রবিবার । মে ৩১, ২০২৬
বাংলা টেলিগ্রাফ ডেস্ক দেশজুড়ে ৩১ মে ২০২৬, ৫:৫৯ অপরাহ্ন
শেয়ার

দেশের ৮ বিমানবন্দর চালুর উদ্যোগ


Airport

দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত করতে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ও অব্যবহৃত থাকা ৮টি বিমানবন্দর পর্যায়ক্রমে চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে উত্তরবঙ্গের বগুড়া ও ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দরকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে বগুড়ায় একটি আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) বোর্ড সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছে। পাশাপাশি ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দরটিও পুনরায় সচল করার তোড়জোড় শুরু হয়েছে।

সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রীতা জানান, জনগণের চাহিদার প্রেক্ষিতে পরিত্যক্ত বিমানবন্দরগুলো স্থানীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের স্বার্থ ও যাত্রীসেবা বিবেচনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে এগুলোর কাজ শুরু হবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার যেমন আমূল পরিবর্তন আসবে, তেমনি আঞ্চলিক উন্নয়নেও ভারসাম্য রক্ষা হবে।

বগুড়ায় আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য ১০ হাজার ৫০০ ফুট দীর্ঘ রানওয়ের এক বিশাল পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বোয়িং ৭৩৭-৮০০ ধরনের বড় উড়োজাহাজসহ দেশি-বিদেশি যাত্রী ও কার্গো বিমান এখানে সহজে নামতে পারবে। প্রকল্পে থাকছে চারতলা আধুনিক টার্মিনাল, কন্ট্রোল টাওয়ার, কার্গো কমপ্লেক্স এবং আধুনিক আইএলএস ক্যাট-৩বি প্রযুক্তি, যা ঘন কুয়াশাতেও বিমানের নিরাপদ উড্ডয়ন-অবতরণ নিশ্চিত করবে।

বর্তমানে এই প্রকল্পের ডিজাইন ও কারিগরি সমীক্ষার জন্য বুয়েটকে পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। গত ২৮ এপ্রিল বুয়েট প্রতিনিধিদের সঙ্গে বেবিচকের এ সংক্রান্ত একটি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরামর্শক নিয়োগ শেষ হওয়ার পর ছয় মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ নকশা ও ডিপিপি প্রস্তুত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ৪০০ থেকে ৬০০ একর অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণ করার প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক নবায়ন এবং রানওয়ে সেফটি এরিয়া উন্নয়নের কাজও প্রক্রিয়াধীন। পুরো প্রকল্পে আনুমানিক ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। গত ৭ মে মন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বগুড়া বিমানবন্দর এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন।

১৯৪০ সালে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার শিবগঞ্জে ৫৫০ একর জমির ওপর এই বিমানবন্দরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময় এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে রানওয়ে সংস্কার করা হলেও যাত্রী সংকটে ১৯৮০ সালে এটি সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় বন্ধ থাকায় বর্তমানে এখানকার অবকাঠামো অত্যন্ত জরাজীর্ণ। টার্মিনাল ও কন্ট্রোল টাওয়ার প্রায় অকার্যকর, নেই কোনো অগ্নিনির্বাপণ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। ৬ হাজার ফুট রানওয়ে থাকলেও আধুনিক লাইটিং ও নেভিগেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত এই বিমানবন্দর।

বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, এই বিমানবন্দরটিকে সম্পূর্ণ আধুনিক করতে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগবে তিন বছর। প্রথম ধাপে ৫৮২ একর জমি অধিগ্রহণ, রানওয়ে সম্প্রসারণ, নতুন টার্মিনাল, কন্ট্রোল টাওয়ার ও নিরাপত্তা অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে রানওয়েকে ৯ হাজার ফুটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। গত ২০ মে মন্ত্রণালয় ও বেবিচকের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর পরিদর্শন করেছে।

বেবিচকের বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বগুড়া ও ঠাকুরগাঁও ছাড়াও লালমনিরহাট, ঈশ্বরদী, কুমিল্লা, শমশেরনগর, খানজাহান আলী ও পটুয়াখালীসহ মোট আটটি অব্যবহৃত বিমানবন্দর ধাপে ধাপে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত কাজে হাত দেওয়ার আগে পুঙ্খানুপুঙ্খ সম্ভাব্যতা যাচাই (Feasibility Study) করা হবে এবং কোন বিমানবন্দর আগে চালু করা লাভজনক হবে, তা নির্ধারণ করা হবে।

অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলো পর্যায়ক্রমে চালুর জন্য ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক। তিনি জানান, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এবং বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা বিবেচনা করে কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, বন্ধ বিমানবন্দরগুলো সচল হলে দেশের কৃষি, ব্যবসা ও পর্যটন খাতে বড় গতি আসবে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি হবে। তবে প্রকল্পগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে সফল করতে হলে যাত্রী চাহিদা ও বাণিজ্যিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি, অন্যথায় বিশাল বাজেটের এই প্রকল্পগুলো ঝুঁকিতে পড়তে পারে। উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশে ৩টি আন্তর্জাতিক ও ৫টি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর সচল রয়েছে। কক্সবাজার বিমানবন্দরকে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মর্যাদা দেওয়া হলেও সেটি এখনও পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি।