
বক্স অফিসে ইতিহাস গড়ল ‘দৃশ্যম ৩’
২০১৩ সালে এক সাধারণ কেব্ল ব্যবসায়ী জর্জ কুট্টির গল্প নিয়ে যখন পরিচালক জিতু জোসেফ তাঁর মালয়ালম থ্রিলার ‘দৃশ্যম’ নির্মাণ করেছিলেন, তখন হয়তো কেউ ভাবেনি এটি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম সফল ও প্রভাবশালী ফ্র্যাঞ্চাইজিতে পরিণত হবে। প্রথম কিস্তির ব্যাপক জনপ্রিয়তার পর করোনাকালে আসা দ্বিতীয় কিস্তিও সমান প্রশংসিত হয়েছিল, যার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হিন্দি রিমেক দুটিও পেয়েছিল তুমুল ব্যবসায়িক সাফল্য। এবার সেই ধারাবাহিকতায় বক্স অফিসে ঝড় তুলতে হাজির হয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজির নতুন সিনেমা ‘দৃশ্যম ৩’।
গত ২১ মে মালয়ালম সিনেমার কিংবদন্তি অভিনেতা মোহনলালের জন্মদিনে মুক্তি পায় বহুল প্রতীক্ষিত এই ছবিটি। আর মুক্তির পর মাত্র প্রথম তিন দিনেই বিশ্বব্যাপী ১০০ কোটি টাকা আয়ের মাইলফলক স্পর্শ করে এটি। বর্তমানে ছবিটির সাফল্যের গ্রাফ আকাশচুম্বী; ইতিমধ্যে ভারতীয় বক্স অফিসেই এটি ১০০ কোটির গণ্ডি পেরিয়ে গেছে, আর বিশ্বব্যাপী এর মোট আয় ছুঁয়েছে ২১৯ কোটি টাকারও বেশি। বর্তমান সময়ে যখন ওটিটি ও অন্যান্য মাধ্যমের কারণে প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের মনোযোগ ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে, তখন একটি থ্রিলার ফ্র্যাঞ্চাইজির তৃতীয় কিস্তির এই অভাবনীয় সাফল্যকে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা কেবল আর্থিক লাভ নয়, বরং একটি বড় সাংস্কৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখছেন।
স্বল্প শিক্ষিত, সাধারণ ও পরিবারপ্রেমী একজন মানুষ জর্জ কুট্টি। কিন্তু নিজের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে তিনি এমন এক জটিল ও আইনি পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, যা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রয়োজন ছিল অসাধারণ মেধা ও ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনা। ক্ষমতা, প্রশাসন ও পুলিশের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েও একজন সাধারণ মানুষ যে নিজের উপস্থিত বুদ্ধি আর সিনেমার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে লড়াই করতে পারে, জর্জ কুট্টি চরিত্রটি তারই প্রতীক। সে কারণেই এই চরিত্রটি দর্শক হৃদয়ে পারিবারিক বন্ধন ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের এক অনন্য রূপ হয়ে উঠেছে।
দীর্ঘ বিরতির পর যখন ‘দৃশ্যম ৩’ বড় পর্দায় আসে, তখন নির্মাতাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দর্শকদের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা পূরণ করা। দর্শক কেবল একটি নতুন রহস্যের গল্প দেখতে চায়নি, তারা জানতে চেয়েছিল এত বছর পর জর্জ কুট্টি ও তাঁর পরিবারের জীবনে ঠিক কী ঘটেছে। পরিচালক জিতু জোসেফ দর্শকদের সেই মনস্তত্ত্বকে পুঁজি করেই সাজিয়েছেন নতুন অধ্যায়। আগের দুই কিস্তির টানটান উত্তেজনা, মানসিক চাপ ও পারিবারিক আবেগকে অক্ষুণ্ণ রেখে তিনি এবার গল্পকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে গেছেন, যা শুধু পুরোনো দর্শকদের নস্টালজিয়াকেই উসকে দেয়নি, বরং নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও সমান আকর্ষণীয় প্রমাণিত হয়েছে।
ভারতীয় চলচ্চিত্রে অনেক বড় বড় সুপারস্টার থাকলেও সব তারকা সব চরিত্রে সমান বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারেন না। তবে মোহনলালের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। জর্জ কুট্টি চরিত্রটি যেন তাঁর জন্যই তৈরি। সংলাপের চেয়ে চোখের ভাষা দিয়ে অভিনয় করা, ভেতরের আতঙ্ককে নীরবতায় প্রকাশ করা কিংবা পারিবারিক ভালোবাসাকে সংযত আবেগে ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি আবারও নিজের অনন্যতা প্রমাণ করেছেন। ৭০ বা ৮০ কোটির বিশাল বাজেটের মারদাঙ্গা অ্যাকশন ছবি ছাড়াই যে একজন অভিনেতা শুধু শক্তিশালী অভিনয় দিয়ে দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে টেনে আনতে পারেন, ‘দৃশ্যম ৩’ তার এক জীবন্ত উদাহরণ। অনেকেই মনে করছেন, জর্জ কুট্টি চরিত্রটি মোহনলালের দীর্ঘ ও বর্ণিল অভিনয়জীবনের অন্যতম স্মরণীয় সৃষ্টি।
একসময় মালয়ালম সিনেমা মূলত দক্ষিণ ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু গত এক দশকে ‘দৃশ্যম’, ‘প্রেমাম’, ‘২০১৮’, ‘মানজুমেল বয়েজ’ কিংবা ‘আভেশাম’—এর মতো ছবিগুলো প্রমাণ করেছে যে শক্তিশালী গল্প বলার ক্ষমতা থাকলে ভাষা কোনো বাধা হতে পারে না। বর্তমানে ‘দৃশ্যম ৩’ ভারতের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে দারুণ ব্যবসা করছে। আঞ্চলিক ভাষার ছবির আন্তর্জাতিক বাজার এত বিস্তৃত হওয়া মালয়ালম চলচ্চিত্রশিল্পের জন্য এক বিরাট ইতিবাচক পরিবর্তন।
ছবিটির এই বিপুল সাফল্যের পর দর্শকদের মনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—জর্জ কুট্টির গল্প কি এখানেই শেষ, নাকি আসবে ‘দৃশ্যম ৪’? নির্মাতারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিষয়ে কিছু জানাননি। তবে ভক্তদের মধ্যে নতুন জল্পনা শুরু হয়ে গেছে। চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বাণিজ্যিক লাভের জন্য জোরপূর্বক নতুন কিস্তি বানানো হলে ‘দৃশ্যম’-এর আসল জাদু হারিয়ে যেতে পারে, তাই এই ফ্র্যাঞ্চাইজিকে আরও এগিয়ে নিতে হলে গল্পের উচ্চমান ধরে রাখাই হবে প্রধান শর্ত।












































