বৃহস্পতিবার । মার্চ ৫, ২০২৬
সেতু ইসরাত লাইফস্টাইল ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৯:৩০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

ভোটের উত্তাপ থাকুক ব্যালট বাক্সে, আড্ডার টেবিলে নয়


election gossipঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ৯টা। ড্রয়িংরুমে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ হাতে দুই বন্ধু – অপু আর নবীন। দশ বছরের বন্ধুত্বে কোনোদিন টু শব্দ হয়নি অথচ আজ ভোট নিয়ে আলাপ শুরু হতেই দুজনের মুখ লাল। অপুর দাবি তার পছন্দের প্রার্থী সেরা আর নবীনের কাছে সেটিই অযোগ্য। আড্ডার মেজাজটা মুহূর্তেই বদলে গেল ‘শীতল যুদ্ধে’। মাঝখান থেকে চায়ের স্বাদটা তেতো হয়ে গেল।

নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করলেই আমাদের চারপাশের দৃশ্যগুলো এমন হয়ে ওঠে। বন্ধু, ভাই-বোন কিংবা দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী-ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। পাড়ার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে অভিজাত ড্রয়িংরুম – সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু রাজনীতি। 

নিজের প্রিয় দল বা প্রার্থীর পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে আমরা অনেক সময় এতটাই উত্তেজিত হয়ে পড়ি যে, বিপরীত পাশে বসা প্রিয় বন্ধু বা নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্কটাই তিক্ত করে ফেলি। অথচ ভিন্নমত থাকবেই, এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। রাজনীতির এই উত্তাল সময়ে আড্ডার পরিবেশ আনন্দদায়ক রাখতে এবং সম্পর্ক অটুট রাখতে আমাদের কিছু ‘পলিটিক্যাল এটিকেট’ বা রাজনৈতিক শিষ্টাচার মেনে চলা জরুরি। 

আক্রমণাত্মক না হয়ে গঠনমূলক আলোচনা
কারও রাজনৈতিক আদর্শ আপনার পছন্দ নাও হতে পারে। কিন্তু তার পছন্দকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা বা ব্যক্তিগত আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকুন। মনে রাখবেন, আপনি আদর্শের বিরোধিতা করছেন, মানুষটির নয়। 

  • আপনার সহকর্মী হয়তো এমন একজনকে সমর্থন করছেন যাকে আপনি অপছন্দ করেন। তাকে সরাসরি ‘আপনি একজন খারাপ মানুষকে সমর্থন করছেন’ না বলে বলতে পারেন, ‘আমি ওই প্রার্থীর এই নির্দিষ্ট পলিসিটির সঙ্গে একমত হতে পারছি না।’ এতে ব্যক্তি ছোট হয় না, আলোচনাটা হয় ইস্যুভিত্তিক।

election gossipশোনার মানসিকতা তৈরি করুন
ভালো বক্তা হওয়ার আগে একজন ভালো শ্রোতা হওয়া প্রয়োজন। সামনের মানুষটি কেন একটি নির্দিষ্ট দলকে সমর্থন করছেন, তার পেছনের যুক্তিটা বোঝার চেষ্টা করুন।

  • আড্ডায় বড় ভাই যখন তার পছন্দের দলের গুণগান করছেন, তখন মাঝপথে কথা কেড়ে নিয়ে নিজের যুক্তি চাপাবেন না। তাকে কথা শেষ করতে দিন। হতে পারে তার এলাকা বা পরিবার ওই দলের দ্বারা কোনোভাবে উপকৃত হয়েছে। শান্তভাবে শুনলে দেখা যায় তর্কের উত্তেজনা এমনিতেই অর্ধেক কমে গেছে।

তথ্যের সত্যতা যাচাই করুন
আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্যের ছড়াছড়ি। কোনো চটকদার খবর শুনেই তা আড্ডায় পরিবেশন করবেন না। কোনো দাবি করার আগে নিশ্চিত হোন আপনার কাছে সঠিক তথ্য আছে কি না।

  • ফেসবুকে দেখলেন কোনো প্রার্থী সম্পর্কে একটি বিতর্কিত ভিডিও ছড়িয়েছে। যাচাই না করেই বন্ধুদের আড্ডায় বলে বসলেন, ‘জানিস অমুক তো এই কান্ড করেছে!’ পরে যদি প্রমাণ হয় খবরটি গুজব ছিল, তবে বন্ধুদের কাছে আপনার নির্ভরযোগ্যতা ও ব্যক্তিত্ব – দুই-ই প্রশ্নের মুখে পড়বে।

তর্কের সীমা বুঝতে পারা
আলোচনা যখন তর্কের দিকে মোড় নেয় এবং পরিবেশ উত্তপ্ত হতে শুরু করে, তখনই থেমে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

  • কফির টেবিলে বিতর্কের এক পর্যায়ে দেখলেন আপনার বন্ধুর গলার স্বর চড়ে যাচ্ছে কিংবা আপনি নিজেই রেগে টেবিল চাপড়াচ্ছেন। তখনই ব্রেক নিন। হেসে বলে ফেলুন, ‘রাজনীতি নিয়ে তো অনেক হলো, এখন বল পরের মাসে আমাদের ট্যুরটা কোথায় হচ্ছে?’ একটি ছোট বাক্য মুহূর্তেই গুমোট পরিস্থিতি হালকা করে দেবে।

election gossipব্যক্তিগত সম্পর্ককে প্রাধান্য দিন
দিনশেষে নির্বাচন আসবে এবং যাবে কিন্তু আপনার বন্ধু, সহকর্মী বা স্বজনরা সারা জীবন পাশে থাকবেন। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা যেন দীর্ঘদিনের হৃদ্যতায় ফাটল না ধরায়।

  • আপনার ছোট ভাই হয়তো আপনার বিপক্ষ মতের সমর্থক। এ নিয়ে তার সাথে কথা বলা বন্ধ করা বা পারিবারিক অশান্তি করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। মনে রাখবেন, বিপদের সময় আপনার ভাই-ই আগে আসবে, আপনার প্রিয় রাজনৈতিক দলের নেতা নয়। বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করাই প্রকৃত শিষ্টাচার।

নির্বাচন হলো একটি উৎসব, যা আসে এবং যায়। কিন্তু আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনগুলো দীর্ঘদিনের গড়া এক অমূল্য সম্পদ। আপনার ভিন্নমতের বন্ধুটি হয়তো আপনার বিপদের দিনগুলোতে সবার আগে হাত বাড়িয়ে দেয় কিংবা যে স্বজনের সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে তর্কে জড়িয়েছেন, অসুস্থতায় তিনিই হয়তো আপনার পাশে এসে বসেন। তাই ভোটের উত্তাপে সম্পর্কের শীতলতা যেন না আসে। রাজনীতি থাকুক আদর্শের জায়গায় আর ভালোবাসা থাকুক হৃদয়ের মণিকোঠায়। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেও যে সৌহার্দ্য বজায় রাখা যায়, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে সেই উদাহরণ তৈরি করাই হোক এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় জয়।

বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প