বুধবার । জুন ১৭, ২০২৬
বাংলা টেলিগ্রাফ ডেস্ক দেশজুড়ে ১৭ জুন ২০২৬, ৮:৫৯ অপরাহ্ন
শেয়ার

আইফোন চুরির অপবাদে ছাত্রাবাসে স্কুলছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ


mehedi

নিহত মেহেদী হাসান

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে আইফোন চুরির অপবাদ দিয়ে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রাবাসে ১৪ বছর বয়সী এক আবাসিক ছাত্রকে পিটিয়ে ও শ্বাস রোধ করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। গতকাল মঙ্গলবার (১৬ জুন) সন্ধ্যায় উপজেলার ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমির ছাত্রাবাসে এই নৃশংস ঘটনা ঘটে।

নিহত ছাত্রের নাম মেহেদী হাসান। সে ওই একাডেমির অষ্টম শ্রেণির আবাসিক ছাত্র ছিল। তার বাবা জিয়া উদ্দিন ও মা শারমিন আক্তারের বাড়ি সোনাপুর বাজার এলাকার রাঘবপুর গ্রামে।

স্থানীয় রামগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফিরোজ উদ্দিন চৌধুরী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। স্কুলছাত্রের এই নির্মম মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ওই এলাকার পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং বিক্ষুব্ধ জনতা ক্যাম্পাসের ভেতরে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়।

একাডেমির ছাত্রাবাসের আবাসিক শিক্ষক মো. ইসমাইল হোসেন জানান, গত ১৪ জুন কলেজ শাখার এক শিক্ষার্থীর একটি আইফোন হারিয়ে যায়। এর সূত্র ধরে ৪১৪ নম্বর কক্ষের আবাসিক ছাত্র মেহেদী হাসান ফোনটি চুরি করেছে বলে অপবাদ দেওয়া হয়। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে ফোন হারানো ওই ছাত্রসহ ৯ জন সিনিয়র শিক্ষার্থী মেহেদীকে ৪১৫ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে যায় এবং চুরির স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য নির্মমভাবে মারধর শুরু করে।

মারধরের একপর্যায়ে মেহেদী গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আড়াল করতে অভিযুক্ত ছাত্ররা মেহেদীর গলায় মাফলার পেঁচিয়ে জানালার গ্রিলের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়। ওই সময় হোস্টেলের বেশির ভাগ ছাত্র মাঠে খেলাধুলায় অথবা নামাজে ব্যস্ত ছিল। মাগরিবের নামাজের ঠিক আগে তাকে উদ্ধার করে চাটখিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মেহেদীকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত ৯ শিক্ষার্থী ছাত্রাবাস থেকে পালিয়ে যায়।

এদিকে ছাত্র মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে রাত ৮টার দিকে কয়েক শ অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দা স্কুলের বাইরে জড়ো হতে থাকেন। রাত ১১টার দিকে বিক্ষুব্ধ জনতা স্কুলের ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর চালায় এবং একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আবাসিক শিক্ষকের দাবি, এই ভাঙচুরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী আতিকুর রহমান জানান, খবর পেয়ে তিনি পুলিশ নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে গেলেও বিক্ষুব্ধ মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি থাকায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে লক্ষ্মীপুর জেলা সদর থেকে অতিরিক্ত পুলিশ এসে রাত দুইটার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে ও ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা ফেরাতে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটি সাত দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন।

আজ দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে মেহেদীর লাশ নিয়ে রামগঞ্জ থানার সামনে বিক্ষোভ করেন নিহতের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। পরে পুলিশ যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের বিচারের আওতার আনার আশ্বাস দিলে দুপুর ২টার দিকে বিক্ষোভকারীরা শান্ত হন।

নিহত মেহেদীর চাচা জুয়েল রানা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আইফোন চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আমার নিষ্পাপ ভাতিজাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, আমরা এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

রামগঞ্জ থানার ওসি জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তের জন্য লাশ নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছিল। মোবাইল চুরির অভিযোগে মারধরের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেলেও শুধু মারধরের কারণেই মৃত্যু হয়েছে কি না, তা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে স্পষ্ট হবে। এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি, তবে অভিযুক্ত ছাত্রদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের জোর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।