
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বৈশ্বিক তেলের দাম ইতোমধ্যে ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ব জ্বালানি বাজারে দীর্ঘ সময় ধরে অনুভূত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যুদ্ধটি দ্রুত শেষ হলেও ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা, সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত এবং সমুদ্রপথে পরিবহনের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কয়েক সপ্তাহ বা মাস বেশি জ্বালানি মূল্যের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে, বিশেষ করে সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময়। জ্বালানি খরচ বাড়া এবং বিদেশি সংঘাতে জড়ানোর বিষয়ে মার্কিন ভোটাররা সাধারণত সংবেদনশীল।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বৈশ্বিক তেলের দাম ইতোমধ্যে ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে ভোক্তাদের জ্বালানি ব্যয়ও বাড়ছে।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন-এর তথ্য অনুযায়ী, শনিবার যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের জাতীয় গড় দাম প্রতি গ্যালন ৩.৪১ ডলারে পৌঁছেছে (প্রতি লিটার প্রায় ০.৯ ডলার), যা এক সপ্তাহে ০.৪৩ ডলার বেড়েছে। একই সময়ে বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস সতর্ক করেছে, যদি জাহাজ চলাচলে বাধা অব্যাহত থাকে তবে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারেরও বেশি হতে পারে।
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯১ ডলারে স্থির হয়েছে। ১৯৮৩ সাল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এটি এক সপ্তাহে সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে দাম আরও বাড়তে পারে।
জেপি মরগ্যানের বিশ্লেষকদের মতে, বাজার এখন শুধু ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি হিসাব করছে না; বরং বাস্তব সরবরাহ ব্যাঘাতের প্রভাবও অনুভব করতে শুরু করেছে। রিফাইনারি বন্ধ হওয়া এবং রপ্তানি সীমাবদ্ধতার কারণে অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।
সংঘাতের কারণে ইতোমধ্যে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ স্থগিত হয়ে গেছে। ইরান তার উপকূল ও ওমানের মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে এবং আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোতেও আঘাত হানছে।
প্রণালীটি প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অঞ্চলের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক ও কুয়েত—বিশ্বের বিভিন্ন রিফাইনারিতে পাঠানোর জন্য প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের চালান স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। এটি বিশ্বব্যাপী প্রায় ১.৪ দিনের চাহিদার সমান।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক বাণিজ্যের ৮০ শতাংশের বেশি সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয়। ফলে এই জলপথে বিঘ্ন ঘটলে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়তে পারে এবং সরবরাহে বিলম্ব হতে পারে।
জিবুতির অর্থমন্ত্রী ইলিয়াস এম. দাওয়ালেহ শনিবার সতর্ক করে বলেন, এই সংঘাত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ‘গুরুতর অর্থনৈতিক পরিণতি’ ডেকে আনতে পারে। তিনি সামাজিক মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, সমুদ্র বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল ছোট রাষ্ট্রগুলো বহিরাগত ধাক্কার কারণে আরও গভীর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে।
এদিকে মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি জানিয়েছেন, তার দেশের অর্থনীতি ‘প্রায় জরুরি অবস্থার’ মধ্যে রয়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন।
উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল সংরক্ষণাগার দ্রুত পূর্ণ
এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস সংরক্ষণাগারগুলো দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। ফলে ইরাক ও কুয়েতের কিছু তেলক্ষেত্রে উৎপাদন কমিয়ে দিতে হয়েছে এবং বিশ্লেষকদের মতে শিগগিরই সংযুক্ত আরব আমিরাতও একই পদক্ষেপ নিতে পারে।
একটি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেন, ১যদি জাহাজ আসা বন্ধ থাকে, খুব শিগগিরই সবাইকে উৎপাদন বন্ধ করতে হতে পারে।’
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন তেলক্ষেত্র এভাবে বন্ধ হয়ে গেলে সেগুলো আবার স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন রিস্ট্যাড এনার্জির আমেরিকা অঞ্চলের বাণিজ্যিক বিভাগের প্রধান আমির জামান।
তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও উৎপাদন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কয়েক দিন, কয়েক সপ্তাহ কিংবা কয়েক মাসও লাগতে পারে। এটি নির্ভর করবে তেলক্ষেত্রের ধরন, বয়স এবং কীভাবে উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছিল তার ওপর।’
অন্যদিকে ইরানি বাহিনী অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো—রিফাইনারি ও টার্মিনালসহ—লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে, যার ফলে অনেক স্থাপনা বন্ধ হয়ে গেছে এবং কিছু স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, এই পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতিতে একসঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ধীরগতির প্রবৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আল জাজিরা অবলম্বনে







































