sentbe-top

কয়লা গায়েবের ঘটনায় দোষীদের পক্ষেই সাফাই তদন্ত কমিটির

barapukuria-coal-mineদিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ায় দেড় লাখ টন কয়লা গায়েবের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করেনি পেট্রোবাংলা গঠিত তদন্ত কমিটি। বরং দেষীদের পক্ষেই সাফাই গেয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাতাসের সঙ্গে ডাস্ট উড়ে যাওয়া এবং বৃষ্টির পানিতে মজুদ কয়লা থেকে ডাস্ট ধুয়ে যাওয়ায় কয়লা ঘাটতির প্রধান কারণ। বছরের পর বছর মজুদ কয়লা পরিমাপ না করায় ঘটতির বিশাল অাকৃতি ধারণ করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকে সোনা কেলেঙ্কারির রেশ কাটতে না কাটতেই এবার কয়লা কেলেঙ্কারিতে হইচই দেশজুড়ে।নথিপত্রের হিসাব অনুযায়ী, খনি থেকে উত্তোলিত কয়লা যেখানে স্তূপ করে রাখা হয় সেখানে কয়লা থাকার কথা প্রায় দেড় লাখ টন। কিন্তু সেখানে কয়লা আছে মাত্র পাঁচ-ছয় হাজার টন। এক লাখ ৪২ হাজার টন কয়লার কোনো হদিস মিলছে না। গায়েব কয়লার বাজার মূল্য প্রায় ২২৭ কোটি টাকা। কয়লা সঙ্কটে বন্ধ হয়ে গেছে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। দিনাজপুরসহ ৮টি জেলা পড়েছে বিদ্যুৎ সঙ্কটে। কয়লা কেলেঙ্কারির ঘটনায় বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত ও বদলি করা হয়েছে। মামলা হয়েছে ১৯ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। ঘটনা তদন্তে পেট্রোবাংলা ও দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক আলাদা দুটি কমিটি গঠন করা হয়।

এ ঘটনায় পেট্রোবাংলার পরিচালক (মাইন অপারেশন) মো. কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে আলোচিত কয়লা কেলেঙ্কারির তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে জনগণের ব্যাপক আগ্রহ থাকলেও পেট্রোবাংলা গঠিত তদন্ত কমিটি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। প্রতিবেদনে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৫২৫ টন কয়লা গায়েবের ঘটনায় খনি কর্মকর্তাদের দূর্নীতির বিষয়টি এড়িয়ে খনির সাবেক চার ব্যবস্থাপনা পরিচালক যথাক্রমে মো. কামরুজ্জামান, মো. আমিনুজ্জামান, এসএম নুরুল আওরঙ্গজেব ও সদ্য সাবেক হাবিব উদ্দিন আহমেদসহ মার্কেটিং ও মাইন অপারেশন বিভাগের কর্মকর্তাদের অদক্ষতা ও অজ্ঞতাকে দায়ী করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশও না করার প্রেক্ষাপটে এ তদন্ত কমিটির সদস্যদের দক্ষতা ও আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে।

sentbe-adপেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর কাছে দাখিল করা এ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তদন্ত প্রতিবেদনে মজুদ কয়লা হ্রাসের যেসব কারণ উল্লেখ করা হয়েছে সেসব অপ্রাসঙ্গিক নয়। বিশ্বের সব কয়লা খনিতেেই ৩ থেকে ৫ শতাংশ সিস্টেম লস থাকে। সিস্টেম লসের কারণগুলো হলো কয়লা শুকিয়ে যায়, বাতাসে কয়লার ডাস্ট উড়ে যায়, বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে মাটিতে মিশে যায়। কিন্তু মজুদ কয়লা থেকে বাতাসে উড়ে যাওয়া এবং বৃষ্টির পানিতে কোনো ডাস্ট ধুয়ে যাওয়া- এসব কারণে লাখ লাখ টন কয়লা গায়েব হতে পারে না। সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সিস্টেম লস ধরে নেওয়া হলে প্রায় দেড় লাখ টন কয়লা থেকে মাত্র সাড়ে ৭ টন কয়লা ঘটতি হতে পারে।

