বুধবার । মার্চ ৪, ২০২৬
মাহমুদ নেওয়াজ জয় ফিচার ৩ মার্চ ২০২৬, ১১:২৫ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

ডিপফেকের যুগে সত্য কীভাবে প্রমাণ করবেন?


Deepfake cover

ডিপফেক (Deepfake) শব্দটি এসেছে ‘ডিপ লার্নিং’ ও ‘ফেক’ থেকে

কিছুদিন আগেও ভিডিও ছিল সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ। চোখে দেখেছি— এই বাক্যটাই ছিল শেষ কথা। কিন্তু এখন সেই নিশ্চয়তা ভেঙে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমনভাবে মানুষের মুখ, কণ্ঠ, অঙ্গভঙ্গি নকল করতে পারে যে আসল-নকল বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই প্রযুক্তির নাম— ডিপফেক।

ডিপফেক (Deepfake) শব্দটি এসেছে ‘ডিপ লার্নিং’ ও ‘ফেক’ থেকে। অর্থাৎ, মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে তৈরি করা ভুয়া ছবি, ভিডিও বা অডিও। একসময় এই প্রযুক্তি ছিল গবেষণাগারের বিষয়। এখন মোবাইল অ্যাপেই সম্ভব।

তাহলে প্রশ্ন— এই ডিপফেকের যুগে সত্য প্রমাণ করবেন কীভাবে?

১. চোখের উপর ভরসা করবেন না
আগে বলা হতো— দেখা মানেই বিশ্বাস। এখন সেটি আর পুরোপুরি সত্য নয়। একটি ভিডিও ভাইরাল হলেই সেটি সত্য ধরে নেওয়া বিপজ্জনক।

বিশ্বজুড়ে বহু নেতা-নেত্রী ডিপফেকের শিকার হয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কিকে (Volodymyr Zelenskyy) নিয়ে একটি ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছিল, যেখানে তাকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানাতে দেখা যায়। পরে প্রমাণ হয়, সেটি ছিল ডিপফেক।

এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়— ভিডিওও এখন প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়।

২. উৎস যাচাই করুন
সত্য যাচাইয়ের প্রথম ধাপ হলো উৎস যাচাই। ভিডিওটি কোথা থেকে এসেছে? কোনো প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যম প্রকাশ করেছে কি? নাকি একটি অচেনা ফেসবুক পেজ বা টেলিগ্রাম চ্যানেল থেকে ছড়িয়েছে?

বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যম, যেমন- বিবিসি (BBC) বা আল জাজিরা (Al Jazeera) সাধারণত যাচাই ছাড়া বড় কোনো ভিডিও প্রকাশ করে না।
অপরিচিত উৎস থেকে আসা ভিডিওকে সন্দেহের চোখে দেখা উচিত।

Deepfake inner 1

৩. খুঁটিনাটি লক্ষ করুন
ডিপফেক ভিডিওতে প্রায়ই ছোট ছোট ত্রুটি থাকে। যেমন—
• ঠোঁটের সঙ্গে শব্দ পুরোপুরি মিলছে না
• চোখের পলক স্বাভাবিকের চেয়ে কম বা বেশি
• আলো-ছায়ার অসামঞ্জস্য
• কণ্ঠে যান্ত্রিকতা

সবসময় এসব ত্রুটি থাকবে না। প্রযুক্তি উন্নত হচ্ছে। তবে মনোযোগ দিয়ে দেখলে অনেক সময় অসঙ্গতি ধরা পড়ে।

৪. রিভার্স ইমেজ সার্চ ব্যবহার করুন
একটি ছবি সত্যি কিনা যাচাই করার সহজ উপায় হলো রিভার্স ইমেজ সার্চ। গুগল ইমেজে ছবি আপলোড করলে দেখা যায়, আগে কোথাও ব্যবহার হয়েছে কি না।

অনেক সময় পুরনো ছবি নতুন ঘটনার নামে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সেটিও এক ধরনের বিভ্রান্তি।

৫. ফ্যাক্ট-চেকিং ওয়েবসাইট দেখুন
বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান ভুয়া তথ্য শনাক্ত করে। বাংলাদেশেও কয়েকটি ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম কাজ করছে। আন্তর্জাতিকভাবে রয়টার্স ফ্যাক্ট চেক বা এএফপি ফ্যাক্ট চেকের মতো সংস্থাগুলো নিয়মিত ডিপফেক ও ভুয়া ভিডিও যাচাই করে।

