
ই-কমার্স ব্যবসা সহজে রান করতে হলে মূলত ৯টি কোর ডিপার্টমেন্টে টিমকে ভাগ করে নিতে হয়
রাহাত, দুর্দান্ত এক আইডিয়া নিয়ে শুরু করেছিল তার ই-কমার্স ব্র্যান্ড। শুরুতে নিজেই পাইকারি বাজার থেকে প্রোডাক্ট আনত, নিজেই ফেসবুকে পেজ সামলাত, আবার রাতে বসে কুরিয়ারের প্যাকেট রেডি করত। প্রথম দুই মাস ঠিকঠাক চললেও অর্ডার বাড়ার পর রাহাত হিমশিম খেয়ে গেল। কাস্টমার মেসেজ দিয়ে রিপ্লাই পায় না, ভুল সাইজের প্রোডাক্ট ডেলিভারি হচ্ছে, আর ওদিকে পেজের রিচও পড়ে গেছে। রাহাত বুঝল, একা আর সম্ভব না। এবার দরকার প্রফেশনাল টিম।
রাহাতের মতো এই গোলকধাঁধায় পড়েননি এমন ই-কমার্স উদ্যোক্তা খুঁজে পাওয়া ভার। ই-কমার্স ব্যবসা সহজে রান করতে হলে মূলত ৯টি কোর ডিপার্টমেন্ট বা বিভাগে টিমকে ভাগ করে নিতে হয়। আসুন জেনে নেওয়া যাক সেই ডিপার্টমেন্টগুলো এবং তাদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব সম্পর্কে:
১. সোর্সিং এবং ইনভেন্টরি ডিপার্টমেন্ট
একটি ই-কমার্সের প্রাণ হলো তার প্রোডাক্ট। এই ডিপার্টমেন্টের কাজ হলো সঠিক দামে সেরা কোয়ালিটির প্রোডাক্ট খুঁজে বের করা এবং তা স্টকে রাখা। এই ডিপার্টমেন্টের কাজ হচ্ছে বাজারের ট্রেন্ড বোঝা, পাইকারি বিক্রেতা বা ম্যানুফ্যাকচারারদের সাথে ডিল করা, প্রোডাক্টের কোয়ালিটি কন্ট্রোল (QC) করা এবং স্টকে কত মাল আছে আর কত শেষ হয়ে যাচ্ছে (ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট) তার হিসাব রাখা।
২. মার্কেটিং অ্যান্ড গ্রোথ ডিপার্টমেন্ট
আপনার প্রোডাক্ট যতই ভালো হোক, মানুষ যদি নাই জানে তবে বিক্রি হবে কীভাবে? এই ডিপার্টমেন্টের কাজ হলো কাস্টমারের কাছে ব্র্যান্ডকে আকর্ষণীয়ভাবে পৌঁছে দেওয়া। এই ডিপার্টমেন্টের দায়িত্ব হচ্ছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকে ক্রিয়েটিভ বিজ্ঞাপন চালানো, ডিজিটাল মার্কেটিং ও বুস্টিং হ্যান্ডেল করা, এসইও (SEO) নিয়ে কাজ করা।
৩. কন্টেন্ট টিম
মার্কেটিং টিম যেখানে বিজ্ঞাপন বা বুস্টিংয়ের পরিকল্পনা করে, এই টিম ঠিক তার পেছনের কন্টেন্ট তৈরি করে। আজকের যুগের জেন-জি কাস্টমারদের আকর্ষণ করতে এই টিমের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। তাদের কাজ হলো, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের জন্য ট্রেন্ডি রিলস ও শর্ট ভিডিও বানানো, বিজ্ঞাপনের জন্য আকর্ষণীয় স্ক্রিপ্ট এবং ক্যাপশন লেখা (কপিরাইটিং), প্রফেশনাল প্রোডাক্ট ফটোশুট করা এবং গ্রাফিক্স ডিজাইন মেইনটেইন করা।
৪. কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স বা সাপোর্ট ডিপার্টমেন্ট
ফেসবুক ইনবক্স, হোয়াটসঅ্যাপ বা ফোনে যারা কাস্টমারদের সাথে সরাসরি কথা বলেন, তারা হলেন এই ডিপার্টমেন্টের অংশ। ই-কমার্সে কাস্টমার ধরে রাখার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি হলো এটি। ডিপার্টমেন্টের মূল দায়িত্ব হলো পেজের মেসেজ ও কমেন্টের দ্রুত এবং অমায়িক রিপ্লাই দেওয়া, কাস্টমারের নানা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে অর্ডার কনফার্ম করা এবং প্রোডাক্ট নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে তা ঠান্ডা মাথায় সমাধান করা।
৫. বিজনেস ডেভেলপমেন্ট টিম
এই টিমের কাজ শুধু সাধারণ কাস্টমারের কাছে খুচরা বিক্রি করা নয় বরং অন্য বড় বড় বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সাথে বড় অর্ডার বা গিফটিং পার্টনারশিপের চুক্তি করা, ব্র্যান্ডের জন্য স্পনসরশিপ বা কো-ব্র্যান্ডিং ডিল খুঁজে আনা, ইনফ্লুয়েন্সারদের সাথে কোলাবোরেশন করা এবং নতুন নতুন বিজনেস অ্যাভিনিউ তৈরি করার মাধ্যমে ব্যবসার পরিধি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া।

