
স্বাধীনতার পরের বাংলাদেশে অর্থনীতির ভেতর সবচেয়ে নীরব কিন্তু গভীর পরিবর্তনগুলোর একটি ঘটেছিল মধ্যবিত্তের গঠনে। সরকারি চাকরিনির্ভর সীমিত সামাজিক কাঠামো থেকে ধীরে ধীরে জন্ম নিতে থাকে নতুন এক শ্রেণি—যারা ছোট ব্যবসা, প্রবাসী আয়, গ্রামীণ বাজার ও বেসরকারি উদ্যোগের ভেতর দিয়ে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে। এই রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল জিয়াউর রহমানের সময়কাল, যখন রাষ্ট্রনির্ভর অর্থনীতি থেকে সরে এসে ব্যক্তি ও বাজারকেন্দ্রিক সম্ভাবনার জায়গা কিছুটা হলেও প্রসারিত হতে শুরু করে।
রাষ্ট্রের ভেতর নতুন মানুষ
স্বাধীনতার পরের বাংলাদেশে ‘মধ্যবিত্ত’ শব্দটি ছিল অনেকটাই শহুরে চাকরিজীবী আর সরকারি কর্মকর্তাকেন্দ্রিক। ঢাকার কয়েকটি পাড়া, জেলা শহরের কিছু পরিবার, শিক্ষক-আইনজীবী-ডাক্তার— এই ছিল মূলত মধ্যবিত্তের চেহারা। গ্রামে তখনও সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি ছিল জমি। রাষ্ট্রের চাকরি ছিল নিরাপত্তার প্রতীক। ব্যবসা অনেকের চোখে ছিল অনিশ্চিত, কখনো কখনো সন্দেহজনকও।
সত্তরের দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্ভিক্ষ, জাতীয়করণ আর যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতির ভেতর বাংলাদেশ তখন টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। ঠিক এই বাস্তবতায় জিয়াউর রহমানের সময়টিতে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে আরেক ধরনের অর্থনৈতিক দর্শনের দিকে যেতে শুরু করে। সেটি পুরোপুরি মুক্তবাজারও ছিল না, আবার আগের রাষ্ট্রনির্ভর কাঠামোর পুনরাবৃত্তিও না। বরং সেখানে ছিল ছোট উদ্যোক্তা, প্রবাসী শ্রম, গ্রামীণ বাজার, বেসরকারি খাত এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগকে জায়গা করে দেওয়ার চেষ্টা।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সামাজিক ফলগুলোর একটি ছিল নতুন মধ্যবিত্তের উত্থান।
চাকরির বাইরে স্বপ্ন
জিয়ার আমলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল মানসিকতায়। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রই সব করবে— এই ধারণা থেকে ধীরে ধীরে মানুষ বের হতে শুরু করে। সরকার শিল্পকারখানা চালাবে, ব্যাংক চালাবে, ব্যবসা করবে— এই কেন্দ্রীয় কাঠামো থেকে সরে এসে ব্যক্তি উদ্যোগকে কিছুটা জায়গা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশি মধ্যবিত্তের ইতিহাসে এটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কারণ এর আগে সামাজিক উন্নতির প্রধান পথ ছিল সরকারি চাকরি। কিন্তু জিয়ার সময় ছোট ব্যবসা, ট্রেডিং, আমদানি, পরিবহন, কনট্রাক্টিং কিংবা বিদেশে কাজ— এসব ধীরে ধীরে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করে।
এই সময়টায় বাংলাদেশের শহরগুলোতে নতুন ধরনের মানুষের আবির্ভাব ঘটে। তারা পুরনো জমিদার শ্রেণি নয়, আবার পুরোপুরি দরিদ্রও নয়। হয়তো কারও বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক, কিন্তু ছেলে সৌদি আরব থেকে টাকা পাঠিয়ে টিনের ঘর পাকা করলেন। কেউ ছোট দোকান থেকে পাইকারি ব্যবসায় গেলেন। কেউ ট্রাক কিনলেন। কেউ বাজারে সার-বীজের ডিলার হলেন। এই মানুষগুলোই পরবর্তী বাংলাদেশের বিস্তৃত মধ্যবিত্তের ভিত্তি তৈরি করতে শুরু করে।
