
মেসি
একসময় কবিরা আকাশের দিকে তাকিয়ে লিখতেন। তারপর তারা প্রেমিকার চোখের দিকে তাকিয়ে লিখলেন। তারপর যুদ্ধ এল, সাম্রাজ্য এল, বিপ্লব এল—মানুষের ভাষা নতুন নতুন উপমা খুঁজে পেল। কিন্তু কিছু কিছু মুহূর্ত আসে, যখন ভাষা নিজেই নিজের সামনে পরাজিত হয়ে দাঁড়ায়। কলম হাতে থাকে, কাগজ সামনে থাকে, অথচ লেখা আসে না।
সেই অবস্থার নাম—শূন্য মেসি।
শূন্য মানে অনুপস্থিতি নয়। শূন্য মানে এমন এক পূর্ণতা, যার পর আর কোনো সংখ্যা বসানো যায় না। যেমন মহাশূন্য সবকিছুকে ধারণ করে, অথচ নিজে দৃশ্যমান নয়। মেসিও তেমন এক বিস্ময়; তিনি মাঠে থাকেন, অথচ তাকে বোঝার ভাষা মাঠের বাইরেই হারিয়ে যায়।
সমালোচকেরা একসময় তাকে মাপতে বসেছিল। গোল গুনেছিল, অ্যাসিস্ট গুনেছিল, ট্রফি গুনেছিল। তারপর রেকর্ড গুনেছিল। তারপর ইতিহাস। তারপর কিংবদন্তি। তারপর তারা হঠাৎ আবিষ্কার করল—সংখ্যা শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু মেসি শেষ হননি।
ভক্তদের অবস্থাও আলাদা নয়। তারা চিৎকার করতে করতে একসময় নীরব হয়ে যায়। কারণ বিস্ময়েরও একটা সীমা আছে; তার পরে শুধু স্তব্ধতা থাকে। যে মানুষটাকে দেখে দশ বছর অবাক হয়েছিলে, পনেরো বছর অবাক হয়েছিলে, বিশ বছর পরেও যদি সে নতুন বিস্ময় তৈরি করে, তখন আর বিস্ময় প্রকাশ করা যায় না। তখন শুধু তাকিয়ে থাকতে হয়।
পৃথিবীর সমস্ত প্রশংসা ধীরে ধীরে তার কাছে পুরোনো হয়ে গেছে।
ওমর খৈয়াম লিখেছিলেন—প্রিয়ার কালো চোখ একদিন ঘোলাটে হয়ে যাবে। রুটির উষ্ণতা ফুরিয়ে যাবে। মদের পেয়ালা খালি হয়ে যাবে। সময় তার সমস্ত রং মুছে দেবে। কিন্তু মানুষের কিছু কিছু সৃষ্টি আছে, যাদের ওপর বয়সের আইন কাজ করে না।
মেসির গোলও তেমন। প্রিয়ার চোখ ঘোলাটে হলেও, রুটি-মদ ফুরিয়ে গেলেও মেসির এক একটা গোল নব যৌবনা।
স্কোরবোর্ডে লেখা সংখ্যা নয়। ক্যালেন্ডারের বিরুদ্ধে মানুষের বিদ্রোহ। প্রতিবার তিনি বল স্পর্শ করেন, মনে হয় সময়কে আবার প্রথম দিনে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন। যেন যৌবন কোনো বয়স নয়, একটি প্রতিভার নাম।
তাই আজকাল মেসিকে নিয়ে কথা বলতে গেলেই শব্দ কম পড়ে।
কেউ তাকে সেরা বলে। কথাটা ছোট হয়ে যায়।
কেউ তাকে জাদুকর বলে। সেটাও যথেষ্ট নয়।
কেউ তাকে ইতিহাস বলে। ইতিহাসও তো অতীতের বিষয়; অথচ তিনি এখনও বর্তমানকে বদলে দিচ্ছেন।
ফলে শেষ পর্যন্ত সবাই এক অদ্ভুত নীরবতায় পৌঁছে যায়।
সমালোচক চুপ।
ভক্ত চুপ।
প্রতিদ্বন্দ্বী চুপ।
পৃথিবী চুপ।
কারণ কিছু কিছু দৃশ্যের সামনে ভাষা দাঁড়াতে পারে না। যেমন সমুদ্রের গভীরতা মাপার জন্য হাতের মুঠো যথেষ্ট নয়, তেমনি মেসিকে ব্যাখ্যা করার জন্য অভিধান যথেষ্ট নয়।
তিনি ফুটবলার নন আর, তিনি এক ধরনের নীরবতা। এমন এক নীরবতা, যার ভেতরে লক্ষ লক্ষ কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায়।
আর সেই কারণেই তার নামের আগে আজ সবচেয়ে উপযুক্ত শব্দটি হয়তো ‘মহান’, ‘সেরা’ কিংবা ‘অতুলনীয়’ নয়।
সবচেয়ে উপযুক্ত শব্দটি—
শূন্য।
কারণ শূন্য থেকেই সৃষ্টি শুরু হয়।
আর শূন্যেই এসে সমস্ত হিসাব শেষ হয়ে যায়।
মেসি সেই শূন্য, যার পরে আর কিছু যোগ করার থাকে না।






