যখনই আপনার টিমের যার যার দায়িত্ব নির্দিষ্ট থাকবে, তখন অর্ডার ম্যানেজমেন্ট হবে পানির মতো সহজ
৬. অপারেশনস অ্যান্ড লজিস্টিকস ডিপার্টমেন্ট
অর্ডার কনফার্ম হলে এবার সেটা কাস্টমারের হাত পর্যন্ত পৌঁছানোর নিখুঁত যজ্ঞ সামলায় এই ডিপার্টমেন্ট। তাদের মূল দায়িত্ব, অর্ডার হওয়া প্রোডাক্টগুলো ইনভেন্টরি থেকে বের করা, সুন্দর ও সুরক্ষিতভাবে প্যাকেজিং করা, ইনভয়েস বা বিল প্রিন্ট করা এবং বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের কাছে সময়মতো পার্সেল বুঝিয়ে দিয়ে ট্র্যাকিং করা।
৭. ফাইন্যান্স অ্যান্ড অ্যাডমিন ডিপার্টমেন্ট
দিনের শেষে ব্যবসায় কত লাভ হলো আর কত খরচ, তার নিখুঁত হিসাব না থাকলে যেকোনো ব্যবসা দ্রুত দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে। তাই প্রতিদিনের ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউটের হিসাব রাখা, কুরিয়ারের ক্যাশ অন ডেলিভারির (COD) টাকা ঠিকঠাক অ্যাকাউন্টে আসছে কিনা তা মেলানো, টিমের বেতন এবং প্রোডাক্ট কেনার বাজেট কন্ট্রোল করা।
৮. টেকনিক্যাল বা আইটি টিম
শুরুতে একটি ই-কমার্স ব্যবসা ফেসবুক পেজ বা সাধারণ রেডিমেড ওয়েবসাইট দিয়ে চললেও, অর্ডারের সংখ্যা যখন প্রতিদিন শত শত বা হাজারে পৌঁছায়, তখন একটি শক্তিশালী টেকনিক্যাল টিম ছাড়া পুরো সিস্টেম ধসে পড়তে পারে। আপনার ই-কমার্স ওয়েবসাইট বা অ্যাপ যেন সবসময় সচল থাকে, পেমেন্ট গেটওয়েতে কাস্টমাররা যাতে স্মুথলি টাকা পে করতে পারেন এবং সাইটের সিকিউরিটি যেন টাইট থাকে—সেটি এই টিম দেখে। এছাড়া কাস্টমার ডেটা ট্র্যাক করার জন্য পিক্সেল সেটআপ এবং অটোমেটিক ইনভেন্টরি সফটওয়্যার (ERP) মেইনটেইন করার দায়িত্বও তাদের।
৯. টেকনিক্যাল সাপোর্ট ও ডেটা অ্যানালিটিক্স টিম
আজকের যুগে ই-কমার্সের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো ‘ডেটা’। কোন বয়সের মানুষ কোন প্রোডাক্ট বেশি দেখছেন, কোন সময়ে সেল বেশি হচ্ছে, কিংবা কোন এলাকায় ডেলিভারি বেশি যাচ্ছে—এই ডেটাগুলো এনালাইসিস করার জন্য একটি ছোট ডেটা টিম প্রয়োজন হয়। এই টিম পুরো ৭টি ডিপার্টমেন্টের কাজের খতিয়ান বের করে। তারা মার্কেটিং টিমকে বলে দেয় কোন বিজ্ঞাপনে লস হচ্ছে আর কোনটায় লাভ; সোর্সিং টিমকে আগেভাগেই জানিয়ে দেয় আগামী মাসে কোন প্রোডাক্টের চাহিদা আকাশছোঁয়া হতে যাচ্ছে।

ই-কমার্স কোনো ‘ওয়ান-ম্যান শো’ নয়
টিম বড় করার স্মার্ট স্ট্র্যাটেজি:
শুরুতেই কি এই ৯ ডিপার্টমেন্টে ১০-১২ জন মানুষ লাগবে? একদমই না।ব্যবসার শুরুতে আপনি হয়তো নিজে সোর্সিং ও ফাইন্যান্স দেখবেন। আপনার সাথে প্রথম ১ জন পার্টটাইম বা ফুলটাইম মেম্বার নিতে পারেন কাস্টমার সাপোর্টের জন্য। এরপর ২য় মেম্বার নিতে পারেন লজিস্টিকস বা প্যাকিংয়ের জন্য। ব্যবসা যত বাড়বে, ফ্রিল্যান্সার বা ফুলটাইম লোক নিয়োগ দিয়ে এই ৯টি ডিপার্টমেন্টকে তত শক্তিশালী করবেন।
মনে রাখবেন, ই-কমার্স কোনো ‘ওয়ান-ম্যান শো’ নয়। যখনই আপনার টিমের যার যার দায়িত্ব নির্দিষ্ট থাকবে, তখন অর্ডার ম্যানেজমেন্ট হবে পানির মতো সহজ, আর আপনার ই-কমার্স ব্র্যান্ডও হয়ে উঠবে একটি সফল কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প














































