বৃহস্পতিবার । মার্চ ৫, ২০২৬
মাহমুদ নেওয়াজ জয় ফিচার ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৪৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

রাসপুতিনের জন্ম ১৮৬৯ সালের ২১ জানুয়ারি

রাসপুতিন ও এক সাম্রাজ্যের শেষ অধ্যায়


Rashputin Cover
রাষ্ট্রের ক্ষমতার খতিয়ান সাধারণত কাগজে লেখা থাকে—সংবিধানে, আইন বইয়ে, মন্ত্রিসভার তালিকায়। আমরা ভাবি, যাঁদের হাতে পদ আছে, ক্ষমতাও তাঁদের হাতেই। কিন্তু ইতিহাস বলে অন্য কথা। অনেক সময় রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আসে এমন মানুষদের কাছ থেকে, যাঁদের কোনো পদ নেই, কোনো দায়িত্ব নেই, কোনো জবাবদিহিও নেই। রাশিয়ার শেষ জারতন্ত্রে গ্রিগরি রাসপুতিন ছিলেন ঠিক তেমনই এক মানুষ।

তিনি কোনো রাজনীতিবিদ ছিলেন না। ছিলেন না মন্ত্রী, জেনারেল বা কূটনীতিক। অথচ এক সময় তাঁকে ঘিরেই ঘুরেছে রাশিয়ান সাম্রাজ্যের দরবার, প্রশাসন এমনকি যুদ্ধকালীন সিদ্ধান্তের ছায়া।

একজন সাধু যেভাবে রাষ্ট্রের ভেতরে ঢুকলেন
রাসপুতিনের গল্প শুরু হয় রাশিয়ার গভীর সংকটের সময়। বিশ শতকের শুরুতে দেশটি একদিকে আধুনিকতার পথে হাঁটছে, অন্যদিকে ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যাচ্ছে। কৃষকের ক্ষোভ, শ্রমিক অসন্তোষ, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন—সব মিলিয়ে জারতন্ত্র তখন নড়বড়ে।

এই সময় জার নিকোলাস দ্বিতীয় নিজেও ছিলেন একজন অনিশ্চিত শাসক। সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করতেন, শক্ত হাতে রাষ্ট্র চালানোর মানসিকতা তাঁর ছিল না। এর ওপর রাজপরিবারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল তাঁদের একমাত্র ছেলে—রাজপুত্র আলেক্সেই। তিনি হিমোফিলিয়ায় ভুগছিলেন, সামান্য আঘাতেও তাঁর জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ত।

আধুনিক চিকিৎসা যখন ব্যর্থ, তখন দরবারে আসেন এক অদ্ভুত মানুষ—গ্রিগরি রাসপুতিন। সাইবেরিয়া থেকে আসা এই সাধু দাবি করতেন, তাঁর আছে অলৌকিক ক্ষমতা। অবাক করার বিষয়, তাঁর উপস্থিতিতে রাজপুত্রের অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল। সেটা কাকতালীয় হোক বা মানসিক প্রভাব—জার ও জারিনার কাছে রাসপুতিন হয়ে ওঠেন আশীর্বাদ।

বিশেষ করে জারিনা আলেকজান্দ্রা তাঁকে বিশ্বাস করতে শুরু করেন অন্ধভাবে। ধীরে ধীরে এই বিশ্বাসই রাসপুতিনকে এনে দেয় দরবারে অবাধ প্রবেশাধিকার।

Rusputin Inner 4

পদ ছাড়াই ক্ষমতার কেন্দ্রে
রাসপুতিন কোনো দায়িত্বে ছিলেন না। কিন্তু তিনি যেটা পেয়েছিলেন, তা ছিল আরও শক্তিশালী—রাজপরিবারের ব্যক্তিগত আস্থা। এই আস্থার জোরেই তিনি দরবারে প্রভাব ফেলতে শুরু করেন।

কে মন্ত্রী হবে, কে বাদ পড়বে—এসব বিষয়ে তাঁর মতামত গুরুত্ব পেত। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় অযোগ্য কিন্তু অনুগত লোক বসানো হতো। চার্চ ও রাষ্ট্রের সম্পর্কেও তাঁর কথা শোনা হতো।

এটা ছিল এক ধরনের ছায়া ক্ষমতা। বাইরে থেকে দেখলে রাষ্ট্র চলছে নিয়মমাফিক। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সিদ্ধান্তগুলো আসছে এক ব্যক্তির প্রভাব থেকে, যিনি কোনো কাঠামোর ভেতরে নেই। এই অবস্থাই সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়।

