। এ ধরনের শঙ্কার মধ্যে গত এক মাসে গোয়ালপাড়া, সোনিতপুর ও শিলচর জেলায় ডজনখানেক মানুষ আত্মহত্যাও করেছে।

স্থানীয়দের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও সম্পদ সংরক্ষণের জন্য অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়ন বিজেপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির একটি। তারই অংশ হিসেবে নাগরিকদের এ তালিকা তৈরি। রাজ্যের মুসলিম নেতাদের অভিযোগ, এ কার্যক্রমের মাধ্যমে রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের ভোট নিশ্চিতে বিজেপি মুসলিমদের মনে ভীতির সঞ্চার করেছে। বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

এদিকে নাগরিকদের নতুন তালিকা নিয়ে সংঘাতের আশঙ্কা করছে আসাম সরকারও। এ আশঙ্কা থেকে রাজ্যের নিরাপত্তাও জোরদার করেছে তারা। কেন্দ্রীয় প্যারামিলিটারি বাহিনীর প্রায় ৬০ হাজার সদস্যকে আসামের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এরই মধ্যে মোতায়েন করা হয়েছে।

সৌজন্যে- বণিকবার্তা

sentbe-top