
সিউল ২০২৩ সালে “গ্র্যান্ডচাইল্ড কেয়ার অ্যালাউন্স” কর্মসূচি চালু করে
দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু আইল্যান্ডে দাদা–দাদী বা নানা–নানীদের নাতি–নাতনির যত্ন নেওয়ার জন্য মাসে প্রায় ২০০ ডলার ভাতা দেওয়া শুরু করেছে। স্থানীয় সরকারগুলো শিশুসেবা বা চাইল্ডকেয়ারে সহায়তা দেওয়ার নতুন নতুন উপায় খুঁজছে এবং একই সঙ্গে দেশের দ্রুত কমে যাওয়া জন্মহার মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে।
মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির আওতায়, যারা আনুষ্ঠানিক ডে-কেয়ার সেবার বদলে নিজেদের নাতি–নাতনিদের দেখাশোনা করবেন, সেই দাদা–দাদী বা আত্মীয়স্বজনদের ভাতা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কোরিয়ান ব্রডকাস্টিং সিস্টেম। জেজু প্রাদেশিক পরিষদ এই উদ্যোগ অনুমোদন করেছে। এর আগে রাজধানী সিউলে চালু হওয়া একই ধরনের একটি কর্মসূচি সফল হওয়ায় সেটি অনুসরণ করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে সিউল সিটি সরকারের এক জরিপে দেখা যায়, যারা নাতি–নাতনিদের দেখাশোনা করছেন, সেই দাদা–দাদীদের ৯৯.২ শতাংশ এই কর্মসূচিতে সন্তুষ্ট। আর ৯৯.৫ শতাংশ বলেছেন, তারা অন্যদেরও এটি নেওয়ার পরামর্শ দেবেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার গণমাধ্রযমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ সিউলে ৫,৪৬৬ জন এই ভাতার সুবিধা পেয়েছেন।
সিউল ২০২৩ সালে “গ্র্যান্ডচাইল্ড কেয়ার অ্যালাউন্স” কর্মসূচি চালু করে। এর আওতায় দাদা–দাদী বা অন্য আত্মীয়রা যদি মাসে অন্তত ৪০ ঘণ্টা শিশুর যত্ন নেন, তবে পরিবারকে প্রতি মাসে ৩ লাখ ওয়ন (প্রায় ২০৪ ডলার) দেওয়া হয়।
এই সুবিধা পেতে হলে পরিবারের শিশুর বয়স দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে হতে হবে এবং পরিবারের মোট আয় জাতীয় গড় আয়ের ১৫০ শতাংশের বেশি হওয়া যাবে না। এছাড়া শিশুদের এমন পরিবারে থাকতে হবে যেখানে চাইল্ডকেয়ারের ঘাটতি রয়েছে—যেমন স্বামী–স্ত্রী উভয়ই কর্মজীবী, একক অভিভাবকের পরিবার বা একাধিক সন্তানের পরিবার। দুই কর্মজীবী দম্পতির ক্ষেত্রে যোগ্যতা নির্ধারণের সময় তাদের মোট আয়ের ২৫ শতাংশ কম ধরে হিসাব করা হয়।
এই উদ্যোগ দক্ষিণ কোরিয়ায় শিশু লালন-পালনের পদ্ধতিতে একটি পরিবর্তনের প্রতিফলন। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং কাজের ধরনে পরিবর্তনের কারণে তরুণ পরিবারগুলোর জন্য দাদা–দাদী বা নানা–নানীরা এখন গুরুত্বপূর্ণ সহায়তাকারী হিসেবে পরিণত হয়েছেন। একজন অভিভাবক তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আমি আমার সন্তানদের দেখাশোনার জন্য বাবা–মাকে কিছু অর্থ দিতে চাই। শহর কর্তৃপক্ষ আমার হয়ে সহায়তা করছে—এটা ভেবে ভালো লাগছে।’
দুই কর্মজীবী পরিবারের সংখ্যা বাড়া এবং শিশুসেবার খরচ বেড়ে যাওয়া এবং ডে-কেয়ারের সীমিত সুযোগের কারণে দাদা–দাদীরাই অনেক ক্ষেত্রে সেই শূন্যতা পূরণ করছেন। আর এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর সহায়ক পরিচর্যাকারীদের মধ্যে ৫৪ শতাংশ ছিলেন মাতৃকূলের নানী, ৩৬.৪ শতাংশ ছিলেন পিতৃকূলের দাদী। অন্যদিকে দাদা বা নানা মিলিয়ে মোট পরিচর্যাকারীর ১০ শতাংশেরও কম।
অভিভাবকেরা কেন দাদা–দাদীর ওপর নির্ভর করেন—এরও নানা কারণ উল্লেখ করেছেন। ৪৮ শতাংশের মতো উত্তরদাতা বলেছেন তারা পেশাদার চাইল্ডকেয়ার কর্মীদের পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেন না। ৪৬.৪ শতাংশ বলেছেন জরুরি চাইল্ডকেয়ারের ব্যবস্থা কম। আর ৪৫.৬ শতাংশ জানিয়েছেন একা শিশুর যত্ন সামলানো কঠিন।
পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ এখন গুরুতর জনসংখ্যাগত সংকটের মুখে পড়েছে। তাই শিশুসেবা সহজ করতে নানা নীতি গ্রহণ করা তাদের জন্য অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে জন্মহার কমতে থাকার পর দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০২৫ সালে আবার কিছুটা বৃদ্ধি দেখা গেছে।
গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ায় মোট ২ লাখ ৫৪ হাজার ৫০০টি শিশু জন্মেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৬.৮ শতাংশ বেশি এবং ২০০৭ সালের পর সবচেয়ে বড় বার্ষিক বৃদ্ধি।
কিম পদবির এক নারী, যিনি গত ডিসেম্বর তার দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দিয়েছেন তিনি জানান, ‘প্রথম সন্তানের জন্মের পর সরকার থেকে ২০ লাখ ওয়নের একটি ভাউচার পাওয়ার মতো নগদ সুবিধা পেয়ে আমার মনে হয়েছিল দ্বিতীয় সন্তান নিলেও হয়তো বোঝাটা ততটা ভারী হবে না।’
তিনি আরও বলেন, তার প্রথম সন্তানের জন্য ডে-কেয়ারে জায়গা পাওয়া খুব কঠিন ছিল। কিন্তু দ্বিতীয়বার গর্ভবতী হওয়ার পর তার প্রথম সন্তান ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পেয়েছিল, ফলে ভর্তি হওয়া সহজ হয়েছে।
দাদি-নানীর ওপর বাড়তি নির্ভরশীলতা এটাও দেখায় যে কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের যত্ন নেওয়ার পদ্ধতিও বদলাচ্ছে। ২০২৫ সালে দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক জরিপ অনুযায়ী, এখন শিশুদের গড়ে ১৯.৮ মাস বয়সেই ডে-কেয়ার বা কিন্ডারগার্টেনে পাঠানো হচ্ছে। ২০০৯ সালে এই গড় বয়স ছিল ৩০ মাস।
তথ্যসূত্র: দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট









































