শনিবার । এপ্রিল ৪, ২০২৬
জেরেমি ওয়াইল্ডেম্যান আন্তর্জাতিক ৩ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৫ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

এক্সপ্লেইনার

ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে কানাডার দ্বিমুখী নীতি: প্রশ্নবিদ্ধ ‘নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা’


Mark Carney

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ২০ জানুয়ারি দাভোসে দেওয়া এক বক্তৃতার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কানাডার মতো মধ্যম শক্তির দেশগুলোকে একত্রে কাজ করে মানবাধিকার, টেকসই উন্নয়ন, সংহতি, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার মতো মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

তার এই বক্তৃতা এমন এক সময় দেওয়া হয়েছিল, যখন দীর্ঘদিন ধরে সমর্থিত ‌‘নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’ ভেঙে পড়ার লক্ষণ দেখা দিচ্ছিল। এর একটি বড় কারণ ছিল যুক্তরাষ্ট্র—যে দেশটি নিজেই এই ব্যবস্থার অন্যতম নির্মাতা—সে নিজেই তা থেকে সরে আসছে বলে মনে হওয়া। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিমা মিত্র দেশগুলোর, কানাডাসহ, কিছু ভূখণ্ড দখলের হুমকিও দিয়েছে।

কার্নি সতর্ক করে বলেন, এমন একটি বিশ্বে যেখানে পরাশক্তিগুলোর কর্মকাণ্ডের ওপর কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, সেখানে মধ্যম শক্তির দেশগুলোর পারস্পরিক সুরক্ষার জন্য একসঙ্গে কাজ করা জরুরি। তিনি প্রস্তাব দেন—সবাই মিলে আরও বড়, শক্তিশালী ও ন্যায়ভিত্তিক একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত।

তাহলে প্রশ্ন ওঠে—এই বক্তব্যের মাত্র এক মাস পরই কেন তার সরকার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে চালানো অবৈধ আগ্রাসী যুদ্ধকে সমর্থন করল?

ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতি খারাপ—এটি সত্য, যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্ষেত্রেও অনুরূপ সমালোচনা রয়েছে। কিন্তু তবুও এই যুদ্ধ জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, যেখানে কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক আইনও লঙ্ঘন করে, কারণ সেখানে যুদ্ধ ঘোষণা করতে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন।

যুদ্ধ সবচেয়ে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথ খুলে দেয়—জীবনধারণ ও জীবনরক্ষাকারী অবকাঠামো ধ্বংস হয়, অর্থনীতি ভেঙে পড়ে, এবং অসংখ্য বেসামরিক মানুষ নিহত হয়। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র একটি ইরানি স্কুলে বোমা হামলা চালায়, যাতে ১৭০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়, যাদের অধিকাংশই শিশু। এরপর থেকে দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেও ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো কানাডাতেও এই যুদ্ধ জনপ্রিয় নয়। দাভোস বক্তৃতার পর সমালোচনার মুখে পড়ে কানাডা সরকার তাদের প্রাথমিক সমর্থন কিছুটা নরম করে।

৩ মার্চ কার্নি স্বীকার করেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল জাতিসংঘের সমর্থন ছাড়াই এবং মিত্রদের সঙ্গে পরামর্শ না করেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে তার সমালোচনা মূলত যুদ্ধের বিষয়বস্তুর চেয়ে প্রক্রিয়া ও আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে ছিল। তিনি একই সঙ্গে সংঘাতে ইরানের ভূমিকাও জোর দিয়ে তুলে ধরেন, যদিও আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে ইরানই এখানে আক্রমণের শিকার।

স্পষ্ট বৈপরীত্য
গত এক মাসে কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ ইরান, ইউক্রেন ও লেবানন প্রসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ যে বিবৃতি দিয়েছেন, তা ইঙ্গিত দেয়—কানাডা প্রকৃত আক্রমণকারীদের তুলনায় ইরানকেই বেশি দায়ী করছে।

সংঘাতের উৎস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আনন্দের বিবৃতিগুলোতে বারবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রাথমিক হামলার বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে। বরং তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়াকে—যেমন উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোতে হামলা বা হরমুজ প্রণালি অবরোধের ঘটনাকে।

ইরানের এসব পদক্ষেপকে ‘নিন্দনীয়’ বলা হলেও, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাকে কেবল ‘অফেন্সিভ অপারেশন’ বলা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইনও এখানে বেছে বেছে প্রয়োগ করা হচ্ছে। উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ইরানের হামলা বা বিদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা কানাডা নিন্দা করলেও, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় বেসামরিক মানুষ বা অবকাঠামো ধ্বংসের ক্ষেত্রে তারা একই ভাষা ব্যবহার করেনি।

অর্থাৎ, সর্বজনীন নীতিমালাকে নিজের সুবিধামতো ব্যবহার করা হচ্ছে—যার ফলে এক ধরনের ‘বৈশ্বিক অ্যাপারথাইড’ ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, যেখানে শোষিত গ্লোবাল সাউথের জন্য এক সেট নিয়ম, আর শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর জন্য আরেক সেট নিয়ম।

এই অবস্থান ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে কানাডার ভাষার সঙ্গে তীব্র বৈপরীত্য সৃষ্টি করে।

