বুধবার । মার্চ ১১, ২০২৬
ডেভিড হিয়ারস্ট আন্তর্জাতিক ১০ মার্চ ২০২৬, ১১:৩১ অপরাহ্ন
শেয়ার

এনালাইসিস

কেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক দুই ব্যক্তি


Trump Netaniyahu

এই মুহূর্তে তাই ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুই পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক দুই ব্যক্তি

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তিতে আছেন কে—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের এআই প্ল্যাটফর্ম গ্রোক—তা বোঝা কঠিন হয়ে উঠেছে।

মাস্কের এআই প্ল্যাটফর্ম ভুলভাবে দাবি করেছিল, স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে আগুন লাগার একটি ভিডিও নাকি তেল আবিবের একটি ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার ইরানে তেলের আগুনের মতো দেখানো আরেকটি ভিডিওকে ২০১৭ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসের কাছাকাছি একটি অগ্নিকাণ্ডের দৃশ্য বলে বিভ্রান্তি তৈরি করেছিল।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে সামাজিক মাধ্যমে ধারাবাহিক পোস্টে ট্রাম্প একের পর এক ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। কখনো তিনি ইরানে গণঅভ্যুত্থানের আহ্বান জানিয়েছেন, কখনো দেশটির নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি করেছেন। আবার কখনো বলেছেন, ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনে তিনি সরাসরি ভূমিকা রাখবেন। এমনকি তিনি দাবি করেছেন যে ইরানকে ‌পুরোপুরি ধ্বংস করা হচ্ছে এবং হামলার লক্ষ্য তালিকা আরও বাড়ানো হবে।

তবে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য ছিল—ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডকে তিনি ইরানি জনগণের জন্য তাদের দেশ পুনরুদ্ধারের সর্বোত্তম সুযোগ বলে উল্লেখ করেন।

কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। বরং বোমা হামলা চলাকালীন হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে খামেনির জন্য শোক প্রকাশ করে।

আধুনিক ইতিহাসে কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যার ঘটনা খুবই বিরল। এই হত্যাকাণ্ড ট্রাম্প ও পুরো অভিযানের নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী বলে মনে করা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর উদ্দেশ্যের ঠিক উল্টো ফলও বয়ে আনতে পারে।

বরং খামেনির হত্যাকাণ্ড ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে নতুন করে উজ্জীবিত করে এবং ইরানি বিপ্লবকে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে।

ইরানের ‘রেড লাইন’
ইসলামি প্রজাতন্ত্র যখন নিজেকে হুমকির মুখে মনে করে, তখন জাতীয় বিদ্রোহ দমন করতে তারা সক্ষম। তবে খামেনি ছিলেন বাস্তববাদী নেতা। তাঁর শাসনামলে ইরানের শীর্ষ জেনারেল ও পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের ধারাবাহিক হত্যার পরও দেশটি বড় ধরনের প্রতিশোধ নেয়নি। যখন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, তা ছিল হিসাবকৃত ও সীমিত।

খামেনির সময় ইরান দুটি গুরুত্বপূর্ণ সীমা মেনে চলত—গালফের প্রতিবেশী দেশগুলোকে সরাসরি আক্রমণ না করা এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ না করা। যদিও ২০১৯ সালে ইরাক থেকে আসা ড্রোন সৌদি আরবের আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়ে আরামকোর উৎপাদন অর্ধেকে নামিয়ে দেয়, তবুও দায় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছিল। ইয়েমেনের হুথিরা দায় স্বীকার করেছিল।

ইরান তার শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলায়মানীকে মার্কিন ড্রোন হামলায় হত্যার পরও গালফ রাষ্ট্রগুলোকে আক্রমণ করেনি। এমনকি ইসমাইল হানিয়ার হত্যাকাণ্ডের পরও তারা সরাসরি আঘাত করেনি।

খামেনির সময় ইরানের প্রতিক্রিয়া ছিল হিসাবকৃত। সোলাইমানি হত্যার পর ইরান ইরাকে দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তবে আগেই ইরাকি সরকারকে সতর্ক করে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পরও ইরান বা হিজবুল্লাহ সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি।

কিন্তু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনির সময় পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। তখন ইরান ছিল বিপ্লবী ও অনেক বেশি অপ্রত্যাশিত।

১৯৭৯ সালের বিপ্লবের সময় যুক্তরাষ্ট্রের ৫২ জন নাগরিককে ৪৪৪ দিন জিম্মি করে রাখা হয়েছিল, কারণ ওয়াশিংটন ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাহ কে চিকিৎসার জন্য আশ্রয় দিয়েছিল।

