রবিবার । মার্চ ১৫, ২০২৬
ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক আন্তর্জাতিক ১৫ মার্চ ২০২৬, ১২:৪২ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

এক্সপ্লেইনার

ইসরায়েলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন ট্রাম্প


Trump Netaniyahu

এখন নেতানিয়াহু সেই ট্রাম্পকেই আবার মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সংঘাতে টেনে এনেছেন—যে সংঘাত এড়িয়ে চলার প্রতিশ্রুতি তিনি আগে দিয়েছিলেন

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এমন একটি কাজ করতে সক্ষম হয়েছেন, যা ওয়াশিংটনের অনেকেই একসময় বলেছিলেন আর কখনও ঘটতে দেওয়া হবে না—তিনি আবারও যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে গভীরভাবে টেনে এনেছেন।

এর আগে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরাক আক্রমণ করেছিল, তখন একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেই যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল তথাকথিত ‘নিউ আমেরিকান সেঞ্চুরি’ ধারণায় বিশ্বাসী নব্য-রক্ষণশীলদের আদর্শ থেকে। অল্প সময়ের মধ্যেই মার্কিন বাহিনী সাদ্দাম হোসেনের সরকারকে উৎখাত করে।

কিন্তু সেই প্রাথমিক সাফল্য দ্রুত দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা, বিদ্রোহ এবং অন্তহীন যুদ্ধে রূপ নেয়। যুক্তরাষ্ট্র এতে ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে এবং হাজারো সৈন্য হারায়, একই সঙ্গে বিশ্বের অনেক জায়গায় তাদের বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ক্ষমতায় এসে সেই ভুলের জন্য প্রায়শ্চিত্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন। মার্কিন রাজনৈতিক অভিজাতদের একটি বড় অংশ তখন বিশ্বাস করতে শুরু করে যে ইরাক আক্রমণ ছিল গুরুতর ভুল, যা আর কখনও পুনরাবৃত্তি করা উচিত নয়।

এই উপলব্ধি ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় পরে ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে পৌঁছান। কিন্তু এখন নেতানিয়াহু সেই ট্রাম্পকেই আবার মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সংঘাতে টেনে এনেছেন—যে সংঘাত এড়িয়ে চলার প্রতিশ্রুতি তিনি আগে দিয়েছিলেন।

ইরানের বিরুদ্ধে চাপ
ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই নেতানিয়াহু ধারাবাহিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। নিয়মিত বৈঠক, যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে ইরানে আঘাত হানলে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বদলে যাবে এবং ইসরায়েলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুর্বল হয়ে পড়বে।

এই প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনার, যিনি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের একজন।

শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অনুমোদন দেন এবং দেশটির উচ্চপর্যায়ের নেতাদের লক্ষ্য করে হামলার অভিযান শুরু করেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে না এবং এটি নেতানিয়াহু যে সহজ বিজয়ের কথা বলেছিলেন, তেমন কিছু হওয়ার সম্ভাবনাও কম।

উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি নিরাপত্তা চুক্তির মতো সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তারা মার্কিন অর্থনীতিতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে এবং নিজেদের দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে—বিনিময়ে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা পাওয়ার আশায়।

২০২৫ সালে ট্রাম্পের উপসাগর সফরের সময় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতার মিলিয়ে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ট্রাম্প-সংযুক্ত ক্রিপ্টো উদ্যোগ ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সিয়ালে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের চুক্তির কথাও উঠে এসেছে।

অন্যদিকে ট্রাম্প জামাতা কুশনারের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান উপসাগরীয় সার্বভৌম তহবিল থেকে বিলিয়ন ডলার পরিচালনা করছে, যার মধ্যে সৌদি আরবের ২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগও রয়েছে।

যুদ্ধের ঝুঁকিতে উপসাগরীয় অঞ্চল
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের কৌশল পুরোপুরি গ্রহণ করে ট্রাম্প কার্যত উপসাগরীয় মিত্রদের নিরাপত্তা উদ্বেগ উপেক্ষা করেছেন। ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ শুরু করার আগে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি, যদিও যুদ্ধটি তাদের ভৌগোলিক সীমানার কাছেই হচ্ছে।

কারণ এসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে—যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়ালে স্বাভাবিকভাবেই সেসব দেশও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।

এই পরিস্থিতি নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ব্যবসায়ী খালাফ আল হাবতুর সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্পের সমালোচনা করে বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিবেচনা করা উচিত ছিল।

কুয়েতি বিশ্লেষক মুসায়েদ আল মাঘনাম মন্তব্য করেন, আমরা ভাবতাম আমেরিকানরা আমাদের রক্ষা করছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমরাই তাদের রক্ষা করছি।

যুদ্ধ বিস্তারের আশঙ্কা
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম সৌদি আরবকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যা অঞ্চলে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলি গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল যে সংযুক্ত আরব আমিরাত নাকি ইরানের একটি পানি বিশুদ্ধকরণ স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে—যদিও আবুধাবি দ্রুত এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এ ধরনের খবর উপসাগরীয় অঞ্চলে আশঙ্কা বাড়িয়েছে যে তাদেরকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে ফেলার চেষ্টা হতে পারে, যা ইরান-ইরাক যুদ্ধের মতো বড় আকারের আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য
কিছু বিশ্লেষকের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো দুর্বল বা বিভক্ত হলে ইসরায়েলের আপেক্ষিক শক্তি বাড়ে—এমন ধারণা বহুদিন ধরেই ইসরায়েলি কৌশলগত আলোচনায় রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের কৌশল বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সেই অঞ্চলে নিজের প্রভাব দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করছে—যে অঞ্চল বহু দশক ধরে তার বৈশ্বিক প্রভাবের অন্যতম ভিত্তি।

ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে এখন প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে উঠছে—যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা তাদের সুরক্ষা দেওয়ার কথা ছিল, সেটিই কি এখন তাদের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে?

মিডল ইস্ট আই থেকে অনূদিত