
নায়করাজ রাজ্জাক [২৩শে জানুয়ারি ১৯৪২ – ২১শে আগস্ট ২০১৭]
বাংলা সিনেমার ইতিহাসে নায়করাজ রাজ্জাক এমন এক নাম, যার সঙ্গে ভালোবাসা, জনপ্রিয়তা আর আলোচনা—সবই জড়িয়ে আছে। তার সঙ্গে বহু বছর ধরে উচ্চারিত একটি বিশেষ অভিধা হলো— গরিবের উত্তম কুমার। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই নামটি কিছুটা অস্বস্তিকর শোনালেও, একসময় এটি ছিল খুবই পরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত। কেন রাজ্জাককে এই নামে ডাকা হতো—তা বোঝার জন্য আমাদের ফিরে যেতে হবে সময়, সমাজ আর দর্শকের বাস্তবতার ভেতরে।
উত্তম কুমার ছিলেন স্বপ্নের নায়ক
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে উত্তম কুমার ছিলেন বাঙালি দর্শকের কল্পনার নায়ক। তিনি ছিলেন শহুরে, পরিপাটি, মার্জিত এবং রোমান্টিক। তার চরিত্রগুলোতে ছিল আবেগ, দ্বন্দ্ব, প্রেমের ব্যথা আর আত্মসংকট। উত্তম কুমারের নায়কত্ব ছিল এমন এক নায়কত্ব, যা দেখার সময় দর্শক বাস্তব জীবন ভুলে গিয়ে স্বপ্নে ঢুকে পড়তে পারত। কিন্তু এই স্বপ্নের জগৎ সবার জীবনের সঙ্গে মিলে যেত না। গ্রামবাংলা কিংবা নিম্ন-মধ্যবিত্ত জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে উত্তম কুমারের জগৎ ছিল অনেকটাই দূরের।


সাধারণ দর্শকের সঙ্গে উত্তমের দূরত্ব
উত্তম কুমারের চরিত্রগুলো বেশিরভাগ সময়েই ছিল শিক্ষিত, শহুরে ও ভদ্রসমাজকেন্দ্রিক। তার পোশাক, ভাষা, চলাফেরা—সবকিছুতেই একধরনের এলিট ভাব ছিল। ফলে অনেক দর্শকের কাছে তিনি ছিলেন ‘আদর্শ’ বা ‘স্বপ্নের’ নায়ক, কিন্তু ‘আমাদের মতো’ নায়ক নন। এই দূরত্বই এমন এক জায়গা তৈরি করে, যেখানে দর্শক নিজের জীবনের সঙ্গে মিল খুঁজে পায় এমন কাউকে খুঁজতে শুরু করে।
রাজ্জাক ছিলেন পরিচিত মুখের নায়ক
এই শূন্যস্থানেই নায়করাজ রাজ্জাক উঠে আসেন। রাজ্জাক ছিলেন অনেক বেশি বাস্তব ও পরিচিত ধরনের নায়ক। তার গায়ের রং, মুখের গড়ন, উচ্চারণ, শরীরী ভাষা—সবকিছুই সাধারণ মানুষের কাছের। তিনি এমন একজন নায়ক, যাকে দেখে গ্রাম বা মফস্বলের দর্শক ভাবতে পারত, “এই ছেলেটা তো আমাদের পাশের বাড়িরই একজন।” রাজ্জাকের নায়কত্বে কোনো অতিরিক্ত পালিশ ছিল না, ছিল সোজাসাপ্টা দৃঢ়তা।

