বৃহস্পতিবার । জুন ১৮, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ১৮ জুন ২০২৬, ১:৪৪ অপরাহ্ন
শেয়ার

ইরান চুক্তি নিয়ে সমালোচনার মুখেও নিজের লক্ষ্যে অটুট ট্রাম্প


ইরান চুক্তি নিয়ে সমালোচনার মুখেও নিজের লক্ষ্যে অটুট ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প || ছবি: সিএনএন

ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সমঝোতা চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। সমালোচকদের মতে, যুদ্ধের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে করা এই চুক্তি কৌশলগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য ও সাম্প্রতিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক চাপ সামাল দেওয়াই এখন তার প্রধান অগ্রাধিকার।

ফ্রান্স সফরে বুধবার (১৭ জুন) ট্রাম্প বলেন, তিনি অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখতে চাননি। তার ভাষায়, যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে সেই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারত।

এই মন্তব্য অনেকের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লক্ষ্য নয়, বরং স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধাকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, বাজারের মূল্যায়ন তার উপদেষ্টাদের চেয়েও বেশি নির্ভুল, অবশ্য নিজের নামটি ব্যতিক্রম হিসেবে উল্লেখ করেন।

যদিও এই সমঝোতার মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে ৬০ দিনের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার পথ তৈরি হয়েছে, অনেক রিপাবলিকান নেতা মনে করছেন চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের দরকষাকষির শক্তি দুর্বল করে দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মাধ্যমে ইরান আগাম বিপুল আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে।

এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, কেন এই চুক্তিতে সম্মত হলেন ট্রাম্প?

গত ফেব্রুয়ারিতে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি একাধিকবার ইরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এবং সামরিক চাপ বাড়িয়েছেন। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে গত সপ্তাহেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে বিমান হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্র অভিযান চালায়।

তবে এখন ট্রাম্পের বক্তব্যে ভিন্ন সুর দেখা যাচ্ছে। তার ইঙ্গিত, যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবই তাকে নতুন পথ খুঁজতে বাধ্য করেছে।

জি-সেভেন সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, তিনি লক্ষ্য করেছেন যে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তির খবর এলেই শেয়ারবাজার দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়, আর সমঝোতার সম্ভাবনা কমে গেলে বাজারে বড় ধরনের পতন ঘটে।

তিনি বলেন, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট হারবার্ট হুভারের মতো ইতিহাসে পরিচিত হতে চান না, যাকে মহামন্দার জন্য দায়ী করা হয়।

যদিও ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব মহামন্দার পর্যায়ে পৌঁছেনি, তবুও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছিল। একই সময়ে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও কমে ত্রিশের ঘরে নেমে এসেছে বলে বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শেষ করার পেছনে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক যুক্তি নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, এতে এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে যে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেই যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগত ছাড় দিতে বাধ্য করা সম্ভব।

আরও বড় উদ্বেগ হলো, ইরান এখন বুঝতে পারে যে তেল রপ্তানি ব্যাহত করে বা হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করে তারা ওয়াশিংটনের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে সক্ষম।

যদিও ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরান চুক্তি লঙ্ঘন করলে তিনি আবারও সামরিক ব্যবস্থা নেবেন, অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের অর্থনৈতিক মূল্য বিবেচনায় এমন পদক্ষেপ নেওয়া তার জন্য কঠিন হতে পারে।

এদিকে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সসহ কয়েকজন রিপাবলিকান নেতা চুক্তিটিকে ‘তুষ্টিকরণ নীতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের মতে, যুদ্ধ থামাতে অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ করে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিপক্ষের কাছে দুর্বলতার বার্তা দিচ্ছে।

সমালোচকদের আরেকটি অভিযোগ, যুদ্ধের শুরুতে ইরানের জনগণকে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা বললেও এখন ট্রাম্প সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। কারণ সমঝোতা স্মারকে দুই দেশ একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার করেছে।

ফ্রান্সে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প দাবি করেন, এই চুক্তি যুদ্ধের অবসান ঘটাবে এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা নেই বলে তাদের আশ্বাসের ওপর তিনি আস্থা রাখছেন।

তিনি আরও দাবি করেন, তার আগের মেয়াদে কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার সিদ্ধান্ত এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা দুর্বল করেছে।

তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, যদি আগের পদক্ষেপগুলোতেই সমস্যার সমাধান হয়ে থাকে, তাহলে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করার প্রয়োজন কেন ছিল?

সাংবাদিক সম্মেলনে ট্রাম্প আরও বলেন, ৬০ দিনের আলোচনার সময়সীমাকে তিনি কঠোর সময়সীমা হিসেবে দেখছেন না। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের মতো ইরানেরও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি রাখার যৌক্তিকতা থাকতে পারে।

সবশেষে তিনি জানান, ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে সমঝোতা স্মারকের একটি কপিতে স্বাক্ষর করে তার ছবি ইরানের কাছে পাঠিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতীকী পদক্ষেপ আবারও দেখিয়েছে যে ট্রাম্পের কাছে অনেক সময় একটি চুক্তির দৃশ্যমান উপস্থাপনাও তার বাস্তব বিষয়বস্তুর মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

এখন দেখার বিষয়, এই সমঝোতা সত্যিই আরও গভীর কূটনৈতিক আলোচনার পথ খুলে দেয় কি না, নাকি এটিকেই ট্রাম্প তার ইরান নীতির চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন।

 

সূত্র: সিএনএন