বুধবার । এপ্রিল ২৯, ২০২৬
ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক আন্তর্জাতিক ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ৪:২১ অপরাহ্ন
শেয়ার

ইরানের চাবাহার বন্দর ঘিরে অনিশ্চয়তার মুখে ভারতের স্বপ্ন


chabahar port

রিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে এই কৌশলগত প্রকল্পের ভবিষ্যৎ

যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ক আবারও একটি সংবেদনশীল মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে—এবার বিষয় ইরানের চাবাহার পোর্টে নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ। ভারতের প্রতিবেশী অঞ্চলে সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী এই সংযোগ প্রকল্পটি এখন অনিশ্চয়তার মুখে। যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা থেকে পাওয়া ছাড়ের মেয়াদ গত রোববার শেষ হয়ে গেছে, এবং ওয়াশিংটন থেকে তা পুনরায় চালুর কোনো ইঙ্গিত নেই। এই বন্দরটি ছিল আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও যোগাযোগ স্থাপনে ভারতের পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু।

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ নীতির আওতায় ইরানের অর্থনীতিকে চাপে রাখার চেষ্টা করছে। এর অংশ হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করা হয়েছে। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে তেহরান। ভারতের জ্বালানি সরবরাহের জন্য এই জলপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং দেশটি এ বিষয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

ইরানের দক্ষিণ-পূর্বে ওমান উপসাগরের তীরে অবস্থিত চাবাহার বন্দর দুটি টার্মিনাল—শাহিদ কালানতরি ও শাহিদ বেহেশতি—নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে শাহিদ বেহেশতি টার্মিনালে ভারত অন্তত ১২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই বন্দরটি গত দুই দশক ধরে ভারতের কৌশলগত পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো পাকিস্তান, যা ভারতের সঙ্গে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার স্থলপথে সংযোগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই পরিস্থিতিতে চাবাহার বন্দর ব্যবহার করে সমুদ্রপথে ইরানে পৌঁছে সেখান থেকে সড়ক ও রেলপথে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়—যা গত এক দশকে ভারত ব্যবহার করে আসছে।

এছাড়া কৌশলগত দিক থেকেও এই বন্দর গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৬ সালে পাকিস্তান ও চীনের সহায়তায় গোয়াদর বন্দর চালু হওয়ার পর ভারত আশঙ্কা করছে, এটি ভবিষ্যতে সামুদ্রিক ও অর্থনৈতিকভাবে ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে। চাবাহার বন্দর, যা গোয়াদর থেকে মাত্র ১৪০ কিলোমিটার দূরে, সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় ভারতের জন্য বিকল্প পথ তৈরি করে।

২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করলেও সেসময় যুক্তরাষ্ট্র চাবাহার প্রকল্পকে বিশেষ ছাড় দিয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন সব ধরনের ছাড় প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। পরে ভারতের অনুরোধে এই ছাড় ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

এই সময়ের মধ্যে ভারত প্রকল্পে প্রতিশ্রুত ১২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে, যা দেশটির অভ্যন্তরে সমালোচনার জন্ম দেয়। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রকল্প থেকে সরে আসছে।

ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও চলমান আঞ্চলিক সংঘাত সেই প্রক্রিয়ার সফলতার সম্ভাবনাকে জটিল করে তুলেছে।

এদিকে, গত বছরই চাবাহার পরিচালনাকারী ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা পদত্যাগ করেন এবং তাদের ওয়েবসাইটও বন্ধ হয়ে যায়। চলতি বছরের বাজেটেও এই প্রকল্পের জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি—যা প্রায় এক দশকের মধ্যে প্রথম।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের বিকল্প খুব সীমিত। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া কঠিন। কেউ কেউ মনে করছেন, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি অনুকূল হলে ভারত আবারও এই প্রকল্পে ফিরতে পারে। অন্যদিকে, অনেকে বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে নয়াদিল্লি হয়তো ক্ষতি মেনে নিয়েও প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হবে।

তবে কিছু বিশ্লেষকের মতে, ভারতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে তার কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে চাবাহার প্রকল্পে থাকা সম্ভব হলেও, যদি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে এই প্রকল্প থেকে সরে যাওয়াই হবে তাদের একমাত্র পথ।

সব মিলিয়ে, চাবাহার বন্দর ঘিরে ভারতের স্বপ্ন এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে এই কৌশলগত প্রকল্পের ভবিষ্যৎ।