
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ভারতের ক্ষমতায় আসে বিজেপি। এরপর সমীকরণ দ্রুত বদলাতে থাকে
মাত্র পনেরো বছর আগে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিজেপি’র আসনসংখ্যা ছিল ‘শূন্য’। অর্থাৎ সেই নির্বাচনে একটি আসনেও জিততে পারেনি দলটি। তার ঠিক পনেরো বছর পরে আজ সেই একই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসনে জেতা দলের নাম বিজেপি। শুধু বেশি আসন নয় প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় যাওয়াও নিশ্চিত করে ফেলেছে দলটি।
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর এই প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় যাচ্ছে বিজেপি। কিন্তু কিভাবে সম্ভব হল তা? এ নিয়েই আমাদের আজকের পর্যবেক্ষণ-
পশ্চিমবঙ্গ ভারতের প্রগ্রেসিভ তথা উদারপন্থি রাজ্য হিসেবে পরিচিত। একসময় যা ছিল বামেদের দুর্গ। টানা ৩৪ বছর রাজ্যটির ক্ষমতায় ছিল বামফ্রন্ট। এরপর মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেসের একচেটিয়া আধিপত্য। আর এবারের নির্বাচনে দক্ষিনপন্থি দল বিজেপির উত্থান। ভারতের রাজনীতির জন্য বার্তাবহ তো বটেই।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের কারণ হিসেবে অনেকে মনে করেন রাজ্যটিতে শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাব ছিল। ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে ক্ষমতা হারানোর পর বাম দলগুলো অনেকটা কোনঠাসা হয়ে পড়ে। একই অবস্থা হয় ন্যাশনাল কংগ্রেসেরও। বিশ্লেষকদের মতে, কঠোর ভৌগোলিক ও ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি দিয়ে সেই জায়গাটিই ধীরে ধীরে দখল করে নেয় বিজেপি।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ভারতের ক্ষমতায় আসে বিজেপি। এরপর সমীকরণ দ্রুত বদলাতে থাকে। বিজেপি কেবল একটি জাতীয় দল নয়, বরং এক সর্বভারতীয় সাংগঠনিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে শুরু করে। তাদের কৌশলের মূলে ছিল তিনটি বিষয়- শক্তিশালী ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, জনকল্যাণমূলক রাজনীতির প্রচার এবং হিন্দুত্ববাদী ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ।
এর মাধ্যমে একে একে অনেক রাজ্যে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় দলটি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কাজটা অত সহজে হয়নি। এজন্য তাদের একটা লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও বিজেপি ক্ষমতায় আসছে- এমন একটা প্রচার পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। অনেকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন, বিজেপি আসছে। কিন্তু সে দফায় সফলতা মেলেনি। তবে তার মাত্র পাঁচ বছর পরে ঠিকই পশ্চিমবঙ্গ জয় করলো বিজেপি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির মতো দক্ষিণপন্থি দলের উত্থান এবং তৃণমূলের পরাজয় বেশ কিছু বার্তা দেয়। তারমধ্যে দুটি বেশ উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, প্রথমবারের মতো কোনো ধর্মভিত্তিক দল পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় বসতে যাচ্ছে। এর আগে যে তিনটি দল রাজ্যের ক্ষমতায় ছিল- কংগ্রেস, বামফন্ট এবং তৃণমূল কংগ্রেস- এই দলগুলো মোটাদাগে উদার কিংবা মধ্যপন্থার দল হিসেবে পরিচিত।
দ্বিতীয়, তৃণমূলের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ভারতের রাজনীতিতে আঞ্চলিক দলগুলোর প্রভাব কমার যে ট্রেন্ড শুরু হয়েছে তাতে গতি আরও বাড়লো। এর আগে গেলো বছর বিহারেও আঞ্চলিক দলের হাত থেকে ক্ষমতা চলে এসেছে বিজেপির হাতে। একইসঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ভারতের রাজনীতিতে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের অবস্থানও দুর্বল করবে। কোনো কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবার মমতা বন্দোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যত নিয়েও চিন্তিত। কারণ বিজেপি রাজ্যের ক্ষমতায় আসার পর তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙনের বড় ধরণের আশঙ্কা আছে। বিজেপির তরফ থেকে এই চেষ্টার সম্ভাবনা প্রবল।
১৯৬৭ সালের পর থেকে ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে আঞ্চলিক দলগুলোর উত্থান শুরু হয়েছিল। সেসময় কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে বিভিন্ন রাজ্যে স্থানীয় ইস্যু, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল শক্তিশালী বেশ কিছু রাজনৈতিক দল। যেমন, তামিলনাড়ুর দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগম (ডিএমকে) ও অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগম (এআইএডিএমকে), পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস, মহারাষ্ট্রের শিবসেনা ও ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি), উত্তরপ্রদেশের সমাজবাদী দল (এসপি) ও বহুজন সমাজ পার্টি (বিএসপি), বিহারের রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) ও জনতা দল ইউনাইটেড (জেডিইউ), পাঞ্জাবের শিরোমণি আকালি দল, উড়িষ্যায় বিজু জনতা দল, অন্ধ্রপ্রদেশের তেলেগু দেশম পার্টি (টিডিপি), জম্মু ও কাশ্মিরে ন্যাশনাল কনফারেন্সের মত দল। এই দলগুলোই ভারতের রাজ্যভিত্তিক রাজনীতিকে শক্তিশালী করেছে এবং গণতন্ত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রক্ষা করেছে।
কিন্তু গেলো কিছু বছর ধরে ক্ষমতা হারাতে শুরু করেছে আঞ্চলিক দলগুলো। বিহারের কথাতো বলা হয়েছে। এছাড়া উড়িষ্যার ক্ষমতা হারিয়েছে বিজু জনতা দল। পাঞ্জাবের একসময়ের প্রভাবশালী শিরোমণি আকালি দল নেমে এসেছে তৃতীয় অবস্থানে। উত্তর প্রদেশের বহুজন সমাজ পার্টিও ক্ষয়িঞ্চু। এভাবে একের পর এক আঞ্চলিক দল দুর্বল হয়ে পড়ছে ভারতের রাজনীতিতে।
ফলে দিনে দিনে হয়তো দেশটির রাজনীতি অনেকটাই বাইপোলার তথা দ্বিমুখি হয়ে উঠবে। সীমাবদ্ধ হবে দুই সর্ব ভারতীয় দলের মধ্যে। যার একদিকে থাকবে বর্তমানের প্রবল পরাক্রমশালী বিজেপি আর অন্যদিকে ‘ক্লান্ত’ কংগ্রেস।
বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজ্যুয়াল










