প্রবাসের টাকায় বদলে যাওয়া সমাজ
জিয়া আমলের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনগুলোর একটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজারের দিকে ঝুঁকে পড়া। সত্তরের দশকের তেলের অর্থনীতির বিস্তার বাংলাদেশকে নতুন সুযোগ দেয়। সরকারও শ্রম রপ্তানিকে উৎসাহিত করতে শুরু করে।
এর ফলে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের বহু নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও গ্রামীণ পরিবার আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়।
একজন মানুষ হয়তো কুয়েত বা সৌদি আরবে শ্রমিক হিসেবে গেলেন। কিন্তু তার পাঠানো টাকা গ্রামের ভেতর নতুন সামাজিক বাস্তবতা তৈরি করল। পাকা বাড়ি উঠল, সন্তানদের স্কুলে পাঠানো হলো, বাজারে নতুন দোকান খুলল, জমি কেনা হলো, সেলাই মেশিন এল, টেলিভিশন এল।
বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের বিস্তার এখানে শুধু আয়ের প্রশ্ন ছিল না। এটি ছিল আকাঙ্ক্ষার বিস্তারও। মানুষ প্রথমবার বুঝতে শুরু করল, জন্মগত শ্রেণি পরিচয় চিরস্থায়ী নয়।
পরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স যে বিশাল শক্তিতে পরিণত হয়, তার প্রাথমিক সামাজিক ভিত্তি তৈরি হতে থাকে এই সময়েই।
গ্রামীণ অর্থনীতির নীরব পরিবর্তন
জিয়ার সময়কে অনেকেই শুধু রাজনৈতিক দৃষ্টিতে দেখেন। কিন্তু সামাজিক অর্থনীতির দিক থেকে দেখলে বোঝা যায়, এই সময় গ্রামীণ বাংলাদেশে বাজারভিত্তিক এক নতুন গতিশীলতা তৈরি হচ্ছিল।
গ্রাম তখনও কৃষিনির্ভর, কিন্তু শুধু ধানচাষ আর জীবিকার একমাত্র উৎস থাকল না। হাট-বাজার বড় হতে লাগল। সড়ক যোগাযোগ কিছুটা বিস্তৃত হলো। ছোট ট্রেডিং, পরিবহন, কৃষিপণ্য সরবরাহ— এসবের ভেতর নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হতে থাকে।
গ্রামীণ সমাজে তখন এক নতুন শ্রেণি দেখা যায়— যারা পুরোপুরি কৃষক নয়, আবার শহুরে এলিটও নয়। তারা বাজারের সঙ্গে যুক্ত। নগদ অর্থের সঙ্গে যুক্ত। সন্তানের শিক্ষাকে বিনিয়োগ হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের বড় অংশ পরে এই গ্রামীণ আধা-উদ্যোক্তা সমাজ থেকেই উঠে আসে।
এনজিও, ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক গতিশীলতা
জিয়ার সময় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল রাষ্ট্রের বাইরে উন্নয়ন কাঠামোর জায়গা তৈরি হওয়া। এনজিওগুলো ধীরে ধীরে বড় পরিসরে কাজের সুযোগ পায়। ক্ষুদ্রঋণ ধারণাও বিস্তার পেতে শুরু করে। পরে এটি বিশাল আকার নেয়।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ক্ষুদ্রঋণ শুধু দারিদ্র্য কমানোর উপায় ছিল না। এটি মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের মনস্তত্ত্ব তৈরি করে। বিশেষ করে নারীদের ভেতর।