প্রেমিক হিসেবে রাজ্জাকের আলাদা অবস্থান
রাজ্জাকের প্রেমিক চরিত্রগুলো উত্তম কুমারের মতো আবেগপ্রবণ বা আত্মসংকটে ভরা ছিল না। তিনি কম কাঁদতেন, কম ভাঙতেন, বেশি স্থির থাকতেন। উত্তমের মতো এক্সপ্রেসিভ তিনি ছিলেন না। তার প্রেম ছিল সরাসরি, কখনো কখনো খানিকটা রুক্ষ, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য। এই ধরনের প্রেমিক চরিত্র সাধারণ দর্শকের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, কারণ এতে নিজের জীবনের ছায়া দেখা যেত। এক্ষেত্রে জহিরুল হক পরিচালিত ‘রংবাজ’ (১৯৭৩) সিনেমাটির কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সিনেমার বাজেট ও সুযোগের পার্থক্য
এই তুলনার পেছনে আরেকটি বড় কারণ ছিল সিনেমা নির্মাণের বাস্তবতা। উত্তম কুমারের সিনেমাগুলো তৈরি হতো বড় বাজেটে, উন্নত স্টুডিওতে, ভালো আলো, সেট ও কস্টিউমে। অন্যদিকে রাজ্জাকের অধিকাংশ সিনেমা তৈরি হতো সীমিত বাজেটে, কম সুযোগ-সুবিধায়। ফলে অনেকেই মনে করত, উত্তম কুমারের মতো নায়কত্ব এখানে আছে, কিন্তু উপস্থাপনটা তুলনামূলক কম জাঁকজমকপূর্ণ। এই জায়গা থেকেই “গরিবের উত্তম কুমার” কথাটি চালু হতে থাকে।

শ্রেণি ভাবনা ও মানসিক উপনিবেশিকতা
‘গরিবের উত্তম কুমার’ কথাটার ভেতরে একটা গভীর শ্রেণি ভাবনা লুকিয়ে আছে। পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি ও সিনেমাকে দীর্ঘদিন ধরে ‘স্ট্যান্ডার্ড’ বা ‘আদর্শ’ ধরা হতো। আর পূর্ব পাকিস্তান বা পরবর্তী বাংলাদেশের সিনেমাকে দেখা হতো তার কম উন্নত সংস্করণ হিসেবে। এই মানসিকতার ফলেই রাজ্জাককে সরাসরি তার নিজের পরিচয়ে না দেখে, উত্তম কুমারের সঙ্গে তুলনা করে বোঝানো হতো।
রাজ্জাক কখনো উত্তম হওয়ার চেষ্টা করেননি
এই তুলনার সবচেয়ে বড় ভুলটা এখানেই। নায়করাজ রাজ্জাক কখনো উত্তম কুমার হওয়ার চেষ্টা করেননি। তিনি উত্তমের স্টাইল, সংলাপ বলার ধরন বা আবেগী ভাঙন অনুকরণ করেননি। বরং তিনি নিজের ভাষা, নিজের ভঙ্গি, নিজের নায়কত্ব তৈরি করেছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে বদলেছেন এবং চরিত্রের পরিধি বাড়িয়েছেন।

রোমান্টিক নায়ক থেকে সময়ের প্রতিনিধি
সত্তরের দশকের পর রাজ্জাক আর শুধু প্রেমিক নন। তিনি হয়ে ওঠেন যুদ্ধ-পরবর্তী সমাজের প্রতিনিধি, দায়িত্বশীল পুরুষ, কখনো কখনো কর্তৃত্বশীল পিতা বা অভিভাবক চরিত্র। এই পর্যায়ে এসে তাকে উত্তম কুমারের সঙ্গে তুলনা করা আর যুক্তিসঙ্গত থাকে না। কারণ তখন দুজনের নায়কত্বের ভাষাই আলাদা। এর প্রমাণ রাজ্জাক দিয়েছিলেন ‘রংবাজ’ (১৯৭৩), ‘গুণ্ডা’ (১৯৭৬), ‘কী যে করি'(১৯৭৬), ‘মাটির ঘর’ (১৯৭৯) সিনেমাগুলো দিয়ে।
কেন নামটা এতদিন টিকে গেল
এই নামটি টিকে গেছে মূলত তুলনা করার অভ্যাস থেকে। বাংলার মিডিয়া নতুন নায়ককে বুঝতে পুরোনো নায়কের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে ভালোবাসে। আর সেই সময় উত্তম কুমার ছিলেন মাপকাঠি। ফলে রাজ্জাককে বোঝাতে গিয়ে তাকে উত্তমের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল।

আজ পেছন ফিরে তাকালে বোঝা যায়, নায়করাজ রাজ্জাক ‘গরিবের উত্তম কুমার’ নন। এই নামটি আসলে একটি সময়ের সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির ফল।
উত্তম কুমার ছিলেন মধ্যবিত্ত বাঙালির স্বপ্নের নায়ক,আর রাজ্জাক ছিলেন সাধারণ বাঙালির আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। এই কারণেই নায়করাজ রাজ্জাক আজও একটি সময়ের মুখ হয়ে আছেন—নিজের পরিচয়ে, নিজের শক্তিতে।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প













