যুদ্ধের মাঝখানে দরবারী রাজনীতি
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ রাশিয়ার জন্য ছিল বিশাল চাপ। যুদ্ধ পরিচালনা, অর্থনীতি সামলানো, মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছিল। ঠিক এই সময় জার নিকোলাস দ্বিতীয় নিজে ফ্রন্টে চলে যান সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নিতে।
এর ফল কী হয়? রাজধানীতে কার্যত শাসন চলে যায় জারিনা ও রাসপুতিনের হাতে।

মন্ত্রী বদল হতে থাকে একের পর এক। আজ যিনি আছেন, কাল তিনি নেই। অভিজ্ঞতার চেয়ে আনুগত্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রশাসন দিশেহারা হয়ে পড়ে।

রাষ্ট্র যখন যুদ্ধরত, তখন দরকার স্থিরতা। কিন্তু সেখানে দেখা গেল অস্থিরতা, গুজব আর ভয়।

ইউরোপজুড়ে তখন আলোচনা—রাসপুতিন কি জার্মানপন্থী? তিনি কি রাশিয়াকে যুদ্ধ থেকে বের করে আনতে চান? এসব কথার সত্যতা যাই হোক, এতে রাশিয়ার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মিত্ররাও সন্দিহান হয়ে পড়ে।

একটি রাষ্ট্র যখন নিজের সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়াই পরিষ্কার রাখতে পারে না, তখন বাইরের দুনিয়াও তাকে বিশ্বাস করে না।

Rusputin Inner 3

সমস্যা রাসপুতিন নাকি রাষ্ট্র নিজেই?
রাসপুতিনকে ঘিরে যত গল্প, গুজব আর আতঙ্ক—সবকিছুর কেন্দ্রে একটাই সহজ ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হয়: ‘একজন খারাপ মানুষ রাষ্ট্রটাকে ধ্বংস করেছে।’ কিন্তু ইতিহাস সাধারণত এত সরল হয় না। প্রশ্নটা একটু গভীরে নিয়ে গেলে দেখা যায়, রাসপুতিন আসলে কারণের চেয়ে বেশি ছিলেন পরিণতি।

প্রথম প্রশ্নটি তাই হওয়া উচিত—রাসপুতিন কীভাবে রাষ্ট্রক্ষমতার এত কাছে এলেন?

একজন গ্রাম্য সাধু কীভাবে একটি বিশাল সাম্রাজ্যের দরবারে ঢুকে পড়তে পারেন, যদি রাষ্ট্রের ভেতরের দরজাগুলো আগেই আলগা না থাকত?

জারতন্ত্রের শেষ দিকের রাশিয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। সংসদ ছিল দুর্বল, আমলাতন্ত্র ছিল ভীত, সেনাবাহিনী রাজনীতিতে বিভক্ত। কেউ দায়িত্ব নিতে চাইত না, আবার কেউ সিদ্ধান্তের দায় নিতে ভয় পেত। সবকিছু নির্ভর করছিল জারের ব্যক্তিগত ইচ্ছা আর মানসিক অবস্থার ওপর।

এই জায়গাতেই রাসপুতিন হয়ে ওঠেন গুরুত্বপূর্ণ। তিনি রাষ্ট্র চালানোর দক্ষতা দিয়ে নয়, ঢুকেছিলেন শাসকের ব্যক্তিগত জীবনের ফাঁকফোকর দিয়ে। রাজপুত্রের অসুস্থতা ছিল রাজপরিবারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, আর রাসপুতিন সেই দুর্বলতার মধ্য দিয়েই দরবারে জায়গা করে নেন।

এখানে সমস্যাটা রাসপুতিনের চরিত্র নয়—সমস্যাটা হলো, রাষ্ট্র ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেছিল। যখন কোনো রাষ্ট্র তার প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে একজন মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সেই মানুষ ভালো হোক বা খারাপ—রাষ্ট্র বিপদের দিকেই এগোয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাসপুতিনকে থামানোর মতো শক্তিও তখন কারও ছিল না। দরবারে অনেকে তাঁকে ঘৃণা করতেন, ভয় পেতেন, সন্দেহ করতেন। কিন্তু কেউ সরাসরি দাঁড়িয়ে বলতে পারেননি, ‘এটা ঠিক হচ্ছে না।’ কারণ ক্ষমতা তখন যুক্তি দিয়ে নয়, ভয় আর আনুগত্য দিয়ে চলছিল।

