বৃহস্পতিবার । মার্চ ৫, ২০২৬
সেতু ইসরাত লাইফস্টাইল ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ৩:৩৪ অপরাহ্ন
শেয়ার

স্মার্টফোনের আড়ালে সাইলেন্ট জেনারেশন 


Silent-Generation

বিকেলের ম্লান আলোয় জানালার গ্রিল ধরে একাকী বসে আছেন বাড়ির জ্যেষ্ঠ সদস্য। স্মৃতিরা হয়তো তাকে নিয়ে গেছে সত্তর দশকের কোনো চেনা গলিতে, কিংবা মুক্তিযুদ্ধের সেই হারানো দিনগুলোর ডায়েরিতে। ঠিক সেই মুহূর্তে পাশের সোফায় বসে আছে তার নাতি, প্রজন্মের আধুনিক প্রতিনিধি ‘জেন-জি’। তার চোখ জোড়া স্মার্টফোনের নীল আলোয় উজ্জ্বল, আঙুলগুলো দ্রুত চলছে টিকটক বা রিলসের জাদুকরী স্ক্রলে। একই ঘরে দুজন মানুষ, একই বাতাসের ঘ্রাণ; অথচ মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল অদৃশ্য দেয়াল। এই দেয়াল ইটের নয় বরং ডিজিটাল স্ক্রিন আর নীরবতার প্রলেপে তৈরি এক অদ্ভুত ব্যবধান।

একটা সময় ছিল যখন সন্ধ্যার আজানের পর বাড়ির বড়রা গোল হয়ে বসতেন। রূপকথা নয় বরং জীবন থেকে নেওয়া হাজারো গল্পের ডালপালা মেলত সেই আসরগুলোতে। সাইলেন্ট জেনারেশনের (জন্ম ১৯২৫-১৯৪৫) সেই প্রবীণ মানুষগুলোর অভিজ্ঞতার ঝুলিই ছিল পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পরম জ্ঞান। 

Silent-Generation

কিন্তু আজকের ডিজিটাল যুগে তথ্যের সমুদ্র যখন হাতের মুঠোয়, তখন জেন-জি (১৯৯৭-২০১২) প্রজন্মের কাছে সেই জীবন্ত গল্পের বইগুলো বড় বেশি উপেক্ষিত। গুগল যেখানে নিমিষেই উত্তর দেয়, সেখানে বড়দের দীর্ঘ আলাপকে তাদের কাছে মনে হয় একঘেয়ে ‘লেকচার’।

এই আধুনিক প্রযুক্তির ভিড়ে বাড়ির প্রবীণরা যেন ধীরে ধীরে নিজ ঘরেই পরবাসী হয়ে পড়ছেন। তারা দেখতে পান, তাদের প্রিয় নাতি-নাতনিরা ভার্চুয়াল জগতের হাজারো অচেনা মানুষের সাথে হাসছে, কথা বলছে, এমনকি আবেগ ভাগাভাগি করছে; অথচ পাশের চেয়ারে বসে থাকা মানুষটির চোখের পানি বা নিঃসঙ্গতা তাদের নজরে আসছে না। 

স্মার্টফোন এখানে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয় বরং হয়ে দাঁড়িয়েছে এক অলঙ্ঘনীয় দেয়াল। এই ডিজিটাল গ্যাপ বয়স্কদের মনে জন্ম দিচ্ছে এক গভীর অবসাদ, তারা নিজেদের ভাবছেন অপ্রাসঙ্গিক।

সেতুবন্ধন হবে কীভাবে?
তবে এই দেয়াল ভেঙে আবার প্রাণের জোয়ার ফেরানো কি অসম্ভব? মোটেও না। প্রয়োজন কেবল একটু মায়া আর সময়ের ইনভেস্টমেন্ট। প্রযুক্তির সেই স্মার্টফোনটিই হতে পারে মিলনের সেতু। এই ডিজিটাল দেয়াল ভেঙে আবার প্রাণের স্পন্দন ফেরাতে প্রয়োজন দ্বিমুখী প্রচেষ্টা:

  • ডিজিটাল মেন্টরশিপ: জেন-জি তাদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ব্যবহার করে বড়দের সাহায্য করতে পারে। দাদুকে ইউটিউবে তার প্রিয় পুরনো গানটি খুঁজে দেওয়া কিংবা নানিকে ভিডিও কলে দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের সাথে কথা বলিয়ে দেওয়া হতে পারে সুন্দর শুরুর উপায়। এতে বড়রা নিজেদের আধুনিক বিশ্বের অংশ মনে করবেন।

