বুধবার । মার্চ ৪, ২০২৬
মাহমুদ নেওয়াজ জয় মতামত ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:২৫ অপরাহ্ন
শেয়ার

গণতন্ত্রের চার বাঁক: ১৯৯১–২০০৮ নির্বাচনে ক্ষমতার পালাবদলের গল্প


4 elections

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনগুলো আলাদা আলাদা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এই চারটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন সামরিক শাসন-পরবর্তী গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি স্পষ্ট হয়েছে ভোটের হিসাব আর আসনের হিসাবের ফারাক, জোট রাজনীতির উত্থান এবং রাজনৈতিক শক্তির ভৌগোলিক বিন্যাস। বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী—এই চারটি দলকে কেন্দ্র করেই মূলত এই সময়ের রাজনীতি ঘুরেছে।

১৯৯১: সামরিক শাসনের পর প্রথম বড় পরীক্ষা
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটি ছিল এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পর প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন। মানুষ দীর্ঘ সময়ের সামরিক শাসনের পর আবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়। নির্বাচনে দেখা যায়, ভোটের হিসাবে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে পার্থক্য ছিল খুবই সামান্য। বিএনপি পেয়েছিল প্রায় ৩০.৮ শতাংশ ভোট, আর আওয়ামী লীগ পেয়েছিল প্রায় ৩০.১ শতাংশ। কিন্তু আসনের হিসাবে ব্যবধান ছিল বড়—বিএনপি পেয়েছিল ১৪০টি আসন, আর আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৮৮টি।

এই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি পেয়েছিল প্রায় ১১.৯ শতাংশ ভোট এবং ৩৫টি আসন। জামায়াতে ইসলামী পেয়েছিল প্রায় ১২.১ শতাংশ ভোট, কিন্তু আসন পেয়েছিল মাত্র ১৮টি। এখানেই প্রথম বড়ভাবে বোঝা যায়, বাংলাদেশের ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ পদ্ধতিতে ভোটের শতাংশ আর আসনের সংখ্যা এক নয়। সামান্য ভোট এগিয়ে থাকলেই অনেক বেশি আসন পাওয়া সম্ভব।

ভৌগোলিকভাবে বিএনপি তখন শক্ত ছিল রাজশাহী, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে। আওয়ামী লীগ তুলনামূলকভাবে খুলনা ও বরিশালের কিছু অংশে ভালো করেছিল। জামায়াতের ভোট ছিল নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় কেন্দ্রীভূত—তারা অনেক জায়গায় দ্বিতীয় বা তৃতীয় হলেও কম আসন জিততে পেরেছিল।

১৯৯৬: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ক্ষমতার বদল
১৯৯৬ সালের নির্বাচনটি হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে, যা তখন রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় ঘটনা। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ২১ বছর পর আবার ক্ষমতায় ফেরে। আওয়ামী লীগ পেয়েছিল প্রায় ৩৭.৪ শতাংশ ভোট এবং ১৪৬টি আসন। বিএনপি পেয়েছিল প্রায় ৩৩.৬ শতাংশ ভোট এবং ১১৬টি আসন।

এই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির ভোটের হার ছিল তুলনামূলক বেশি—প্রায় ১৬.৪ শতাংশ। তারা পেয়েছিল ৩২টি আসন। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী পেয়েছিল প্রায় ৮.৬ শতাংশ ভোট পেলেও মাত্র ৩টি আসন জিততে পারে। অর্থাৎ ভোট থাকলেও আসনে তার প্রতিফলন হয়নি।

বিভাগভিত্তিকভাবে এই নির্বাচনে ঢাকা ও এর আশপাশে আওয়ামী লীগের আধিপত্য স্পষ্ট হয়। খুলনা ও চট্টগ্রামে বিএনপি ও জাতীয় পার্টি কিছু আসনে ভালো করে। বিএনপির ফল বেশ ভালো হয় রাজশাহী বিভাগে। সিলেট ও বরিশালে ফলাফল ছিল বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। এই নির্বাচনেই পরিষ্কার হয় যে জাতীয় পার্টি একক শক্তি হিসেবে নয়, বরং ‘কিংমেকার’ ধরনের একটি দল হিসেবে রাজনীতিতে টিকে আছে।

