
লিভারপুলে সালাহ শুধু একজন ফুটবলার নন, সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীকও
আফ্রিকা কাপ অব নেশনস শুরুর প্রাক্কালে মোহাম্মদ সালাহ কে ঘিরে লিভারপুল শহরে চলছে তুমুল আলোচনা—তার অতীত, বর্তমান এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে।
লিভারপুল শহরের একটি ইয়েমেনি রেস্টুরেন্টে বসে দুই মিশরীয় নাগরিকের তর্ক যেন সেই বিতর্কের প্রতিচ্ছবি। একজনের মতে, তিনি লিভারপুলের সমর্থক, অন্যজন কেবল সালাহর ভক্ত। আলোচনায় উঠে আসে সালাহর পারফরম্যান্সের পাশাপাশি তার বেতন, ক্লাবের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সাম্প্রতিক মন্তব্য।
সম্প্রতি কোচ লিভারপুল কোচের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার কথা প্রকাশ্যে বলার পর সালাহর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। তবে মাঠে তার প্রভাব অটুট—ব্রাইটনের বিপক্ষে ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে কর্নার থেকে গোল করিয়ে প্রিমিয়ার লিগ ইতিহাসে এক ক্লাবের হয়ে সর্বোচ্চ গোল ও অ্যাসিস্টের রেকর্ড গড়েছেন তিনি।
লিভারপুলে সালাহর প্রভাব
লিভারপুলে সালাহ শুধু একজন ফুটবলার নন, সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীকও। শহরটির মুসলিম সম্প্রদায়, বিশেষ করে টক্সথ এলাকায়, তার আগমনের পর উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।
স্থানীয় এক ইমাম জানান, সালাহর প্রভাবে অনেক অমুসলিম ব্রিটিশ ইসলাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়েছে, এমনকি কেউ কেউ ইসলাম গ্রহণও করেছেন।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, সালাহ লিভারপুলে আসার পর মুসলিমবিদ্বেষমূলক অপরাধ ১৬ শতাংশ কমেছে এবং অনলাইনে বিদ্বেষমূলক মন্তব্যও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
লিভারপুলের দর্শকদের মুখে শোনা যায় সালাহকে নিয়ে জনপ্রিয় গান, যেখানে তার ধর্মীয় পরিচয়ও উঠে আসে। তিনি গোল করার পর সিজদা দেওয়ার দৃশ্য শহরের মানুষের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
বদলে যাওয়া সালাহ
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সালাহ নিজেও বদলেছেন। শুরুতে তিনি নিয়মিত মসজিদে যেতেন, মানুষের সঙ্গে মিশতেন। কিন্তু এখন পরিবার নিয়ে তিনি শহরের বাইরে বসবাস করছেন।
কিছু সমর্থকের মতে, তিনি এখন অনেকটাই “ব্র্যান্ড”—দুবাইয়ে সম্পত্তি, বড় বড় স্পন্সরশিপ চুক্তি এবং বৈশ্বিক খ্যাতি তাকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
তার এজেন্ট রামি আব্বাস ইশার সঙ্গে তার সম্পর্কও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দুজন মিলে সালাহর ক্যারিয়ার ও ব্যবসায়িক দিক পরিচালনা করেন, যা আধুনিক ফুটবলে এক সফল মডেল হিসেবে দেখা হয়।

সমালোচনা ও বিতর্ক
সালাহর সবচেয়ে বড় সমালোচনা এসেছে গাজা ইস্যুতে তার অবস্থান নিয়ে। গাজায় চলমান সংঘাত নিয়ে তার তুলনামূলক নীরবতা অনেক ভক্তকে হতাশ করেছে।
যদিও তিনি মানবতার পক্ষে কথা বলেছেন এবং সাহায্যও করেছেন, তবুও অনেকের মতে তার অবস্থান যথেষ্ট স্পষ্ট নয়।
সমালোচনা থাকলেও তার প্রতি লিভারপুল সমর্থকদের ভালোবাসা অটুট।
একজন সমর্থক বলেন, আমরা তাকে ভালোবাসি তিনি যেমন—মিশরীয়, মুসলিম, একজন বিশ্বমানের খেলোয়াড়।
আরেক তরুণ ভক্তের মতে, তিনি আমাদের দেখিয়েছেন, তুমি কোথা থেকে এসেছ তা গুরুত্বপূর্ণ নয়—স্বপ্ন বড় হওয়া উচিত।
৩৩ বছর বয়সে এসে সালাহ লিভারপুলের হয়ে সব বড় শিরোপা জিতেছেন। এখন প্রশ্ন—এটাই কি তার শেষ মৌসুম?
একদিকে তিনি ক্লাবের কিংবদন্তি, অন্যদিকে আধুনিক ফুটবলের বাণিজ্যিক বাস্তবতা তাকে নতুন পথে নিয়ে যেতে পারে—সৌদি আরব বা যুক্তরাষ্ট্রের লিগে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—মিশরের ছোট শহর থেকে উঠে আসা এই ফুটবলার শুধু একটি ক্লাব নয়, একটি শহর, একটি সংস্কৃতি এবং বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছেন।
মিডল ইস্ট আই
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প









































