
জাতিসংঘের একটি সংস্থাও সম্প্রতি জানিয়েছে, আসামে বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমরা বর্ণবৈষম্য, জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং ঘৃণাত্মক বক্তব্যের শিকার হচ্ছেন
ভারতের আসাম রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) একদিকে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি, অন্যদিকে কল্যাণমূলক কর্মসূচির সমন্বয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করার কৌশল নিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজ্যের মরিগাঁও জেলার জাগিরোডে অনুষ্ঠিত এক নির্বাচনী সমাবেশে অংশ নিয়ে ৩৮ বছর বয়সী আমইয়া মেধি বলেন, সরকারের বিভিন্ন সুবিধা পাওয়ার কারণে তিনি আবারও বিজেপিকে ভোট দেবেন। সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন দলের কেন্দ্রিয় সভাপতি নিতিন নবীন, যিনি মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা সরকারের বিভিন্ন কল্যাণ প্রকল্পের সাফল্য তুলে ধরেন।
বিজেপির অন্যতম বড় উদ্যোগ ‘অরুণোদয়’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৪০ লাখ নারীকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। মার্চ মাসে প্রত্যেককে ৯,০০০ রুপি করে প্রদান করা হয়, যা রাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নগদ সহায়তা বিতরণ। এছাড়া ‘উদ্যমিতা’ প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে অর্থ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
তবে সমালোচকদের অভিযোগ, এই কল্যাণমূলক কর্মসূচির পাশাপাশি সরকার মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। আসামের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৪ শতাংশ মুসলিম, যাদের বড় অংশই বাংলা ভাষাভাষী।
বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের ‘বিদেশি’ বা বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে আখ্যা দিয়ে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে উচ্ছেদ অভিযান, ডিটেনশন ক্যাম্প এবং ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা অতীতে প্রকাশ্যে বলেছেন যে, তিনি দলের কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন সন্দেহভাজন ভোটারদের তালিকা চ্যালেঞ্জ করতে। এমনকি তিনি দাবি করেছেন, মুসলিমরা আসামের জনসংখ্যার ভারসাম্য পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র করছে—যদিও এ দাবির পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অখিল রঞ্জন দত্ত বলেন, বিজেপি ‘হিন্দুত্ব ও উন্নয়নমূলক বার্তার মিশ্রণ’ ব্যবহার করছে। তার ভাষায়, ‘এটি হিন্দুত্ব ও কল্যাণনীতির এক ধরনের ককটেল, যেখানে একদিকে ধর্মীয় মেরুকরণ, অন্যদিকে আর্থিক সুবিধা দিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে।’
অন্যদিকে, বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারে ইউনিফর্ম সিভিল কোড বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যা সমালোচকদের মতে মুসলিম পারিবারিক আইনকে প্রভাবিত করতে পারে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রে মোদি নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ইতোমধ্যে কয়েকটি রাজ্যে এই আইন চালু করেছে এবং ‘লাভ জিহাদ’ রোধের কথাও বলছে—যা সমালোচকদের মতে প্রমাণহীন একটি ধারণা।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, নির্বাচনের আগে বড় অঙ্কের অর্থ বিতরণ করে ভোটারদের প্রভাবিত করা হচ্ছে। যদিও বিজেপির পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
এদিকে, উচ্ছেদ অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত মুসলিম পরিবারগুলো নিজেদের অস্তিত্ব নিয়েই শঙ্কিত। অনেকেই দাবি করছেন, তাদের পূর্বপুরুষরা বহু প্রজন্ম ধরে ভারতে বসবাস করলেও তাদের ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে উচ্ছেদ করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের একটি সংস্থাও সম্প্রতি জানিয়েছে, আসামে বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমরা বর্ণবৈষম্য, জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং ঘৃণাত্মক বক্তব্যের শিকার হচ্ছেন।
সব মিলিয়ে, আসামের নির্বাচনে বিজেপির এই দ্বিমুখী কৌশল—একদিকে হিন্দুত্ববাদ, অন্যদিকে কল্যাণমূলক অর্থনীতি—রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
আল জাজিরা অবলম্বনে








































