
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ি ।। ছবি: সিএনএন থেকে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি এখন ২৪ বিলিয়ন ডলারের জব্দকৃত ইরানি সম্পদ মুক্ত করার প্রশ্নে আটকে আছে বলে জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ি।
মোহসেন রেজায়ি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর পুরোনো প্রজন্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা। ইরান-ইরাক যুদ্ধে তিনি অংশ নেন এবং ১৯৮১ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত আইআরজিসির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা পরিষদ এক্সপিডিয়েন্সি কাউন্সিলে যোগ দেন এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির অধীনে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও কাজ করেন। তিনি চারবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিলেও কখনো জয়ী হতে পারেননি।
শুক্রবার তেহরানে সিএনএনকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে রেজায়ি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন যদি এই অর্থ ছাড় করতে রাজি হয়, তাহলে শান্তি আলোচনায় অগ্রগতি সম্ভব। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র আবার যুদ্ধ শুরু করলে তারা ‘একটি অন্ধকার করিডোরে প্রবেশ করবে’।
রেজায়ি বলেন, ‘আলোচনা অচলাবস্থায় রয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেই এই অচলাবস্থা ভাঙতে হবে। এখন বল ট্রাম্পের কোর্টে।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান দাবি করেছে যে অন্তর্বর্তীকালীন কোনো চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই ১২ বিলিয়ন ডলার এবং পরবর্তী পর্যায়ে আরও ১২ বিলিয়ন ডলার মুক্ত করতে হবে।
তবে মার্কিন কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, এই মুহূর্তে অর্থ ছাড় করা হলে তেহরানের ওপর ওয়াশিংটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হারিয়ে যাবে।
ট্রাম্প এমন একটি চুক্তি চান, যা ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির তুলনায় অনেক বেশি কঠোর হবে। একই সঙ্গে তিনি এমন কোনো পদক্ষেপ এড়াতে চান, যা ইরানকে নগদ অর্থ উপহার দেওয়ার মতো দেখাতে পারে।
সাক্ষাৎকারে রেজায়ি যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ এবং নতুন করে হামলা হলে তেহরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।
‘এটি আস্থার পরীক্ষা’
জব্দকৃত অর্থ মুক্ত করার দাবিকে তিনি আস্থা তৈরির পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। রেজায়ি বলেন, ‘যদি ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চুক্তি করতে চান, তাহলে এই ২৪ বিলিয়ন ডলার হলো আস্থার একটি পরীক্ষা। যুক্তরাষ্ট্রকে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে, তাহলেই সামনে পথ খুলবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি আমাদের নিজের অর্থ, আমেরিকার অর্থ নয়।’
যুদ্ধ ফিরলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হবে
যুক্তরাষ্ট্র আবার সামরিক অভিযান শুরু করলে যুদ্ধ পারস্য উপসাগরের বাইরে ছড়িয়ে পড়বে বলেও সতর্ক করেন রেজায়ি। তার দাবি, প্রয়োজনে ইরান হরমুজ প্রণালি থেকে শুরু করে ভারত মহাসাগর, বাব আল-মান্দাব প্রণালি, লোহিত সাগর এবং ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত সামরিক কার্যক্রম বিস্তৃত করতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত যেসব মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা হয়েছে, তার বাইরে আরও মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করে আমরা যুদ্ধকে নতুন মাত্রা দেব।’
তবে একই সঙ্গে তিনি এও যোগ করেন, ‘যুদ্ধের সম্ভাবনা এখন কম।’
ট্রাম্প-খামেনি বৈঠকের সম্ভাবনা নাকচ
সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির স্বাস্থ্য বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার ভূমিকা সম্পর্কে প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেননি রেজায়ি। তবে ট্রাম্প ও খামেনির সম্ভাব্য বৈঠকের বিষয়টি তিনি স্পষ্টভাবে নাকচ করে দেন।
তিনি বলেন, ‘এটি ঘটবে না। আমরা এখনো আলোচনার প্রাথমিক পর্যায়ে আছি এবং ট্রাম্প নিজেই আলোচনাকে স্থবির করে দিয়েছেন।’
এর আগে চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প বলেছিলেন, খামেনির সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে এবং তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারলে তিনি সম্মানিত বোধ করবেন।
হরমুজ প্রণালির ওপর সার্বভৌমত্বের দাবি পুনর্ব্যক্ত
রেজায়ি বলেন, বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি বড় অংশ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই জলপথের ওপর ইরান ও ওমানের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে।
তার ভাষায়, দুই দেশ যৌথভাবে এ প্রণালির ব্যবস্থাপনা করবে। জাহাজ চলাচলের জন্য অর্থ আদায়ের প্রসঙ্গে তিনি এটিকে টোল বলতে রাজি হননি। বরং তিনি বলেন, প্রণালির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বহনের জন্য একটি ফি নেওয়া হবে।
‘ইরানের প্রকৃত সক্ষমতা তখনই দেখা যাবে’
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া ৪০ দিনের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় ইরান মধ্যপ্রাচ্যের ১২টি দেশে বিভিন্ন সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল বলে উল্লেখ করেন রেজায়ি।
তিনি বলেন, আলোচনায় ব্যর্থতা এলে এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ভূখণ্ডে সরাসরি হামলা চালায়, তাহলে ইরান প্রস্তুত রয়েছে।
তার ভাষায়, ‘তখন বিশ্ব ইরানের প্রকৃত সক্ষমতা দেখতে পাবে, কারণ আমাদের স্থলবাহিনীর শক্তি আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার চেয়েও অনেক বেশি।”
‘এটাই ইরানের প্রথম বিজয়’
রেজায়ি বর্তমান সংঘাতকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ৪৭ বছরের ইতিহাসে ইরানের প্রথম সামরিক বিজয় হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘এটাই প্রথমবার যখন ইরান কোনো যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে। এর আগে প্রতিটি যুদ্ধে ইরান পরাজিত হয়েছে।’











































