শীতের রেশ কাটিয়ে প্রকৃতিতে বসন্তের হাওয়া, আর ক্যালেন্ডারের পাতায় উঁকি দিচ্ছে অমর একুশে বইমেলা। বইপ্রেমীদের জন্য এটি এক উৎসবের সময়। তবে মেলা থেকে ঝুড়ি ভর্তি নতুন বই ঘরে আনার আগে আপনার বর্তমান সংগ্রহশালাটি গুছিয়ে নেওয়া জরুরি। আমাদের এই প্রিয় সঙ্গী বইগুলোর দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করতে প্রয়োজন বিশেষ মমতা ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ। কীভাবে নিজের সংগ্রহের বইগুলো দীর্ঘকাল ভালো রাখবেন এবং নতুন বইয়ের জন্য জায়গা খালি করবেন, তা থাকছে এই বিশেষ গাইডে।
নতুন বইয়ের জন্য ‘সর্টিং’ বা বাছাই প্রক্রিয়া
বইমেলা মানেই নতুন বইয়ের স্তূপ। কিন্তু শেলফে জায়গা সীমিত হলে পুরনো বইগুলোর একটি সুশৃঙ্খল ‘সর্টিং’ করা প্রয়োজন:
- বইগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করুন- ‘অবশ্যই রাখব’, ‘কাউকে উপহার দেব’ এবং ‘ফেলে দেব বা দান করব’।
- যেসব বই একবার পড়ে ফেলেছেন এবং ভবিষ্যতে আর পড়ার সম্ভাবনা কম, সেগুলো লাইব্রেরিতে বা অন্য কাউকে উপহার দিয়ে নতুন বইয়ের জায়গা খালি করুন।
- একই উচ্চতার বইগুলো পাশাপাশি সাজালে শেলফে জায়গা বাঁচে এবং দেখতেও নান্দনিক লাগে।
- ‘Goodreads’ অ্যাপের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আপনার সংগ্রহের তালিকা রাখুন। এতে বুঝতে পারবেন কোন ঘরানার বই আপনার বেশি আছে এবং নতুন কী কেনা প্রয়োজন।
আদর্শ পরিবেশ ও আবহাওয়া
বাংলাদেশে এখনকার শুষ্ক ও ধুলাবালিপূর্ণ আবহাওয়া বইয়ের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং। সরাসরি সূর্যের আলো বইয়ের মলাটের রং ফ্যাকাশে করে দেয়। তাই বুকশেলফটি ছায়াযুক্ত স্থানে রাখুন। শেলফে বই সাজানোর সময় দেয়াল থেকে অন্তত এক ইঞ্চি জায়গা ফাঁকা রাখুন যাতে বাতাস চলাচল করতে পারে। এছাড়া বই সংরক্ষণের জন্য ২০-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ভালো। অতিরিক্ত স্যাঁতসেঁতে দেয়ালে বা রান্নাঘরের পাশে বই রাখা থেকে বিরত থাকুন।
সাজানো এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা
- বই সবসময় লম্বালম্বিভাবে সোজা করে সাজিয়ে রাখুন। খুব ভারী বা বড় বই হলে সমতলে শুইয়ে রাখা ভালো, এতে বাঁধাই নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমে।
- নিয়মিত নরম শুকনা সুতি কাপড় বা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে বইয়ের ওপরের অংশ ও মলাট মুছে নিন। এখনকার ধুলোবালি কাগজের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।
- তাক থেকে বই বের করার সময় ওপরের অংশ (Spine) ধরে টান দেবেন না। বরং পাশের দুটি বইকে হালকা ভেতরে ঠেলে দিয়ে মাঝখান থেকে বইটি ধরুন।
প্রাকৃতিক সুরক্ষা ও পোকা দমন
বইয়ের চিরশত্রু হলো রুপালি পোকা বা উইপোকা। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির পাশাপাশি আমাদের লোকজ কিছু পদ্ধতি বেশ কার্যকর। শেলফের কোণায় শুকনো নিম পাতা বা লবঙ্গ রাখলে পোকা দূরে থাকে। আর্দ্রতা শুষে নিতে এবং পোকা তাড়াতে অনেকে শুকনো লাল মরিচ ব্যবহার করেন এবং বর্ষাকালে আর্দ্রতা থেকে বাঁচাতে শেলফের চিপায় সিলিকা জেলের ছোট প্যাকেট রাখতে পারেন।
ব্যক্তিগত সংগ্রহে কী ধরনের বই রাখা উচিত?
নিজের লাইব্রেরি তৈরির সময় কেবল ট্রেন্ড নয়, বরং রুচি ও প্রয়োজনের সমন্বয় করা উচিত। আপনার সংগ্রহে থাকতে পারে:
ধ্রুপদী সাহিত্য (Classics): রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র বা বিশ্বসাহিত্যের কালজয়ী অনুবাদ।রেফারেন্স বুক: একটি ভালো অভিধান, মানচিত্র বা বিশ্বকোষ যা হুটহাট তথ্যের প্রয়োজনে কাজে লাগে।
অনুপ্রেরণামূলক ও আত্মউন্নয়ন: যা কঠিন সময়ে আপনাকে শক্তি দেবে।
শখ ও আগ্রহ: রান্না, ভ্রমণ, ইতিহাস বা বিজ্ঞান – আপনার প্রিয় বিষয়ের সেরা কিছু সংকলন।স্মৃতিজড়ানো বই: প্রিয়জনের উপহার দেওয়া বা শৈশবের সেই বিশেষ বইটি যা আপনাকে অতীতে ফিরিয়ে নেয়।
ছোট কিছু টিপস যা বইকে রাখবে নতুনের মতো
- বইয়ের পাতায় মেটাল ক্লিপ বা স্টিকি নোট ব্যবহার করবেন না; এতে জং বা আঠার দাগ পড়ে। অ্যাসিড-মুক্ত সাধারণ কাগজ বুকমার্ক হিসেবে সেরা।
- বই ভিজে গেলে হেয়ার ড্রায়ার ব্যবহার না করে পাতার মাঝে সাদা টিস্যু দিয়ে ফ্যানের বাতাসে শুকিয়ে নিন।
- আক্রান্ত বইটি দ্রুত অন্য বই থেকে আলাদা করে নরম ব্রাশ দিয়ে পরিষ্কার করুন এবং কড়া রোদ এড়িয়ে হালকা বাতাসে কিছুক্ষণ রাখুন।
- ভিজে গেলে পাতার ভাঁজে ভাঁজে সাদা টিস্যু বা ব্লটিং পেপার দিয়ে ফ্যানের বাতাসে শুকিয়ে নিন; তবে কড়া রোদে বা হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে শুকাবেন না।
বইয়ের যত্ন নেওয়া মানে শুধু তাক সাজিয়ে রাখা নয়, বরং জ্ঞান ও অনুভূতিকে আগলে রাখা। বইমেলা থেকে নতুন বই কেনার উত্তেজনায় যেন পুরনো অমূল্য সংগ্রহগুলো অবহেলিত না হয়। আপনার এই ছোট ছোট সচেতনতাই নিশ্চিত করবে যে, প্রিয় বইগুলো আগামী প্রজন্মের হাতেও নতুনের মতো পৌঁছাবে।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প









