Silent-Generation

  • ‘নো ফোন জোন’ তৈরি করা: দিনের অন্তত এক ঘণ্টা বা খাবারের টেবিলে স্মার্টফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা জরুরি। এই সময়টুকু কেবল গল্প আর একে অপরের খোঁজ নেওয়ার জন্য বরাদ্দ রাখা যেতে পারে।
  • গল্পের আদান-প্রদান: বড়দের অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে গল্প শোনার অভ্যাস গড়তে হবে। জেন-জি বুঝতে শিখুক যে, উইকিপিডিয়ার তথ্যের চেয়ে বড়দের জীবনবোধ অনেক বেশি সমৃদ্ধ।
  • ধৈর্য ও সহমর্মিতা: প্রযুক্তির কোনো বিষয় বড়দের একবার বুঝিয়ে দিলে না বুঝলে বিরক্ত হওয়া চলবে না। মনে রাখতে হবে, শৈশবে তারা আপনাকে হাজারবার একই জিনিস ধৈর্য ধরে শিখিয়েছেন। 
  • পারিবারিক বিনোদনের ডিজিটাল ফিউশন: জেন-জি এবং সাইলেন্ট জেনারেশনের রুচির মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকলেও বিনোদনের কিছু সাধারণ জায়গা খুঁজে বের করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, নাতনি তার স্মার্টফোনে দাদুকে পুরনো সাদাকালো যুগের কোনো সিনেমা দেখাতে পারে কিংবা দাদু নাতিকে সঙ্গে নিয়ে কোনো স্ট্র্যাটেজি গেম খেলতে পারেন। প্রযুক্তি যখন দুজনকে আলাদা না করে বরং একসাথে বিনোদন দেবে, তখন ডিজিটাল গ্যাপটি দ্রুত মিটে যাবে।
  • স্মৃতির ডিজিটাল আর্কাইভ বা আর্কাইভাল প্রোজেক্ট: বড়দের কাছে থাকা পুরনো ছবি, ডায়েরি বা হাতে লেখা চিঠিগুলো জেন-জি সদস্যরা ডিজিটালাইজ করার উদ্যোগ নিতে পারে। ছবিগুলো স্ক্যান করে ক্লাউডে রাখা বা বড়দের জবানিতে তাদের জীবনযুদ্ধ রেকর্ড করে রাখা যেতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় কাজ করার সময় দুই প্রজন্মের মধ্যে গভীর আলাপচারিতার সুযোগ তৈরি হবে। বড়রা অনুভব করবেন যে তাদের অতীত অভিজ্ঞতাগুলো বর্তমান প্রজন্মের কাছে এখনও মূল্যবান।

Silent-Generation

  • রিভার্স লার্নিং বা একে অপরকে শেখানো: যোগাযোগ কেবল ছোটরা বড়দের শেখাবে তা নয় বরং এটি হওয়া উচিত দ্বিমুখী। ছোটরা যেমন বড়দের ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপ চালানো শেখাবে, তেমনি বড়রা ছোটদের শেখাতে পারেন গাছ লাগানো, রান্না করা বা হাতে কলমে কোনো কাজ। যখন জেন-জিরা বড়দের কাছে কোনো কিছু শিখতে আগ্রহী হবে, তখন বড়রা নিজেদের ‘অপ্রাসঙ্গিক’ ভাবার বদলে আত্মবিশ্বাসী বোধ করবেন। এই আদান-প্রদানই সম্পর্কের অদৃশ্য দেয়ালটি ভেঙে ফেলবে।

স্মার্টফোন যেন আমাদের জীবনের চালক না হয়ে কেবল একটি মাধ্যম হিসেবেই থাকে। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় আমরা যেন ভুলে না যাই যে, মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন কোনো সফটওয়্যার বা অ্যালগরিদম দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। সাইলেন্ট জেনারেশনের অভিজ্ঞতার আলো আর জেন-জির আধুনিকতার তেজ যখন একত্রিত হবে, তখনই ঘরগুলো আবার হয়ে উঠবে সত্যিকারের আবাসস্থল। স্মার্টফোন যখন দেয়াল না হয়ে সেতুবন্ধন হবে, তখনই সার্থক হবে আমাদের ডিজিটাল জীবন।

বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প