
২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ মাঠের লড়াই দুর্দান্তভাবে জমে উঠেছে। এবার বিশ্বকাপ আগের চেয়ে বড়—আরও বেশি দল, আরও বেশি ম্যাচ, ফলে স্বাভাবিকভাবেই আরও বেশি অ্যাকশন। প্রতিদিন এত কিছু ঘটছে যে, সবথেকে জাদুকরী মুহূর্তটা বেছে নেয়া কষ্টকর।
তবে বাংলা টেলিগ্রাফের চোখে বিশ্বকাপের চতুর্থ দিন তথা ১৪ জুনের সবথেকে জাদুকরী মুহূর্ত ছিল আইভরি কোস্টের হয়ে ইকুয়েডরের বিপক্ষে আমাদ দিয়ালো’র ম্যাচজয়ী গোল।
একটি টাচ। যখন তা হয় প্রতিভার ছোঁয়া, তখন একটিই যথেষ্ট।
ইকুয়েডর বিশ্বকাপে নিজেদের জানান দিতে চেয়েছিলো বিশ্বের সবচেয়ে সংগঠিত ডিফেন্সিভ দলগুলোর একটি হিসেবে। দক্ষিণ আমেরিকার বাছাইপর্বে ১৮ ম্যাচে তারা মাত্র ৫টি গোল হজম করেছিল (দ্বিতীয় সেরা আর্জেন্টিনা হজম করেছিলো ১০টি)। ৮৯ মিনিট পর্যন্ত তারা আইভরি কোস্টকে আটকে রেখেছিল, কখনও সমানতালে, কখনও বা একটু এগিয়েও খেলেছিল। তারা তখন ন্যায্যভাবেই একটি পয়েন্টের দিকে এগোচ্ছিল। গ্রুপে কুরাসাওয়ের উপস্থিতি এবং তৃতীয় স্থানের সম্ভাবনা বিবেচনায়, এই ড্র দুই দলের জন্যই খারাপ ফল হতো না খুব একটা।
কিন্তু ৯০তম মিনিটে আমাদ করলেন এক স্পর্শ—একেবারে বিশুদ্ধ প্রতিভার স্পর্শ।
দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে নামা আমাদ তার সরাসরি ড্রিবলিং এবং আক্রমণাত্মক মানসিকতা দিয়ে ম্যাচের গতিপথ আইভরি কোস্টের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। বাস্তবে, দুই দলের মধ্যে সফল ড্রিবলিংয়ের সংখ্যায় তিনি ছিলেন সবার ওপরে (৫টি)। বল পায়ে পেলেই তিনি ইকুয়েডরের রক্ষণকে বারবার সমস্যায় ফেলছিলেন।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে দিন কতেক যায় ভালো, কতেক যায় খারাপ। রুবেন আমোরিমের অধীনে রাইট উইং-ব্যাক হিসেবে খেলেছেন আমাদ, পরে মাইকেল ক্যারিক তাকে আরও সামনে এনে উইঙ্গার হিসেবে ব্যবহার করেন। গোল খুব বেশি না পেলেও, তার ড্রিবলিং যে একটি ম্যাচ কতোখানি বদলে দিতে পারে, তা ওল্ড ট্র্যাফোর্ড দেখেছে। আর এবারের মঞ্চটা বিশ্বকাপ।
তবে আশ্চর্যজনকভাবে, এইবার তিনি ইকুয়েডরের কঠিন ডিফেন্স ভাঙেননি কোনো জটিল ড্রিবল দিয়ে। সেই কাজটি করেছিলেন এক অপ্রত্যাশিত খেলোয়াড়—সেন্টার-ব্যাক থেকে অস্থায়ী রাইট-ব্যাকে রূপ নেওয়া উইলফ্রেড সিঙ্গো।
সিঙ্গো যখন বল নিয়ে দৌড়াতে শুরু করলেন, তখন তিনি এত দ্রুত এগোচ্ছিলেন যে কেউ তাকে ধরতে পারছিলো না। আবার এতো দূরে ছিলেন যে মাঝমাঠে থাকা প্রধানতম আক্রমণগুলোও তাকে কভার করতে পারেনি। আমাদ তখন ধীরে চললেন।
আক্রমণভাগ ও ডিফেন্ডার— সবাই মিলে যখন ইকুয়েডরের বক্সের দিকে ঢুকছিলো, তখন আমাদের এই নীরব অবস্থান মাঝখানে এক ছোট্ট ফাঁকা জায়গা তৈরি করলো। সেই গ্যাপটাই চোখে পরে সিঙ্গো’র। তিনি বলটি জোরে ক্রস করে আমাদের দিকে পাঠালেন। ততোক্ষণে আমাদ বক্সের ভেতরে, আর তার মার্কাররা পেনাল্টি স্পটের কাছাকাছি।
সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে অধিকাংশ খেলোয়াড় প্রথম টাচেই শট নিতেন। কিন্তু এই বাউন্সিং বলটি প্রথম টাচে মারা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সামনে ছিলেন ৬ ফুট ৩ ইঞ্চির জ্যাকসন পোরোজো, ৬ ফুটের পিয়েরো হিঙ্কাপিয়ে, আর কাছের পোস্টে ৬ ফুট ২ ইঞ্চির গোলকিপার হার্নান গালিনদেজ। এ অবস্থায় বেশিরভাগের জন্যই প্রথম টাচে শট নেওয়াই স্বাভাবিক হতো।
কিন্তু আমাদ জানতেন, তিনি যদি তাড়াহুড়ো করেন, তাহলে পোরোজো, হিঙ্কাপিয়ে বা পেছন থেকে আসা ময়েসেস কাইসেডো তাকে গিলে ফেলবেন।
তাই তিনি আশ্রয় নিলেন অসাধারণ এক কৌশলের। বলটিকে নিজের শরীরের সামনে দিয়ে বাউন্স করতে দিলেন, তারপর বাঁ পায়ের ভেতরের দিক খুলে খুব মসৃণভাবে বলটিকে দূরের পোস্টের দিকে গড়িয়ে দিলেন। শটে ছিল না কোনো জোর, বরং ছিল নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ ও সূক্ষ্ম কারুকাজ—যেন তিনি বলটিকে নির্দেশ দিচ্ছেন, আর বল সেটাই মেনে চলেছে।
এই দেরিতে আসা গোল ইকুয়েডরকে ভেঙে দেয়, এবং স্কোরলাইন ১–০-ই থাকে।
‘ক্লাচ’ পারফরম্যান্সের আরেকটি উদাহরণ দেখালেন আমাদ। আইভরি কোস্টের হয়ে করা সাতটি গোলের মধ্যে পাঁচটিই ম্যাচ-উইনিং (এর মধ্যে ফ্রান্সের বিপক্ষে ৮৪তম মিনিটে করা গোলও রয়েছে)। তিনি এখন বিশ্বকাপে গোল করা সবচেয়ে কম বয়সী আইভোরিয়ান খেলোয়াড়। আবার ২০০৬ সালে ফ্রান্সেস্কো টট্টির পর তিনিই প্রথম বদলি খেলোয়াড়, যিনি বিশ্বকাপে এত দেরিতে ম্যাচ-উইনিং গোল করলেন। পাশাপাশি, এই জয় ছিল দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দলের বিপক্ষে আইভরি কোস্টের ইতিহাসের প্রথম জয়।
আর সবকিছুর শুরু হয়েছিল একটি স্পর্শ দিয়ে—একটি প্রতিভার স্পর্শ। এবং ইকুয়েডর পেলো গতো ২২ মাস পর প্রথম হারের স্বাদ।














