এই জায়গায় রাসপুতিন হয়ে ওঠেন এক ধরনের আয়না। তাঁর ভেতর দিয়ে স্পষ্ট দেখা যায়, রাষ্ট্রের ভেতরের পচন কতটা গভীরে পৌঁছেছিল। যদি রাসপুতিন না থাকতেন, অন্য কেউ হয়তো সেই জায়গা নিত। কারণ সমস্যাটা ছিল কাঠামোর, ব্যক্তির নয়।

Rusputin Inner 2

হত্যাকাণ্ড: আতঙ্কের চূড়ান্ত প্রকাশ
১৯১৬ সালের শেষ দিকে এসে রাসপুতিন রাশিয়ার অভিজাত সমাজের কাছে শুধু বিরক্তিকর নন, ভয়ংকর হয়ে ওঠেন। তাঁকে ঘিরে যত গুজব ছড়ায়—জার্মানপন্থী হওয়া, রাষ্ট্র ধ্বংসের ষড়যন্ত্র, দরবারকে কলুষিত করা—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন এক ধরনের জাতীয় আতঙ্কের প্রতীক।

এই আতঙ্ক থেকেই ১৯১৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর সংঘটিত হয় সেই ঝড় তোলা হত্যাকাণ্ড।

যারা রাসপুতিনকে হত্যা করে, তারা কেউ বিপ্লবী ছিল না। তারা ছিল রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ, অভিজাত শ্রেণির মানুষ—রাজপুত্র, অভিজাত সেনা কর্মকর্তা, প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। অর্থাৎ, যারা এতদিন রাষ্ট্র চালানোর সুবিধা ভোগ করেছে, তারাই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয়—এই মানুষটিকে সরাতে হবে।

হত্যার ঘটনাটি নিজেই বলে দেয় পরিস্থিতি কতটা বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। রাসপুতিনকে ডেকে এনে বিষ খাওয়ানো হয়। কাজ না হওয়ায় গুলি করা হয়। তাতেও নিশ্চিত না হয়ে তাঁকে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। এই অতিরিক্ত সহিংসতা শুধু একজন মানুষকে মারার চেষ্টা ছিল না—এটা ছিল আতঙ্কের বহিঃপ্রকাশ। তারা বিশ্বাস করত, রাসপুতিন বেঁচে থাকলে রাষ্ট্র বাঁচবে না।

কিন্তু এখানেই ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম শিক্ষা লুকিয়ে আছে। রাসপুতিন মারা গেলেও রাষ্ট্র বাঁচেনি। বরং তাঁর হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্রের দুর্বলতাকে আরও নগ্ন করে দেয়। এটা দেখিয়ে দেয়, সমস্যা সমাধানের জন্য রাষ্ট্র তখন আর আইনের পথে হাঁটতে পারছিল না—হাঁটছিল ষড়যন্ত্র আর সহিংসতার পথে।

এই হত্যাকাণ্ড আসলে ছিল স্বীকারোক্তি। এই স্বীকারোক্তি যে, রাষ্ট্র নিজের ভেতরের সমস্যা ঠিক করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিষ্ঠান দিয়ে নয়, তারা চেষ্টা করেছিল একজন মানুষকে সরিয়ে সব ঠিক করার।

কিন্তু রাষ্ট্র মানুষের ওপর দাঁড়িয়ে ভাঙে না—ভাঙে কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে। তাই রাসপুতিনের মৃত্যু সাময়িক স্বস্তি দিলেও, বিপর্যয় থামাতে পারেনি। কয়েক মাসের মধ্যেই জারতন্ত্রের পতন ঘটে।

রাসপুতিনের লাশ নদীতে ভেসে গেলেও, যে ভাঙনের তিনি প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, তা তখন পুরো রাষ্ট্রজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

Rusputin Inner 5

রাসপুতিন কি আজও প্রাসঙ্গিক?
গ্রিগরি রাসপুতিন কোনো রাজা ছিলেন না। কোনো রাষ্ট্রপ্রধানও না। কিন্তু তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন—পদ ছাড়াও ক্ষমতা থাকে, আর সেই ক্ষমতাই কখনো কখনো একটি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে শেষ করে দিতে পারে।

রাসপুতিন আজ ইতিহাস। কিন্তু তার মতো ছায়া ক্ষমতাধারীরা আজও আছে। বিভিন্ন দেশে আজও দেখা যায়—ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা দায়হীন মানুষ, ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ওপর দাঁড়ানো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে ব্যক্তির প্রভাব বেড়ে যাওয়া।

এসব কারণেই রাসপুতিন শুধু রাশিয়ার গল্প নন। তিনি রাষ্ট্রব্যবস্থার এক চিরচেনা বিপদের নাম।

বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প