২০০১: জোট রাজনীতির বড় উত্থান
২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি টার্নিং পয়েন্ট। এই নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ চারদলীয় জোট বিশাল জয় পায়। বিএনপি এককভাবে প্রায় ৪০.৯৭ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৯৩টি আসন জেতে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ প্রায় ৪০.১৩ শতাংশ ভোট পেলেও আসন পায় মাত্র ৬২টি।

এটাই বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যের উদাহরণ। ভোটের ব্যবধান খুবই কম, কিন্তু আসনের ব্যবধান আকাশ–পাতাল। জামায়াতে ইসলামী এই নির্বাচনে প্রায় ৪.৩ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৭টি আসন জেতে। জাতীয় পার্টি পেয়েছিল প্রায় ৭.২৫ শতাংশ ভোট এবং ১৪টি আসন।

ভৌগোলিকভাবে এই নির্বাচনে বিএনপি–জামায়াত জোট চট্টগ্রাম, সিলেট এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় একচেটিয়া আধিপত্য গড়ে তোলে। রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলও জোটের দখলে ছিল। আওয়ামী লীগ ঢাকা, বরিশাল ও খুলনার কিছু আসন ধরে রাখতে পারলেও সার্বিকভাবে বড় ধাক্কা খায়।

এই নির্বাচন প্রমাণ করে দেয়—বাংলাদেশে একক দল নয়, বরং শক্তিশালী জোটই নির্বাচনে বড় জয় এনে দিতে পারে।

২০০৮: মহাজোটের ভূমিধস জয়
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনটি হয় দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট ও সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ–নেতৃত্বাধীন মহাজোট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয় পায়। আওয়ামী লীগ এককভাবে প্রায় ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়ে ২৩০টি আসন জিতে নেয়।

বিএনপি এই নির্বাচনে প্রায় ৩২.৫ শতাংশ ভোট পেলেও আসন পায় মাত্র ৩০টি। জাতীয় পার্টি পেয়েছিল প্রায় ৭ শতাংশ ভোট এবং ২৭টি আসন। জামায়াতে ইসলামী পেয়েছিল প্রায় ৪.৬ শতাংশ ভোট, কিন্তু মাত্র ২টি আসনে জয়ী হয়।

বিভাগভিত্তিকভাবে ঢাকা বিভাগে আওয়ামী লীগের আধিপত্য ছিল প্রায় সম্পূর্ণ। রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট ও খুলনাতেও আওয়ামী লীগ বড় ব্যবধানে জয় পায়। চট্টগ্রামে মহাজোট ও জাতীয় পার্টি কিছু আসন পেলেও বিএনপির উপস্থিতি ছিল সীমিত।

২০০৮ সালের নির্বাচন জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হয়ে আসে। বিশেষ করে জামায়াত কার্যত সংসদে প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত হয়।

ভোট বনাম আসন: বাংলাদেশের রাজনীতির স্থায়ী বৈপরীত্য
এই চারটি নির্বাচন একসাথে দেখলে একটি বিষয় খুব পরিষ্কার—বাংলাদেশে ভোটের শতাংশ ও সংসদীয় আসনের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক নেই। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ প্রায় সমান ভোট পেলেও আসনে ব্যাপকভাবে পিছিয়ে পড়ে। আবার ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ভোটে এগিয়ে থাকার পাশাপাশি আসনেও প্রায় একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।

এর মূল কারণ নির্বাচনী ব্যবস্থা। ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ পদ্ধতিতে একটি আসনে এক ভোট বেশি পেলেই পুরো আসন জিতে নেওয়া যায়। ফলে সামান্য ভোটের ব্যবধান জাতীয় রাজনীতিতে বিশাল ক্ষমতার ব্যবধানে রূপ নেয়।

১৯৯১ থেকে ২০০৮—এই চারটি নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিকে স্পষ্টভাবে দুই মেরুতে ভাগ করে দেয়। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ মূল শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আর জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী সময়ভেদে জোটসঙ্গী বা সীমিত প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে টিকে আছে। এই সময়ের নির্বাচনগুলো শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং বাংলাদেশের ভোটার আচরণ, জোট রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর শক্তি ও দুর্বলতাকেও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।