বৃহস্পতিবার । মার্চ ৫, ২০২৬
মাহমুদ নেওয়াজ জয় ফিচার ১ মার্চ ২০২৬, ১০:৫৬ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

বিচারপতিরা কেন সাদা উইগ পরেন!


Wig Cover

এই ছোট্ট সাদা উইগ তাই শুধু চুল নয়। এটি ইতিহাসের অংশ

আদালতের ভেতর এক ধরনের আলাদা পরিবেশ থাকে। নীরবতা। গাম্ভীর্য। আনুষ্ঠানিকতা। সেই পরিবেশে কখনো কখনো দেখা যায় সাদা পরচুলা পরা বিচারপতি। এই সাদা পরচুলাকেই বলা হয় উইগ। প্রশ্ন হলো—এই উইগ পরার চল কোথা থেকে এলো?

এই গল্পের শুরু ইউরোপে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে।

১৭শ শতকে ইউরোপে পরচুলা ছিল ফ্যাশন। রাজা, অভিজাত, ধনী মানুষ—অনেকে মাথায় পরচুলা পরতেন। এটি ছিল ক্ষমতা ও মর্যাদার চিহ্ন।

সেই সময় ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইস দীর্ঘ ও সাজানো পরচুলা জনপ্রিয় করেন। তার রাজদরবারের প্রভাব দ্রুত অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ে।
ইংল্যান্ডেও এই ফ্যাশন পৌঁছে যায়। বিশেষ করে দ্বিতীয় চার্লস-এর আমলে। একটা সময় তিনি ফ্রান্সে নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছিলেন। সেসময় সেখানকার রাজকীয় পোশাক ও স্টাইল তাকে প্রভাবিত করে। সিংহাসনে ফেরার পর তিনি রাজদরবারে পরচুলা জনপ্রিয় করেন।

রাজদরবারের রীতি তখন ধীরে ধীরে সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। বিচারপতিরা ছিলেন রাজা বা রানির প্রতিনিধি। তাই তারাও রাজকীয় পোশাক অনুসরণ করতেন। ধীরে ধীরে আদালতে পরচুলা পরা একটি নিয়মে পরিণত হয়।
কিন্তু শুধু ফ্যাশনের জন্য এই রীতি টিকে থাকেনি।

একসময় ইউরোপে স্বাস্থ্য সমস্যা ছিল বড় বিষয়। মাথায় উকুন হতো। চুল পড়ে যেত। মানুষ অনেক সময় মাথা কামিয়ে ফেলত। তারপর পরচুলা ব্যবহার করত। এতে ব্যক্তিগত অস্বস্তি কমত। আবার দেখতে ভদ্রও লাগত।

wig 3

উইগ আদালতের পরিবেশকে নাটকীয় করে তোলে। এটি বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও আনুষ্ঠানিক করে

তবে আদালতের ক্ষেত্রে আরও গভীর কারণ তৈরি হয়।
আইনব্যবস্থা গাম্ভীর্য চায়। বিচারক ব্যক্তিগত মানুষ নন। তিনি আইন ও ন্যায় বিচারের প্রতীক। উইগ বিচারকের ব্যক্তিগত চেহারা আড়াল করে। এতে বোঝানো হয়—এখানে ব্যক্তি নয়, আইন কথা বলছে। এটি এক ধরনের নিরপেক্ষতার প্রতীক।

আরও একটি বিষয় আছে। ধারাবাহিকতা। আইন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠে। আদালতের পোশাক সেই ঐতিহ্যের স্মারক। ফ্যাশন বদলে গেলেও আদালতে উইগ রয়ে যায়। কারণ আদালত দ্রুত বদল পছন্দ করে না। তারা স্থিতিশীলতা দেখাতে চায়।

১৮শ ও ১৯শ শতকে সাধারণ মানুষ পরচুলা পরা প্রায় বন্ধ করে দেয়। কিন্তু আদালত এই প্রথা ধরে রাখে। তখন উইগ আর ফ্যাশন নয়। এটি হয়ে যায় পেশাগত পোশাক।

কিন্তু সব দেশেই কি এই রীতি আছে? না।

Chief Justuce of BD

বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ।। ফাইল ছবি

বাংলাদেশে শপথ অনুষ্ঠানের বাইরে দৈনন্দিন কাজে বিচারপতিরা সাদা উইগ পরেন না। যদিও বাংলাদেশের আইনব্যবস্থার শিকড় ব্রিটিশ আমলে, তবু স্বাধীনতার পর পোশাকে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন বিচারপতিরা গাউন পরেন, কিন্তু উইগ নয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও বিচারপতিরা উইগ পরেন না। সেখানে কালো গাউনই যথেষ্ট ধরা হয়।তবে যুক্তরাজ্যের কিছু আদালতে এখনো উইগ ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে ফৌজদারি আদালতে ব্যারিস্টার ও বিচারপতিরা সাদা ঘোড়ার লোমের উইগ পরেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু ক্ষেত্রে এই নিয়ম শিথিল হয়েছে।

এ নিয়ে সমালোচনাও আছে। অনেকে বলেন, এটি অপ্রয়োজনীয়। পুরোনো। আধুনিক যুগে এমন পোশাকের দরকার নেই। এতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে আদালতের দূরত্ব বাড়ে। আবার কেউ বলেন, আদালতের আলাদা পরিচয় থাকা উচিত। ইউনিফর্ম মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—এখানে একটি বিশেষ দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে।

উইগ আদালতের পরিবেশকে নাটকীয় করে তোলে। এটি বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও আনুষ্ঠানিক করে।

আরও একটি মনস্তাত্ত্বিক দিক আছে। পোশাক মানুষের আচরণ বদলায়। বিশেষ পোশাক পরলে দায়িত্ববোধ বাড়ে। বিচারকের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য হতে পারে।

আজকের দিনে অনেক দেশে বিতর্ক চলছে—উইগ রাখা হবে, না বাদ দেওয়া হবে। কেউ ঐতিহ্য রক্ষা করতে চান। কেউ সরলীকরণ চান।

তবু একটি বিষয় পরিষ্কার। বিচারপতিদের সাদা উইগ কোনো ধর্মীয় নিয়ম নয়। এটি আইনের অংশও নয়। এটি একটি ঐতিহাসিক অভ্যাস। রাজদরবারের ফ্যাশন থেকে যার শুরু। পরে আদালতের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। একসময় যা ছিল ক্ষমতার স্টাইলের অংশ, আজ তা হয়ে গেছে আইনের চিহ্ন।

এই ছোট্ট সাদা উইগ তাই শুধু চুল নয়। এটি ইতিহাসের অংশ। রাজনীতি, সংস্কৃতি ও বিচারব্যবস্থার মিলিত গল্প। একটি ফ্যাশন কীভাবে শতাব্দী পেরিয়ে আদালতের পরিচয়ে পরিণত হলো—সাদা উইগ তারই উদাহরণ।

বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প