পেট্রোবাংলার তদন্ত প্রতিবেদনে কয়লা গায়েব হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অদক্ষতা ও অজ্ঞতাকে দায়ী করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, এ অদক্ষতা ও অজ্ঞতার দায় কার? প্রতি বছরের প্রতিবেদনে যে পরিমাণ কয়লা মজুদ থাকার তথ্য উল্লেখ রয়েছে, বাস্তবে তা আছে কিনা, এটা যাচাই করে দেখার বিষয়টি রুটিন কাজের অন্তর্ভুক্ত। যদি কোনো কোম্পানির কর্মকর্তা এসব তথ্য যাচাই না করেন তবে তার দায় তাকেই নিতে হয়।

লাখ লাখ টন কয়লা গয়েব হয়ে যাবে আর কর্মকর্তারা তার হদিস জানবেন না, তা হতে পারে না বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তারা মনে করছেন, খনি থেকে উত্তোলিত বিপুল পরিমাণ কয়লা কী করে গায়েব হয়ে গেল- যারা এর দায়িত্বে ছিলেন তাদেরই দায়ভার নিতে হবে আন্তর্জাতিকভাবে অনুসরণযোগ্য সিস্টেম লস বিবেচনায় নিয়েই কোল ইয়ার্ডের মজুদ কয়লার প্রকৃত তথ্য নিরূপণ করা দরকার। বড় পুকুরিয়ায় দায়িত্বশীল থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় দুর্নীতির যেসব অভিযোগ ওঠেছে, সেগুলোও খতিয়ে দেখা উচিত।

পেট্রোবাংলা গঠিত তদন্তকমিটির প্রতিবেদন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় ঘটনাটি অধিকতর তদন্তের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (প্রশাসন-ডিজি) খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন- যুগ্ম সচিব (জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ) নাজমুল হক ও পেট্রোবাংলার পরিচালক (মাইন অপারেশন) মো. কামরুজ্জামান। ১৩ বছরে কয়লা খনির অনিয়ম, দুর্নীতি তদন্ত করে দেখছে এই কমিটি।

এর বাইরে দুর্নীতি দমন কমিশন- দুদক কয়লা গায়েবের ঘটনার তদন্ত করছে। এরই মধ্যে খনির সাবেক এমডি নুরুল আওরঙ্গজেবকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এছাড়া সাবেক তিন এমডিসহ ২১ কর্মকর্তার বিদেশ গমনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে দুদক। পেট্রোবাংলার প্রশ্নবিদ্ধ দুদকের তদন্তে আমলে নেয়া হবে কি না জানতে চাইলে দুদক সচিব ড. শামসুল আরেফিন বলেন, পেট্রোবাংলার রিপোর্ট আমাদের তদন্ত টিম চাইলে পর্যালোচনা করে দেখতে পারে। সেখান থেকে কোনো ক্লু পায় কি না, তা স্টাডি করে দেখা যেতে পারে। তবে তাদের (পেট্রোবাংলা) রিপোর্টের মতো দুদকের তদন্ত রিপোর্ট হবে না। দুদক দুর্নীতির তদন্ত করছে। তদন্তে যাদের অপরাধ বেরিয়ে আসবে, তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

দুদকের একটি সূত্র জানায়, খনির কয়লা গায়েবের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টটি এতে তদন্তের নামে শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে। সে কারণে ওই রিপোর্ট দুদকের তদন্তে আমলে নেয়া হচ্ছে না। বরং প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে দায়সারা রিপোর্ট দেয়ায় পেট্রোবাংলার তদন্ত কমিটির তিন সদস্যকে দুদকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

এদিকে নাগরিক সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বড়পুকুরিয়ার কয়লা চুরির ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে। ‘বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতের অনিয়ম উদ্ঘাটন’ নিয়ে ক্যাবের একটি কমিটি রয়েছে। এই কমিটি কয়লা চুরির ঘটনার বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।কয়লা উত্তোলন ও মজুত-সংক্রান্ত তথ্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে জানতে চাইবে ক্যাবের এই কমিটি। এ ছাড়া পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করবে।

ছয় সদস্যের এই কমিটির সভাপতি লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ, সদস্য অধ্যাপক এম শামসুল আলম, অধ্যাপক সুশান্ত কুমার দাস, অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ, স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম।

এ প্রসঙ্গে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, জ্বালানি খাতের অপরাধীদের চিহ্নিত করতে ক্যাবের একটি কমিটি অনেক দিন ধরেই কাজ করছে। এই কমিটি জ্বালানি খাতের কয়েকটি দুর্নীতি ঘটনায় প্রতিবেদনও তৈরি করেছে। এখন কয়লা চুরির বিষয়ে কমিটি কাজ করছে।

সৌজন্যে- পূর্বপশ্চিম বিডি

sentbe-top