বৃহস্পতিবার । মার্চ ৫, ২০২৬
সেতু ইসরাত লাইফস্টাইল ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৬:১৮ অপরাহ্ন
শেয়ার

স্মার্টফোন ছাড়া কি কয়েক মিনিটও থাকা অসম্ভব? অস্বস্তি নাকি গভীর কোনো মানসিক রোগ?


nomophobiaসকালবেলা যখন জানালার ফাঁক দিয়ে প্রথম রোদের রেখা আপনার চোখে পড়ে, তখন আপনার হাতটি অবচেতনেই কি বালিশের আশেপাশে কিছু একটা খুঁজতে শুরু করে? অবচেতন মন কি প্রিয়জনের হাতের ছোঁয়ার চেয়ে প্লাস্টিক আর কাঁচের তৈরি সেই শীতল স্মার্টফোনটির ছোঁয়া পেতে বেশি ব্যাকুল হয়ে ওঠে? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে জানবেন আপনি একা নন; একবিংশ শতাব্দীর এক নীরব শিকলে আপনি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছেন।

কল্পনা করুন, অফিসে যাওয়ার পথে হুট করে খেয়াল করলেন ফোনটি বাসায় ফেলে এসেছেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই কি আপনার চারপাশটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যায়? মনে হয় কি বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপে একা দাঁড়িয়ে আছেন? বুকের ভেতরটা কি অজানা এক আশঙ্কায় ধড়ফড় করে ওঠে, যেন কোনো বড় বিপদ আসন্ন? চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এই যে ফোন হাতছাড়া হওয়ার তীব্র আতঙ্ক, একে কেবল ‘অভ্যাস’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এটি আসলে নোমোফোবিয়া— একবিংশ শতাব্দীর এমন এক মানসিক ব্যাধি যা মাদকাসক্তির চেয়েও কোনো অংশে কম নয়। আপনার পকেটে থাকা এই জাদুর বাক্সটি কি আপনার অজান্তেই আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে? আপনি কি ফোন চালাচ্ছেন, নাকি ফোনই আপনাকে চালাচ্ছে? আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা সেই অদৃশ্য রোগের গভীরতা এবং আপনার শরীরের ওপর এর বিধ্বংসী প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

একবিংশ শতাব্দীর অদৃশ্য মহামারি
‘নোমোফোবিয়া’ বা ‘নো মোবাইল ফোন ফোবিয়া’ বিষয়টি শুনতে সাধারণ মনে হলেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এটি এমন এক ধরণের উৎকণ্ঠা যা একজন মানুষকে তার স্মার্টফোন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে দেয় না। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এটি এখন আর কেবল তরুণ প্রজন্মের সমস্যা নয় বরং শিশু থেকে বৃদ্ধ -সবাই এই ডিজিটাল শিকলে বন্দি।

 

আপনার আসক্তি কতটুকু?

  • ফ্যান্টম ভাইব্রেশন সিনড্রোম: আপনি হয়তো গভীর মন দিয়ে কাজ করছেন বা কারো সাথে খাচ্ছেন। হুট করে মনে হলো পকেটে ফোনটি কেঁপে উঠল। দ্রুত ফোন বের করে দেখলেন – না, কোনো নোটিফিকেশন নেই। আপনার মস্তিষ্ক আসলে অলীক এক কম্পন অনুভব করেছে। এটি নোমোফোবিয়ার একটি বড় সতর্কবার্তা।
  • বাথরুমের সঙ্গী: বাথরুমে যাওয়ার সময়ও কি ফোন আপনার হাতে থাকে? এমনকি মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্যও কি আপনি ফোন ছাড়া থাকতে পারছেন না? গবেষকরা বলছেন, এটি আপনার মানসিক অস্থিরতার চূড়ান্ত পর্যায়।
  • চার্জ ভীতি: ফোনের চার্জ ৮০ শতাংশের নিচে নামলে কি আপনার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে? বাসে বা রাস্তায় চলার সময় চার্জ কমে গেলে কি আপনি প্রচণ্ড অসহায় বোধ করেন? এই ‘চার্জ আতঙ্ক’ আসলে আপনার আত্মবিশ্বাসের অভাবকেই প্রকাশ করে।
  • নির্ঘুম রাত: ঘুমানোর ঠিক আগে এবং ঘুম থেকে জেগেই কি আপনার প্রথম কাজ ফেসবুক বা ইউটিউব চেক করা?
  • অযৌক্তিক ভয়: ফোন হারিয়ে যাওয়া বা ভেঙে যাওয়ার কথা ভেবে কি আপনি মাঝেমধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখেন? 
  • অ্যালার্ম অজুহাত: ফোনের বদলে এনালগ ঘড়িতে অ্যালার্ম দিতে কি আপনার অনীহা কাজ করে?

