
মিজানুর রহমান: লিড- হেলথ, নিউট্রিশন অ্যাণ্ড ওয়াশ, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ
গত দুই দশকে দারিদ্র্য হ্রাসে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবুও দেশের লাখো পরিবার এখনো পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে সংগ্রাম করছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ১৮–১৯ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে এবং বিশেষ করে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও নিম্নআয়ের এলাকায় খাদ্য অনিরাপত্তা অনেক পরিবারের জন্য নিত্যদিনের বাস্তবতা।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এই চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাত ও যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে এবং জ্বালানি, সার, গম ও ভোজ্য তেলের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার ফলে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত খাদ্যের দামের ওপর পড়ছে।
বাংলাদেশের মতো দেশ, যা অনেক খাদ্যপণ্যের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল, এমন বৈশ্বিক ধাক্কায় দ্রুত প্রভাবিত হয়। জ্বালানি ও সারের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদনের খরচ বেড়ে যায়, আর আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যের দাম বাড়লে নিম্নআয়ের পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। ফলে অনেক পরিবারে খাবারের পরিমাণ কমে যায়, খাদ্যের বৈচিত্র্য হ্রাস পায় এবং পুষ্টির ঝুঁকি বাড়ে- বিশেষ করে শিশু, কিশোরী ও গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে।
এই প্রভাব ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০২২ অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রায় ২৪ শতাংশ খর্বাকৃতির, ১২ শতাংশ ক্ষয়গ্রস্ত এবং ২২ শতাংশ ওজনস্বল্পতায় ভুগছে। এসব পরিসংখ্যান কেবল জনস্বাস্থ্যের একটি সমস্যা নয়; বরং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতার জন্যও একটি বড় হুমকি।
খর্বাকৃতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ এটি দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি এবং মস্তিষ্কের বিকাশে প্রতিবন্ধকতার ইঙ্গিত দেয়। জীবনের প্রথম এক হাজার দিনে—অর্থাৎ গর্ভধারণ থেকে দুই বছর বয়স পর্যন্ত—যদি শিশুর পর্যাপ্ত পুষ্টি না হয়, তবে তার মেধা বিকাশ, শেখার ক্ষমতা এবং ভবিষ্যতে আয় করার সক্ষমতা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একইভাবে মাতৃ পুষ্টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অনেক কিশোরী ও গর্ভবতী নারী এখনো রক্তস্বল্পতা ও অপুষ্টিতে ভুগছেন, যা কম ওজনের শিশু জন্ম এবং পরবর্তী সময়ে শিশুর খর্বাকৃতির ঝুঁকি বাড়ায়। তাই নারীর পুষ্টি উন্নয়ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে কার্যকর বিনিয়োগগুলোর একটি।
এই প্রেক্ষাপটে ফ্যামিলি কার্ড উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক নারী সদস্যদের হাতে নগদ অর্থ বা খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দিলে একদিকে যেমন নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তাও শক্তিশালী হবে। তবে অপুষ্টি মোকাবিলায় শুধু খাদ্যের পরিমাণ বাড়ানো যথেষ্ট নয়; পুষ্টিকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে। সহায়তার আওতায় আয়রন ও ভিটামিন সমৃদ্ধ চাল ও আটা, পুষ্টিসমৃদ্ধ ভোজ্য তেল, ডাল, ডিম এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শাকসবজি ও ফল অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, যা খাদ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে সহায়ক।
এছাড়া আচরণগত পরিবর্তনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থার সঙ্গে মোবাইলভিত্তিক পুষ্টি বার্তা যুক্ত করা হলে পরিবারগুলো সহজেই জানতে পারবে একচেটিয়া স্তন্যদান, সঠিক সম্পূরক খাদ্য, মাতৃ পুষ্টি এবং বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য।
পুষ্টির উন্নতি কেবল খাদ্যের ওপর নির্ভর করে না; নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যবিধি এবং খাদ্য নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বারবার সংক্রমণ বা দূষিত খাদ্যের কারণে শিশুর শরীর অনেক সময় খাদ্য থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণ করতে পারে না।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে সঠিকভাবে পরিকল্পিত সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। পুষ্টি-কেন্দ্রিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ফ্যামিলি কার্ড উদ্যোগটি কেবল একটি নিরাপত্তা বলয় নয়; এটি বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের ধাক্কা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দিতে পারে, নারীর ক্ষমতায়নকে শক্তিশালী করতে পারে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ ও সক্ষম সমাজ গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে।
বিশ্ব যখন অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন সামাজিক সুরক্ষা নীতির কেন্দ্রে পুষ্টিকে স্থান দেওয়া বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগগুলোর একটি হতে পারে।
মিজানুর রহমান: লিড- হেলথ, নিউট্রিশন অ্যাণ্ড ওয়াশ, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ










































