বুধবার । জুন ১৭, ২০২৬
নিয়াজ মাহমুদ সাকিব ওয়ার্ল্ডকাপ গোল গ্রাফ ১৭ জুন ২০২৬, ৯:২৪ অপরাহ্ন
শেয়ার

বিশ্বকাপের সপ্তম দিনের দ্বিতীয় প্রহর

পরতে পরতে উত্তেজনার দ্বৈরথ- নতুন ইতিহাসের দুয়ারে দাঁড়িয়ে কিংবদন্তী


দিনের বাকি চার ম্যাচ- ইতিহাসের অপেক্ষায় কিংবিদন্তী রোনালদো

স্মৃতি, প্রতিশোধ, স্বপ্ন আর ইতিহাসের সমবায় ফুটবল বিশ্বকাপ। প্রতিটি দিন যেন এক একটি নতুন অধ্যায়, মহাকাব্যগাঁথার নতুন কোনো পাতা। বুধবারের সূচিতে চারটি ম্যাচ থাকলেও, গল্পের সংখ্যা হয়তো হবে অনেক বেশি। কোথাও একজন কিংবদন্তি নতুন ইতিহাসের দুয়ারে দাঁড়িয়ে, কোথাও পুরোনো শত্রুতার আগুন আবার জ্বলে উঠতে প্রস্তুত। আবার কোথাও প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে পা রাখা এক নবাগত দেশের চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

বিশ্বকাপের এই দিনে দুটো ম্যাচের ফলাফল সবারই জানা। আর্জেন্টিনা ৩- ০ আলজেরিয়া ; অস্ট্রিয়া ৩- ১ জর্ডান। তবে আজ আরো মাঠে নামবে পর্তুগাল, ডিআর কঙ্গো, ইংল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, ঘানা, পানামা, কলম্বিয়া ও উজবেকিস্তান। কিন্তু দিনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুই শিরোনাম—ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং ইংল্যান্ড-ক্রোয়েশিয়া দ্বৈরথ।

রোনালদোর সামনে আরেকটি ইতিহাস

চল্লিশের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়া ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এখনও যেন সময়কে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে মাঠে নামলে তার সামনে থাকবে এমন এক রেকর্ড, যা এখনও কোনো ফুটবলারের ঝুলিতে নেই—ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার কীর্তি।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে অসংখ্য কিংবদন্তি এসেছেন, গেছেন। কিন্তু রোনালদো এখনও নিজের নামের পাশে নতুন অধ্যায় যোগ করার চেষ্টা করে চলেছেন। পর্তুগালের অধিনায়ক নিজেও জানেন, ট্রফির স্বপ্ন দেখতে হলে প্রথম ধাপটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তাই বিশ্বকাপ শুরুর আগে তিনি বলেছিলেন,

আমরা এক ম্যাচ করে এগোতে চাই। সবকিছু ধাপে ধাপে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভালোভাবে শুরু করা।”

ডিআর কঙ্গোর কোচ সেবাস্তিয়েন দেসাব্রেও রোনালদোর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তবে রসিকতা করে বলেছেন, তিনি রোনালদোর মঙ্গল চান, কিন্তু নিজের দলের বিপক্ষে যেন গোল না করেন!

চিতাবাঘদের স্বপ্ন বনাম নাবিকদের অভিজ্ঞতা

ডিআর কঙ্গোর গল্পটাও কম আকর্ষণীয় নয়। কয়েক বছর আগেও ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে ৫৬ নম্বরে থাকা দলটি উঠে এসেছে ৪৫ নম্বরে। আফ্রিকার “লেপার্ডস” বা চিতাবাঘরা দীর্ঘ অপেক্ষার পর আবার বিশ্বকাপে ফিরেছে।

তবে ভাগ্যের পরিহাস, প্রত্যাবর্তনের ম্যাচেই সামনে পর্তুগাল।

পরিসংখ্যানবিদদের মতে, পর্তুগালই এগিয়ে। অপ্টার ২৫ হাজার সিমুলেশনের মধ্যে ৫৪.৬ পারসেন্টে জয়ী রয়েছে পর্তুগাল। ড্র সম্ভাবনা ২২ পারসেন্ট আর ডিআর কঙ্গোর জয়ের সম্ভাবনা ধরা হয়েছে ২৩.১ পারসেন্ট।

সংখ্যাগুলো বলছে পর্তুগাল ফেভারিট। কিন্তু বিশ্বকাপের সৌন্দর্যই হলো—সংখ্যা কখনো কখনো বাস্তবতার কাছে হার মেনে যায়।