নতুন করে জেগে ওঠা বিপ্লবী মনোভাব
খামেনির ইরান ছিল তুলনামূলকভাবে হিসাবি ও স্থিতিশীল। কিন্তু তাঁর মৃত্যু পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিপ্লবী চেতনা হয়তো নতুন করে জেগে উঠছে।

মাত্র দশ দিনের মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস উৎপাদন স্থগিত করেছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে—যা ১৯৭৩ সালের তেল সংকটের চেয়েও বড় বলে দাবি করা হচ্ছে।

এতে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে—যা ১৯৭৮ থেকে ২০২২ সালের সব তেল সরবরাহ বন্ধের মোট পরিমাণের সমান।

এই সংঘাত উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। কাতারের ১.১ বিলিয়ন ডলারের আগাম সতর্কতা রাডার ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা অঞ্চলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানের ড্রোন হামলায় মানামা, কুয়েত সিটি, দুবাই, দোহা ও রিয়াদে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে বিমান চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে গেছে।

এদিকে সংঘাতে ১৪টি দেশ জড়িয়ে পড়েছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশ—যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও নরওয়ের সামরিক ঘাঁটি বা দূতাবাসও হামলার শিকার হয়েছে।

নতুন নেতা, নতুন বার্তা
খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তাঁর ছেলে মোজতরা খামেনিকে বেছে নেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প স্পষ্টভাবে ইরানিদের এই সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

কিন্তু এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তেহরান আসলে ওয়াশিংটনকে বার্তা দিয়েছে—তাদের ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।

৫৬ বছর বয়সী মুজতবা খামেনি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। তিনি আগে পর্দার আড়ালে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন এবং ২০০৯ সালের নির্বাচনের বিতর্কিত ফলাফল ও পরবর্তী দমন-পীড়নের পেছনে তাঁর ভূমিকার অভিযোগও উঠেছিল।

বৈশ্বিক সংকটের ঝুঁকি
খামেনির মৃত্যুর মাত্র দশ দিন পরই ইরান এই যুদ্ধকে শুধু আঞ্চলিক সংকট নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছে। ইয়েমেনের হুথিরা আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে যোগ দেয়নি, তারাও লোহিত সাগরের বাব এল-মান্দেব প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করার ক্ষমতা রাখে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা ইরানের সরকারের প্রতি জনসমর্থনকে উল্টো বাড়িয়ে দিয়েছে। জাতীয়তাবাদ ও ক্ষোভের কারণে অনেক মানুষ সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে।

এমনকি ইরানের অন্যতম প্রভাবশালী দার্শনিক আবদুলকারিম সোরউশ—যিনি আগে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সমালোচক ছিলেন—তিনিও এখন দেশ রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন।

অনিশ্চিত পরিণতি
ট্রাম্প, যিনি নিজের ‘অন্তর্দৃষ্টি’ অনুসরণ করে আলোচনার মাঝেই ইরানে হামলা চালিয়েছেন, প্রতিদিন নতুন নতুন নীতি ঘোষণা করছেন। আগে তিনি স্থলবাহিনী পাঠানোর ধারণা উড়িয়ে দিলেও এখন তা নিয়েও আলোচনা চলছে।

এদিকে ফ্রান্স যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছে, যুক্তরাজ্য বিমানবাহী রণতরী প্রস্তুত করছে। কিন্তু কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা বা লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়নি।

ইরান প্রতিদিনের বোমাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ভেঙে পড়েনি। বরং পাল্টা প্রতিরোধের সক্ষমতা দেখিয়েছে।

এই যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির যে ‘বুদবুদ’ ছিল, তা ভেঙে দিয়েছে এবং পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সামনে তাদের ভঙ্গুরতা প্রকাশ করেছে।

শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের বিজয়ের জন্য ইরানের দ্রুত পতন প্রয়োজন। কিন্তু তেমন কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। বরং দেশটির টিকে থাকার কৌশল কার্যকর বলে মনে হচ্ছে।

এদিকে যুদ্ধ চলতে থাকলে আরও দেশ ধ্বংস হবে, তেলক্ষেত্র পুড়বে, উপসাগরের সম্পদ নষ্ট হবে এবং হাজার হাজার নিরীহ মানুষ প্রাণ হারাবে।

এই অঞ্চলের মানুষ এখন যে মূল্য দিচ্ছে, তা এক ব্যক্তির অহংকার, আরেক ব্যক্তির ধর্মীয়-রাজনৈতিক স্বপ্ন এবং ইউরোপের নিষ্ক্রিয়তার ফল।

এই মুহূর্তে তাই ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুই পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক দুই ব্যক্তি।

ডেভিড হিয়ারস্ট: এডিটর ইন চিফ, মিডল ইস্ট আই।