ভাইরাল কিছু দেখলেই আগে সার্চ করে দেখুন— এটি নিয়ে কোনো ফ্যাক্ট-চেক প্রকাশ হয়েছে কি না।

Deepfake inner 2

৬. প্রযুক্তির সাহায্য নিন
যেমন প্রযুক্তি ডিপফেক তৈরি করছে, তেমন প্রযুক্তিই তা শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ডিপফেক শনাক্ত করার অ্যালগরিদম তৈরি করছে। যেমন মাইক্রোসফট (Microsoft) ভিডিও অথেনটিসিটি টুল তৈরি করেছে, যা ভিডিওর কারচুপি শনাক্ত করতে পারে।

ভবিষ্যতে হয়তো প্রতিটি ভিডিওর সঙ্গে একটি ডিজিটাল স্বাক্ষর থাকবে, যা দেখাবে— এটি আসল নাকি সম্পাদিত।

৭. আইনি ও সামাজিক সচেতনতা জরুরি
ডিপফেক শুধু রাজনৈতিক বিভ্রান্তি নয়, ব্যক্তিগত মানহানির অস্ত্রও হতে পারে। বিশেষ করে নারীদের বিরুদ্ধে এই প্রযুক্তি ভয়ংকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

আইন প্রণয়ন প্রয়োজন, কিন্তু তার চেয়েও বেশি দরকার সামাজিক সচেতনতা। কোনো ভিডিও দেখে তড়িঘড়ি শেয়ার করা মানে আপনি নিজেই বিভ্রান্তির অংশ হয়ে যাচ্ছেন।

Deepfake inner 5

৮. সন্দেহ করাই এখন দায়িত্ব
ডিপফেকের যুগে সন্দেহ করা মানে অবিশ্বাসী হওয়া নয়— বরং দায়িত্বশীল হওয়া। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে প্রযুক্তি সত্যের চেহারা নকল করতে পারে। ফলে সত্য প্রমাণের দায়িত্ব শুধু আদালত বা সাংবাদিকের নয়— সাধারণ নাগরিকেরও।

একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের কিছু অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে—
• ভাইরাল কিছু দেখলেই থামুন
• উৎস যাচাই করুন
• অন্য বিশ্বস্ত মাধ্যম খুঁজুন
• আবেগে শেয়ার করবেন না

৯. আবেগই সবচেয়ে বড় টার্গেট
ডিপফেক সাধারণত এমন বিষয় নিয়ে তৈরি হয়, যা আমাদের রাগান্বিত, আতঙ্কিত বা উত্তেজিত করে। কারণ আবেগ কাজ করলে মানুষ যুক্তি কম ব্যবহার করে। রাজনীতি, ধর্ম, যুদ্ধ, সেলিব্রিটি— এসব বিষয়েই ডিপফেক বেশি ছড়ায়।

তাই মনে রাখুন— কোনো ভিডিও যদি আপনাকে খুব দ্রুত উত্তেজিত করে, সেটি আগে যাচাই করুন।

Deepfake inner 3

১০. ভবিষ্যৎ কী?
ডিপফেক প্রযুক্তি বন্ধ করা যাবে না। যেমন ইন্টারনেট বন্ধ হয়নি, সামাজিক মাধ্যম বন্ধ হয়নি— তেমনই ডিপফেকও থাকবে। কিন্তু আমরা শিখতে পারি— কীভাবে এই নতুন বাস্তবতায় সত্যের পাশে দাঁড়াতে হয়।

হয়তো ভবিষ্যতে ‘ডিজিটাল সাক্ষরতা’ স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচির অংশ হবে। শিশুদের শেখানো হবে— কীভাবে ভুয়া ভিডিও চিনতে হয়, কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়। কারণ এখনকার লড়াই শুধু তথ্যের নয়— বিশ্বাসের।

ডিপফেকের যুগ আমাদের একটি কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে— আমরা কীভাবে জানব, কোনটি সত্য?
উত্তরটি একরৈখিক নয়। প্রযুক্তি, আইন, সাংবাদিকতা— সবই দরকার। কিন্তু সবচেয়ে বড় ভূমিকা আমাদের।

সত্য এখন আর চোখে দেখা নয়, বরং যাচাই করা। এই যুগে ‘দেখেছি’ যথেষ্ট নয়— বলতে হবে, ‘যাচাই করেছি।’

বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প