
সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন পেতে নিয়মিত ব্যায়ামের বিকল্প নেই -এটি সর্বজনস্বীকৃত। তবে বর্তমানের প্রতিযোগিতামূলক জীবনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিমে কাটানো বা প্রতিদিন ১০ হাজার ধাপ হাঁটার লক্ষ্য পূরণ করা অনেকের জন্যই দুঃসাধ্য। সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের এক চাঞ্চল্যকর গবেষণায় উঠে এসেছে এর এক দারুণ সহজ সমাধান। গবেষকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় নয় বরং দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট কিন্তু জোরালো কিছু শারীরিক নড়াচড়াই অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে দিতে পারে।
বিজ্ঞানীরা এই বিশেষ পদ্ধতির নাম দিয়েছেন ‘ভিগোরাস ইন্টারমিটেন্ট লাইফস্টাইল ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটি’ (VILPA)। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এটি হলো প্রতিদিনের কাজের মধ্যেই খুব অল্প সময়ের জন্য শরীরের ওপর একটু বাড়তি চাপ দেওয়া। যেমন – লিফটের বদলে দ্রুত গতিতে সিঁড়ি বেয়ে ওঠা, বাস বা ট্রেন ধরার জন্য কিছুটা দৌড়ানো, ভারী বাজারের ব্যাগ বহন করা, দ্রুতলয়ে হাঁটা কিংবা বাগান বা ঘরের কাজ একটু জোরেশোরে করা। এমনকি শিশু বা পোষা প্রাণীর সঙ্গে মিনিটখানেকের দৌড়ঝাঁপও এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
২০২২ সালে যুক্তরাজ্যে ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষের ওপর পরিচালিত একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন মাত্র তিন থেকে চারবার এক মিনিট করে এই ধরনের ‘VILPA’ বা জোরালো কর্মকাণ্ড করেন, তাদের অকাল মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যায়। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, এর ফলে হৃদরোগজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি কমে প্রায় ৪৯ শতাংশ এবং ক্যানসারের ঝুঁকি কমে ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত। সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ম্যাথিউ আহমাদি জানান, এ ধরনের ক্ষুদ্র কিন্তু শক্তিশালী কর্মকাণ্ড শরীরে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং বয়সজনিত শারীরিক দুর্বলতা প্রতিরোধে ঢাল হিসেবে কাজ করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সাম্প্রতিক এক উদ্বেগজনক তথ্যে জানা গেছে, পর্যাপ্ত শারীরিক সক্রিয়তার অভাবে বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১৮০ কোটি মানুষ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। সময়ের অভাব ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন মানুষকে ক্রমেই স্থবির করে দিচ্ছে। লাফবরো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আমান্ডা ডেলির মতে, ব্যায়াম না করার জন্য মানুষের সবচেয়ে বড় অজুহাত হলো ‘সময় নেই’। কিন্তু VILPA পদ্ধতিতে যেহেতু আলাদা করে পোশাক বদলানো বা জিমে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, তাই এটি অত্যন্ত সাশ্রয়ী এবং সবার জন্য কার্যকর।
অনেকের মধ্যেই একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে, প্রতিদিন ১০ হাজার ধাপ না হাঁটলে কোনো লাভ নেই। তবে আধুনিক গবেষণা এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। দেখা গেছে, দিনে মাত্র ২২০০ থেকে ২৭০০ ধাপ হাঁটলেও হৃদরোগ ও অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। অর্থাৎ, বড় লক্ষ্যের পেছনে না ছুটে যতটুকু সম্ভব নড়াচড়া করাই শরীরের জন্য মঙ্গলজনক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শারীরিক সুস্থতার মূল মন্ত্র হলো ‘কিছু না করার চেয়ে সামান্য কিছু করাও অনেক ভালো’। ছোট ছোট এই অভ্যাসগুলোই ভবিষ্যতে বড় কোনো রোগের বিরুদ্ধে আপনার শরীরকে সুরক্ষিত রাখবে। তাই আজ থেকেই লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার কিংবা হাঁটার সময় গতি একটু বাড়িয়ে দেওয়ার মতো ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের পথে এক ধাপ এগিয়ে যান।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প











