গ্রামের বহু পরিবার প্রথমবার ছোট মূলধন হাতে পায়। হাঁস-মুরগি, সেলাই, ক্ষুদ্র ব্যবসা— এসবের মাধ্যমে খুব ধীরে হলেও আয় ও আত্মবিশ্বাস বাড়ে। মধ্যবিত্তে ওঠার সিঁড়ি কখনো বড় শিল্প দিয়ে তৈরি হয় না; অনেক সময় ছোট ছোট আর্থিক গতিশীলতার সমষ্টি দিয়েই তৈরি হয়।
গার্মেন্টসের বীজ
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বিস্ফোরণ মূলত আশি ও নব্বইয়ের দশকে ঘটে। কিন্তু এর সামাজিক ও নীতিগত ভিত্তির একটি অংশ তৈরি হয় জিয়ার সময়েই। বেসরকারি খাতকে জায়গা দেওয়া, রপ্তানিমুখী চিন্তা, বিদেশি অংশীদারিত্বে তুলনামূলক নমনীয়তা— এসব পরবর্তী শিল্পায়নের পথ তৈরি করে।
গার্মেন্টস শিল্প শুধু অর্থনীতি বদলায়নি, মধ্যবিত্তের গঠনও বদলেছে। গ্রামের মেয়ে শহরে এসে চাকরি করছে, ভাইকে পড়াচ্ছে, পরিবারকে সহায়তা করছে— এই সামাজিক পরিবর্তনের শেকড়ও সেই সময়ের নীতিগত রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত।
বাংলাদেশের নতুন মধ্যবিত্তের বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কেবল পুরুষনির্ভর ছিল না। নারী শ্রম, নারী আয়, নারী শিক্ষাও এর ভেতরে ঢুকে পড়ে।
পুরনো ভদ্রলোক বনাম নতুন মধ্যবিত্ত
জিয়ার সময়ের পর বাংলাদেশে যে মধ্যবিত্ত বড় হতে থাকে, তারা পুরনো কলকাতাকেন্দ্রিক ‘ভদ্রলোক’ সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় মোড়ানো ছিল না। এই নতুন মধ্যবিত্ত ছিল অনেক বেশি বাস্তববাদী, অর্থনৈতিকভাবে উদ্যোগী এবং সামাজিকভাবে গতিশীল।
তারা ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে আড্ডা দেওয়ার চেয়ে সন্তানকে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াতে আগ্রহী। তারা জমিদারি ঐতিহ্যের চেয়ে ফ্ল্যাট, ব্যবসা, বিদেশযাত্রা কিংবা ব্যাংক ব্যালান্সকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তাদের কাছে রাষ্ট্র মানে শুধু আদর্শ নয়, সুযোগও।
বাংলাদেশের বর্তমান শহুরে সংস্কৃতির ভেতর এই শ্রেণির প্রভাব খুব স্পষ্ট। কোচিং সংস্কৃতি, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, বিদেশমুখী আকাঙ্ক্ষা, ছোট উদ্যোক্তা অর্থনীতি— সবকিছুর ভেতর সেই দীর্ঘ সামাজিক রূপান্তরের ছাপ আছে।
সীমাবদ্ধতা
তবে এই গল্প পুরোপুরি রোমান্টিক নয়। নতুন মধ্যবিত্তের উত্থানের সঙ্গে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বৈষম্যও বেড়েছে। কিছু উন্নয়নই ছিল অনানুষ্ঠানিক ও দুর্বল কাঠামোর ওপর দাঁড়ানো।
আরেকটি বড় বিষয় হলো, এই মধ্যবিত্তের একটি অংশ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বি হয়ে উঠলেও সাংস্কৃতিকভাবে অনিরাপদ ছিল। ফলে বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়, মধ্যবিত্ত একই সঙ্গে আধুনিক হতে চায়, আবার রক্ষণশীলতাও আঁকড়ে ধরে।
তবু ইতিহাসের দৃষ্টিতে দেখলে জিয়ার সময়টিকে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত বিকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ সূচনাকাল বলতেই হয়। কারণ এই সময়েই রাষ্ট্র প্রথম স্পষ্টভাবে বুঝতে শুরু করে— শুধু সরকারি কাঠামো দিয়ে সমাজ বদলানো সম্ভব নয়; মানুষকে নিজ শক্তিতে উঠতে দেওয়ার জায়গাও তৈরি করতে হয়।













