১৩ মার্চ ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে আনন্দ স্পষ্টভাবে রাশিয়াকে আগ্রাসী হিসেবে উল্লেখ করেন এবং এর তীব্র নিন্দা জানান। পাশাপাশি রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কথাও উল্লেখ করেন।

কিন্তু ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে কানাডা এমন কোনো অবস্থান নেয়নি।

২৪ মার্চ তিনি ইউক্রেনের অবকাঠামোর ওপর রুশ হামলাকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, ‘দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’ কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের একই ধরনের হামলার ক্ষেত্রে তিনি এমন ভাষা ব্যবহার করেননি।

২৬ মার্চ কানাডা সরকার ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে, কিন্তু যুদ্ধ শুরুকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পরদিন আনন্দ জি৭ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সংহতির একটি ছবি শেয়ার করেন।

তার বক্তব্য ও ভিডিওগুলোতে আনন্দ প্রায়ই কার্নির দাভোস কাঠামোর কথা উল্লেখ করেন, যেখানে কানাডাকে ‘স্পষ্ট দৃষ্টি ও দৃঢ় উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করা একটি মধ্যম শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

কিন্তু বাস্তবে এই ভাষা সরকারের পরস্পরবিরোধী অবস্থানকে বাস্তববাদ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা—যা আসলে নিছক ভণ্ডামি।

আন্তর্জাতিক আইনকে দুর্বল করা
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে কানাডার অবস্থান অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সরাসরি সমর্থন বা নীরবতা—দুটির মাধ্যমেই কানাডা বহুবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, যেমন ভেনেজুয়েলা, কিউবা, গাজা বা লেবাননের ক্ষেত্রে।

কার্নি যখন মধ্যম শক্তিগুলোর ঐক্যের কথা বলেন, তখন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে—তিনি আসলে পশ্চিমা শক্তিগুলোর কথাই বোঝাচ্ছিলেন। ইউরোপের প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি ও তাদের মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরে গ্লোবাল সাউথে শোষণ ও নিপীড়নের ইতিহাস বহন করে।

এই ধনী কিন্তু বার্ধক্যগ্রস্ত সমাজগুলো এখনও তাদের সাবেক উপনিবেশগুলো থেকে সস্তা শ্রম ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। আর সেই শোষণ বজায় রাখতে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োগকারী শক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছে।

ফলে কানাডার নীতিনির্ধারকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট রাখা স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়—বিশেষ করে যখন দেশের অভ্যন্তরেও এমন কিছু গোষ্ঠী রয়েছে যারা ইরানবিরোধী অবস্থানকে শক্তিশালী করে।

মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে ১৪ ফেব্রুয়ারি দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বক্তৃতা—যেখানে তিনি নতুন এক বৈশ্বিক ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার সম্ভাব্য সুবিধা পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ভাগ করার ইঙ্গিত দেন—কানাডার কাছে হয়তো এই যুদ্ধকে সমর্থনের একটি সুযোগ হিসেবে দেখা হয়েছে।

হয়তো তারা আশা করছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে সমর্থন করে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে আবার “নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার” নেতৃত্বে ফিরিয়ে আনতে পারবে।

কিন্তু যে নতুন বিশ্বব্যবস্থা কার্নি সরকার কল্পনা করছে, তা আরও ছোট এবং কম ন্যায়সঙ্গত।

এটি বিপজ্জনকও, কারণ আন্তর্জাতিক আইনকে বেছে বেছে প্রয়োগ করার চেয়ে বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে আর কিছুই এতটা ক্ষতিগ্রস্ত করে না। এমন এক বিশ্বে সবাই ঝুঁকির মুখে পড়ে, যেখানে সীমাহীন আগ্রাসনই নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়।

ইরান যুদ্ধ ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক ও কানাডার অর্থনীতিতে বড় ক্ষতি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে অনেক কানাডিয়ানও এর প্রভাব ভোগ করছেন—এমন এক যুদ্ধে, যার সঙ্গে পারমাণবিক ঝুঁকিও জড়িত।

এদিকে কানাডা নিজেও আঞ্চলিক অখণ্ডতার ঝুঁকির মুখে রয়েছে—হয়তো জ্বালানিসমৃদ্ধ আলবার্টা প্রদেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে, অথবা সরাসরি সংযুক্তিকরণের হুমকিও রয়েছে।

কানাডার প্রকৃত সুরক্ষা একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার মধ্যেই নিহিত—যেখানে এমন পদক্ষেপের মূল্য এত বেশি হবে যে কেউ তা করতে সাহস পাবে না।

এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে মধ্যম শক্তিগুলোর দৃঢ় নেতৃত্ব প্রয়োজন।

স্পেন ইতিমধ্যেই সে ধরনের নেতৃত্বের উদাহরণ দেখিয়েছে—যেখানে ইউক্রেন, গাজা ও ইরান—সব ক্ষেত্রেই একই নীতি প্রয়োগ করা হয়েছে।

কিন্তু কার্নি সরকার সেই পথ অনুসরণ না করে বরং আন্তর্জাতিক আইনকেই দুর্বল করার পথ বেছে নিয়েছে।

জেরেমি ওয়াইল্ডেম্যান: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।

মিডল ইস্ট আই থেকে