
ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরের অপেক্ষায় থাকা সমঝোতা স্মারকের ১৪ দফা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ নামে প্রকাশিত এই ১৪ দফার নথিতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু, ইরানের ওপর আরোপিত কিছু আর্থিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার কাঠামো তুলে ধরা হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, এই সমঝোতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে দেওয়া হবে, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ইরান ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলে ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক ও নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত সুবিধা দেওয়া হবে।
শুক্রবার এই সমঝোতা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করতে ৬০ দিনের আলোচনা শুরু হবে।
১৪ দফার সমঝোতা স্মারকে যা আছে-
১. যুদ্ধের অবসান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এবং তাদের মিত্ররা সব ফ্রন্টে, বিশেষ করে লেবাননসহ চলমান সামরিক কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। ভবিষ্যতে একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান না চালানোর অঙ্গীকারও করা হয়েছে।
২. সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান
দুই দেশ একে অপরের স্বাধীনতা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
৩. ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি
সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে উভয় পক্ষের সম্মতিতে সময় বাড়ানো যাবে।
৪. মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার
সমঝোতা স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার শুরু করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে তা পুরোপুরি শেষ করবে। চূড়ান্ত চুক্তির পর ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের নিকটবর্তী এলাকা থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
৫. হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল
ইরান ৬০ দিনের জন্য কোন ধরণের ফি ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করবে। ধাপে ধাপে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক করা হবে।
৬. ৩০০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন পরিকল্পনা
যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক অংশীদাররা ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা প্রণয়নে সম্মত হয়েছে।
৭. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অঙ্গীকার
জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের বিষয়ে আলোচনা হবে।
৮. পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির অঙ্গীকার
ইরান পুনরায় নিশ্চিত করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ কীভাবে নিষ্পত্তি করা হবে, তা আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার তত্ত্বাবধানে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
৯. বর্তমান অবস্থা বজায় রাখা
চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরান তার বর্তমান পারমাণবিক কর্মসূচি বজায় রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করবে না।
১০. ইরানি তেল রপ্তানির অনুমতি
সমঝোতা কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সেবার রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় ছাড় দেবে।
১১. জব্দকৃত অর্থ ছাড়
ইরানের স্থগিত বা জব্দকৃত সম্পদ ও অর্থ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও লাইসেন্স দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
১২. তদারকি ব্যবস্থা
সমঝোতা ও ভবিষ্যৎ চুক্তির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য একটি যৌথ নির্বাহী ব্যবস্থা গঠন করা হবে।
১৩. পরবর্তী আলোচনা
যুদ্ধবিরতি, নৌ চলাচল, তেল রপ্তানি ও অর্থ ছাড়সংক্রান্ত প্রাথমিক ধাপ বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার পর বাকি বিষয়গুলো নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু হবে।
১৪. জাতিসংঘের অনুমোদন
চূড়ান্ত চুক্তিকে বাধ্যতামূলক রূপ দিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনএসসি) একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমতে পারে, হরমুজ প্রণালিতে বৈশ্বিক বাণিজ্য স্বাভাবিক হতে পারে এবং ইরানের অর্থনীতি নতুন করে গতি পেতে পারে। তবে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।












