nomophobiaঅদূর ভবিষ্যতে এর পরিণতি কী?
স্মার্টফোনের প্রতিটি লাইক, কমেন্ট বা নোটিফিকেশন আমাদের মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ নামক এক ধরণের ‘ফিল গুড’ হরমোন নিঃসরণ করে। যখন ফোন আমাদের কাছে থাকে না, তখন মস্তিষ্ক এই ডোপামিনের অভাব বোধ করে। ফলে শরীরে কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়। এর ফলেই অস্থিরতা, ঘাম হওয়া এবং বুক ধড়ফড় করার মতো শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়। দীর্ঘদিন এই ব্যাধিতে ভুগলে আপনার ওপর বেশ কিছু  প্রভাব পড়বে:

১. টেক্সট নেক সিনড্রোম: দিনভর মাথা নিচু করে স্ক্রল করার ফলে আপনার মেরুদণ্ডের হাড় ও ঘাড়ের পেশি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। 

২. নিদ্রাহীনতা ও অবসাদ: ঘুমানোর ঠিক আগে ফোনের নীল আলো আপনার মস্তিষ্কের মেলাটোনিন হরমোন ধ্বংস করে দেয়। ফলে আপনি ঘুমালেও আপনার মস্তিষ্ক বিশ্রাম পায় না, যার ফলশ্রুতিতে পরদিন সকালে আপনি খিটখিটে মেজাজ এবং ক্লান্তি অনুভব করেন। 

৩. সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: পাশের সোফায় বসা জীবিত মানুষটির চেয়ে আপনার কাছে হাজার মাইল দূরের ভার্চুয়াল মানুষটির স্ট্যাটাস বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটি আপনার ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোকে তিলে তিলে বিষিয়ে তুলছে।

 ৪. কগনিটিভ ডিক্লাইন: আপনার মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা এবং স্মৃতিশক্তি কমে যাবে।

৫. ডিজিটাল আই স্ট্রেইন (চোখের সমস্যা): দীর্ঘক্ষণ ফোনের উজ্জ্বল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের পলক কম পড়ে। এতে চোখ শুকিয়ে যাওয়া, চোখ লাল হওয়া এবং দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। ফোনের নীল আলো চোখের রেটিনার সরাসরি ক্ষতি করে, যা ভবিষ্যতে অন্ধত্বের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিতে পারে।

৬. টেক্সট ক্ল ও কারপাল টানেল: ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোন ধরে রাখা এবং বুড়ো আঙুল দিয়ে স্ক্রল করার ফলে হাতের কবজি এবং আঙুলের স্নায়ুতে প্রচণ্ড চাপ পড়ে। এতে হাতে অবশ ভাব বা তীব্র যন্ত্রণা হতে পারে।

nomophobiaএই ডিজিটাল জেলখানা থেকে মুক্তির পথ

  • নো-ফোন জোন: বাড়িতে অন্তত একটি ঘর (যেমন খাবার ঘর) বা একটি সময় (যেমন রাত ৯টার পর) নির্ধারণ করুন যেখানে ফোন পুরোপুরি নিষিদ্ধ। 
  • নোটিফিকেশন অফ: ফেসবুক বা ইন্সটাগ্রামের অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন। ফোনকে আপনাকে ডাকতে দেবেন না, আপনি প্রয়োজনে ফোন হাতে নেবেন। 
  • বিকল্প অভ্যাস: ফোনের স্ক্রিনের বদলে মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলুন। দীর্ঘ সময় ফোনে কথা না বলে মাঝেমধ্যে সরাসরি দেখা করার চেষ্টা করুন। 
  • ডিজিটাল ডিটক্স: সপ্তাহে অন্তত ৩ ঘণ্টা ফোন বন্ধ রেখে বাইরের প্রকৃতি বা পরিবারের সাথে সময় কাটান। শুরুতে কষ্ট হলেও ধীরে ধীরে আপনার মস্তিষ্ক শান্ত হতে শুরু করবে।

স্মার্টফোন তৈরি করা হয়েছিল আমাদের জীবনকে সহজ করতে, জীবনকে জিম্মি করতে নয়। পকেট থেকে ফোন বের করার আগে একবার ভাবুন- আপনি কি ফোন ব্যবহার করছেন, নাকি ফোনই আপনাকে ব্যবহার করছে? সুস্থ থাকতে হলে আজই এই অদৃশ্য শিকল থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করুন।

বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প