
বিপণন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, নীতি পরামর্শক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সাক্ষী হয়। ছাত্রদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুতই রূপ নেয় ছাত্র–জনতার সম্মিলিত শক্তিতে। স্লোগান ছিল স্পষ্ট—গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সুশাসন, জবাবদিহিতা, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুনর্গঠন। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমেছিল বহুদিন ধরে। বিরোধীরা অভিযোগ তুলছিলেন ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ, বিরোধী কণ্ঠ দমনের প্রবণতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যহীনতার।
এই প্রেক্ষাপটে আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল নৈতিক পুনর্জাগরণের আহ্বান। তরুণ প্রজন্ম নিজেদের ভবিষ্যৎ পুনর্দখলের ভাষায় কথা বলেছিল। নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক অঙ্গনসহ বহু স্তরের মানুষ যুক্ত হয়েছিল। আন্দোলনের শক্তি ছিল তার নৈতিক অবস্থানে।
সরকার পতনের পর দেশজুড়ে আশা তৈরি হয় নতুন এক রাজনৈতিক অধ্যায় শুরু হবে।
কিন্তু ইতিহাস বলে, আন্দোলনের প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয় ক্ষমতা পরিবর্তনের পর।
আন্দোলন থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায়
জুলাই–আগস্টের আন্দোলনে যাঁরা সামনে ছিলেন, তাঁদের কয়েকজন দ্রুতই রাষ্ট্রক্ষমতার অংশ হয়ে ওঠেন—কেউ উপদেষ্টা, কেউ নীতিনির্ধারণী ভূমিকায়, কেউবা নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ মুখ। অনেকেই এটিকে স্বাভাবিক রূপান্তর হিসেবে দেখেছেন। আন্দোলন নেতৃত্ব তৈরি করে আর নেতৃত্ব কখনো না কখনো রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নেয়।
কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই কিছু নেতার বিরুদ্ধে অনিয়ম, পক্ষপাত, অস্বচ্ছ সিদ্ধান্ত এবং ব্যক্তিস্বার্থ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। কোথাও নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন, কোথাও প্রকল্প বরাদ্দে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ, কোথাও রাজনৈতিক সুবিধাবাদের সমালোচনা।
সব অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও জনমনে সন্দেহ জন্মায়। আর যে আন্দোলন নৈতিক উচ্চতায় দাঁড়িয়ে শুরু হয়েছিল, তার জন্য সন্দেহই বড় আঘাত।
আস্থার ভঙ্গুরতা
এই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল জনগণের বিশ্বাস—যে নতুন নেতৃত্ব পুরোনো রাজনীতির পুনরাবৃত্তি করবে না। আন্দোলনের ভাষায় ছিল আইনের শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা।
যখন সেই নেতৃত্বেরই কারও বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তখন হতাশা তীব্র হয়। বিষয়টি কেবল অর্থনৈতিক দুর্নীতি নয়; এটি প্রত্যাশা ভঙ্গের প্রশ্ন।
বিশেষ করে তরুণ সমাজ, যারা এই আন্দোলনের চালিকাশক্তি ছিল, তাদের মধ্যে প্রশ্ন জাগে
এ কি কেবল মুখ বদল, নাকি সত্যিকারের পরিবর্তন?
কাঠামোগত বাস্তবতা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র মেরুকরণ, ব্যক্তিনির্ভর নেতৃত্ব এবং বিজয়ী-সর্বস্ব মানসিকতার দ্বারা প্রভাবিত। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় দলীয় প্রভাবের বাইরে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারেনি এমন অভিযোগ নতুন নয়।
এই কাঠামোর মধ্যে নতুন নেতৃত্ব এলেও, তারা পুরোনো প্রথার চাপের মুখে পড়ে। ক্ষমতায় টিকে থাকা, রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ -এসব বাস্তবতা আদর্শকে চ্যালেঞ্জ করে। আপস শুরু হয় ছোট জায়গা থেকে, পরে তা বড় আকার নেয়।
তাই কেবল নেতৃত্ব পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার—দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের কার্যকর স্বায়ত্তশাসন, নির্বাচন ব্যবস্থার আস্থা পুনর্গঠন এবং তথ্যপ্রবাহের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
তাহলে কি আন্দোলন ব্যর্থ?
ব্যর্থতার রায় এত দ্রুত দেওয়া কঠিন। এই অভ্যুত্থান দেখিয়েছে যে নাগরিক সমাজ এখনও জীবন্ত, তরুণরা রাজনীতির প্রতি উদাসীন নয়, এবং গণচাপ ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে পারে।
তবে এটাও সত্য, আন্দোলনের পরবর্তী সময় যদি একই ধরনের অস্বচ্ছতা ও অনিয়মের জন্ম দেয়, তাহলে মানুষের হতাশা আরও গভীর হবে। গণতন্ত্র কেবল সরকার বদল নয়; এটি আস্থার পুনর্গঠন।
যদি মানুষ মনে করে সব নেতৃত্ব একই রকম, তবে রাজনৈতিক নিরাশা বাড়বে। আর গণতন্ত্রের জন্য সেটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
একটি প্রজন্মের দায়িত্ব
২০২৪-এর আন্দোলন ছিল ডিজিটাল যুগের প্রজন্মের আন্দোলন। তারা বিশ্বরাজনীতির ভাষা বোঝে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দাবি করে, এবং প্রতীকের চেয়ে বাস্তব ফলাফল চায়।
এই প্রজন্ম যদি দেখেন যে তাঁদের আন্দোলনের নেতারাই ক্ষমতায় গিয়ে পুরোনো রাজনীতির ধারায় হাঁটছেন, তবে তারা হয় রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, নয়তো আরও সংগঠিত নাগরিক নজরদারি গড়ে তুলবে।
গণতন্ত্র টিকে থাকে কেবল নির্বাচন দিয়ে নয়; টিকে থাকে সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণে—নীতিনির্ধারণে নজরদারি, বাজেট পর্যবেক্ষণ, স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধ রক্ষায় সামাজিক ঐকমত্যে।
সামনের পথ
জুলাই–আগস্ট ২০২৪ এখনও শেষ হয়নি; এটি চলমান একটি অধ্যায়। যদি অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হয়, দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়, তাহলে আন্দোলনের নৈতিক শক্তি কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধার হতে পারে। কিন্তু যদি ক্ষমতা রক্ষাই একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তবে ইতিহাস একে আরেকটি অপূর্ণ বিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে।
প্রতিবাদের প্যারাডক্স এখানেই -যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছিল, তারাই যদি ক্ষমতায় গিয়ে একই ভুল করে, তবে আন্দোলনের আত্মাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
অভ্যুত্থান কেবল পতনের গল্প নয়; এটি পুনর্গঠনেরও গল্প। ২০২৪ আমাদের শিখিয়েছে জনশক্তি কী করতে পারে। এখন প্রশ্ন -নেতৃত্ব কি সেই শক্তির প্রতি সৎ থাকতে পারবে?
শেষ পর্যন্ত, গণতন্ত্রের লড়াই একদিনের নয়। এটি নৈতিকতার ধারাবাহিক চর্চা। আর সেই চর্চা ব্যর্থ হলে, বিপ্লব নয়—আস্থাই সবচেয়ে বড় পরাজিত হয়।
ড. শরিফুল ইসলাম দুলু: বিপণন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, নীতি পরামর্শক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। মার্কেটার্স ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (এমআইবি)-এর সেক্রেটারি জেনারেল এবং মার্কটেল কনসাল্টিং গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা
[এই বিভাগের মতামত লেখকের নিজস্ব]







