ইংল্যান্ড-ক্রোয়েশিয়া: পুরোনো ক্ষতের নতুন পরীক্ষা

দিনের সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচ নিঃসন্দেহে ইংল্যান্ড বনাম ক্রোয়েশিয়া।

এই শতাব্দীতে বড় কোনো টুর্নামেন্টে এটি দুই দলের চতুর্থ সাক্ষাৎ। স্মৃতি খুঁজতে গেলে ইংল্যান্ড সমর্থকদের চোখে এখনও ভেসে ওঠে ২০১৮ সালের সেই বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল। মস্কোর রাতে ক্রোয়েশিয়া তাদের স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছিল।

অন্যদিকে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে দুবারই জিতেছে ইংল্যান্ড।

অর্থাৎ হিসাব সমান নয়, কিন্তু অসমাপ্ত।

অপ্টার ১০ হাজার সিমুলেশন বলছে, ইংল্যান্ডের জয়ের সম্ভাবনা ৫৫.৯ শতাংশ। ক্রোয়েশিয়ার ২০.৮ শতাংশ। ড্রয়ের সম্ভাবনা ২৩.৩ শতাংশ।

সংখ্যা ইংল্যান্ডের পাশে। কিন্তু লুকা মদ্রিচদের প্রজন্ম বারবার প্রমাণ করেছে, হৃদয়ের শক্তি অনেক সময় পরিসংখ্যানের চেয়ে বড়।

ঘানা-পানামা: বাঁচা-মরার লড়াইয়ের শুরু

বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে কিছু ম্যাচ থাকে, যেগুলোকে ফাইনাল না বললেও চলে না। ঘানা ও পানামার ম্যাচ ঠিক তেমনই।

দুই দল কখনও একে অপরের মুখোমুখি হয়নি। কিন্তু উভয়েই জানে, এই ম্যাচে পয়েন্ট হারানো মানে পরবর্তী পথকে আরও কঠিন করে তোলা।

অপ্টার হিসাব অনুযায়ী, পানামার জয়ের সম্ভাবনা ৪৫.২ শতাংশ। ঘানার ২৯.৬ শতাংশ। ড্রয়ের সম্ভাবনা ২৫.২ শতাংশ।

তবে আফ্রিকার প্রতিনিধিরা বিশ্বকাপে বহুবার নিজেদের সীমা অতিক্রম করেছে। ঘানা সেই ইতিহাসেরই অংশ।

নবাগত উজবেকিস্তানের সামনে কলম্বিয়ার পরীক্ষা

বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরে এমন কিছু গল্প থাকে, যা নতুন করে আশা জাগায়। এবারের সেই গল্পের নাম উজবেকিস্তান।

প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে এসেছে মধ্য এশিয়ার দেশটি। আর প্রথম ম্যাচেই তাদের প্রতিপক্ষ অভিজ্ঞ কলম্বিয়া, যারা সপ্তমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলছে।

অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্যের বিচারে কলম্বিয়া স্পষ্টতই এগিয়ে। ২৫ হাজার সিমুলেশনের মধ্যে ৬২.৪ শতাংশ ক্ষেত্রে জয় পেয়েছে লস কাফেতেরোসরা। উজবেকিস্তানের সম্ভাবনা ১৭.৫ শতাংশ। ড্রয়ের সম্ভাবনা ২০.১ শতাংশ।

তবে বিশ্বকাপের ইতিহাস বলে, অভিষেক ম্যাচে স্বপ্ন দেখার অধিকার সব দলেরই আছে।

সংখ্যার বাইরে যে গল্প

বিশ্বকাপের সৌন্দর্য আসলে পরিসংখ্যানের টেবিলে বন্দী নয়।

বুধবারের ম্যাচগুলোতে কেউ দেখবে রোনালদোর রেকর্ডের খাতা। কেউ খুঁজবে ইংল্যান্ডের প্রতিশোধ। কেউ অপেক্ষা করবে আফ্রিকার আরেকটি বিস্ময়ের জন্য। আর কেউ হয়তো উজবেকিস্তানের প্রথম বিশ্বকাপ গোলের স্বপ্ন দেখবে।

ফুটবল শেষ পর্যন্ত সম্ভাবনার খেলা নয়, অনুভূতির খেলা।

আর বিশ্বকাপ? সেটি এমন এক মঞ্চ, যেখানে কখনো রোনালদো ইতিহাস লেখেন, কখনো কোনো অজানা ফুটবলার পুরো বিশ্বের কল্পনাকে নতুন রঙে রাঙিয়ে দেন।

বুধবারের সূচি তাই চারটি ম্যাচের নয়—চারটি সম্ভাব্য গল্পের। আর বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সত্য হলো, গল্পগুলো শেষ হওয়ার আগে তাদের পরিণতি কেউ জানে না।