বৃহস্পতিবার । এপ্রিল ১৬, ২০২৬
ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক আন্তর্জাতিক ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ২:৪১ অপরাহ্ন
শেয়ার

এক্সপ্লেইনার

ট্রাম্পের বড় বাজি—যা নির্ধারণ করতে পারে যুদ্ধের গতিপথ


Trump Hormuz

এই কৌশলের লক্ষ্য হলো নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলা ছাড়াই সংঘাতের অবসান ঘটানো

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জাহাজ ও বন্দর অবরোধের মাধ্যমে সরাসরি সামরিক হামলা থেকে সরে এসে অর্থনৈতিক যুদ্ধের পথ বেছে নিয়েছেন। এই কৌশলের লক্ষ্য হলো নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলা ছাড়াই সংঘাতের অবসান ঘটানো।

এই পরিকল্পনার মূল ধারণা হলো—ইরান যদি তার তেল রপ্তানি করতে না পারে এবং জরুরি পণ্য আমদানি বন্ধ হয়ে যায়, তবে দেশটি গুরুতর অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটে পড়বে এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হবে।

এটি তাত্ত্বিকভাবে কার্যকর হতে পারে। আগে থেকেই নিষেধাজ্ঞায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের অর্থনীতি দ্রুত খাদ্যসংকট, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং ব্যাংকিং সংকটে পড়তে পারে। বিশেষ করে ইরান যখন হরমুজ প্রণালী আংশিক বন্ধ করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করেছে, তখন পাল্টা এই অবরোধকে একটি কৌশলগত জবাব হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের এই আশাবাদ একটি পুরোনো অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে—যে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মতো করেই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, ইরাক, আফগানিস্তান, রাশিয়া বা লিবিয়ার মতো দেশগুলো প্রায়শই পশ্চিমা হিসাব অনুযায়ী আচরণ করেনি।

চাপ বাড়লে কি নতি স্বীকার করবে ইরান?
এই কৌশলের একটি অন্তর্নিহিত আশা হলো—অর্থনৈতিক চাপ বাড়লে ইরান ছাড় দেবে। একই সঙ্গে ধারণা করা হচ্ছে, অর্থনৈতিক দুরবস্থা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অসন্তোষও বাড়াতে পারে।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের শাসকগোষ্ঠী অতীতেও জনদুর্ভোগকে গুরুত্ব না দিয়ে কঠোর দমননীতি চালিয়েছে। এমনকি যুদ্ধে শীর্ষ নেতাদের নিহত হওয়ার পরও সরকার টিকে আছে—যা তাদের সহনশীলতার প্রমাণ। ফলে এটিকে ‘অস্তিত্বের লড়াই’ হিসেবে দেখলে ইরান হয়তো আবারও যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবকে ভুল প্রমাণ করতে পারে।

সময়ই নির্ধারণ করবে ফলাফল
এই অবরোধ কতটা দ্রুত প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ইরানের ওপর চাপ বাড়ার আগেই যদি বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ক্ষতির মুখে পড়ে, তবে এই কৌশল উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিক ফাঁদ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বিশ্বে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ইতোমধ্যে কমে গেছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ইরানের অর্থনীতিতে দ্রুত আঘাতের সম্ভাবনা
বিশ্লেষকদের মতে, এই অবরোধ বাস্তবায়নযোগ্য কারণ মার্কিন নৌবাহিনীর যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে এবং অতীতেও তারা যুগোস্লাভিয়া, হাইতি এবং ভেনেজুয়েলার মতো ক্ষেত্রে অবরোধ কার্যকর করেছে। হরমুজ প্রণালীর বাইরেও মার্কিন নৌবাহিনী, বিমান ও সেনা মোতায়েন করে অবরোধ কার্যকর করা সম্ভব।

কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, কয়েক দিনের মধ্যেই এই অবরোধ ইরানের বাণিজ্য বন্ধ করে দিতে পারে, তেল রপ্তানি থামিয়ে দিতে পারে এবং মুদ্রাস্ফীতি বাড়াতে পারে। কারণ ইরানের ৯০ শতাংশের বেশি বাণিজ্য এই প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল।

ঝুঁকিপূর্ণ পাল্টা পদক্ষেপের সম্ভাবনা
এই অবরোধ ইরানের জন্য নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তারা পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর হামলা বাড়াতে পারে। আরেকটি সম্ভাবনা হলো—ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে লোহিত সাগরে তেল পরিবহন বন্ধ করা, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেবে।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ঝুঁকি রয়েছে। ইরানের তেল ক্রেতা দেশ যেমন চীন বা ভারতের জাহাজ আটকে দিলে বড় কূটনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে—বিশেষ করে যখন ট্রাম্প শিগগিরই চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা করছেন।

চুক্তির আশা, কিন্তু অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে
হোয়াইট হাউস এখনও আশাবাদী যে এই অবরোধ নতুন আলোচনার পথ খুলে দেবে। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে তারা ইতিবাচক। তবে বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান এখনো অনেক দূরে। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করুক এবং হিজবুল্লাহ ও হামাসের মতো গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন বন্ধ করুক।

অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি করছে এবং তার ক্ষেপণাস্ত্র ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার ধরে রাখতে চায়। সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ২০ বছরের জন্য বন্ধ রাখার প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে ইরান ৫ বছরের প্রস্তাব দিয়েছে—মাঝামাঝি একটি সমঝোতা হতে পারে।

ফলে এই অবরোধ ব্যর্থ হলে কী হবে, তা নয়—বরং সফল হলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি, সূক্ষ্ম এবং ধৈর্যশীল কূটনীতি প্রয়োজন—যার অভাব এখনো স্পষ্ট।

সিএনএন অবলম্বনে

ভিজ্যুয়াল স্টোরি >>>