সোমবার । মে ১৮, ২০২৬
প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ১৮ মে ২০২৬, ৬:৩২ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

মধ্যপ্রাচ্য সংকট: আমিরাতে ঝুঁকির মুখে ২০ লাখ বাংলাদেশি


amirat

ফাইল ছবি

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের (জিসিসি) শ্রমবাজারে ব্যাপক ধস ও দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা দেখা দেবে। বিশেষ করে, মার্কিন-ইসরাইল জোটের পক্ষে সংযুক্ত আরব আমিরাত এই যুদ্ধে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ায় দেশটি ইরানের পাল্টা হামলার শিকার হওয়ার প্রবল ঝুঁকিতে রয়েছে। এর ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসকারী প্রায় ২০ লাখ বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীর জীবন ও জীবিকা চরম সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

সম্প্রতি জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই উদ্বেগের কথা জানিয়েছে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)। ‘ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি: বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীদের ওপর প্রভাব ও করণীয়’ শীর্ষক এই সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চলমান সংঘাত উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে মারাত্মক স্থবিরতা তৈরি করেছে। সৌদি আরবের বিখ্যাত ‘ভিশন ২০৩০’ মেগা প্রকল্পসমূহ—যেমন ৫০০ বিলিয়ন ডলারের নিওম সিটি, রেড সি ট্যুরিজম ও কিদ্দিয়া এন্টারটেইনমেন্ট সিটিতে বাংলাদেশের নির্মাণ ও পরিষেবা খাতের লাখ লাখ কর্মীর দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের আশা ছিল। কিন্তু যুদ্ধজনিত কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট, ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা অবকাঠামোগত ক্ষতি হলে এই বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

রামরুর প্রতিবেদনে প্রবাসীদের বর্তমান দুর্দশা তুলে ধরে বলা হয়, দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের ধারাবাহিক হামলায় বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন। নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়ার সুযোগ না থাকায় তারা নিরাপদ আশ্রয়েও যেতে পারছেন না।

এ ছাড়া অর্থনৈতিক মন্দার কারণে স্থানীয়রা খরচ কমিয়ে দেওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের লজিস্টিকস ও পরিষেবা খাতে কর্মীসংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। যারা কর্মরত আছেন, তারাও ব্যাপক মজুরি কর্তনের শিকার হচ্ছেন। নিয়োগকর্তাদের আয় কমে যাওয়ায় প্রতি মাসে বেতন দিতে ৪-৫ দিন বিলম্ব হচ্ছে, নিয়মিত কাজের শিফট কমে গেছে এবং ওভারটাইমও সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলমান যুদ্ধে এ পর্যন্ত ১১ জন বাংলাদেশি কর্মী মারা গেছেন, তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, জিসিসিভুক্ত কোনো দেশের সরকার এখন পর্যন্ত নিহত বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেনি। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে এটি সমাধান না হলে আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশকে দাবি তুলতে হবে।

এদিকে বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ার সুযোগে টিকিটের দাম অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে এয়ারলাইন্সগুলো। ফলে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরতে কর্মীরা হিমশিম খাচ্ছেন। এমনকি ঢাকা বিমানবন্দরের দৈনিক যাত্রীদের প্রায় ৪০ শতাংশই ফ্লাইট বাতিলের খবর না জেনে এসে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। নতুন করে ভিসা আটকে থাকায় প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার কর্মী পরিবারসহ তীব্র আর্থিক অনটনে দিন কাটাচ্ছেন।

সংবাদ সম্মেলনে সরকারের সংকট মোকাবিলা পদ্ধতির সমালোচনা করে বলা হয়, সংঘাতের কারণে চাকরি হারানো বা জোরপূর্বক ফেরত আসা প্রবাসীদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ‘সংকট-প্রতিক্রিয়া তহবিল’ নেই। এমনকি প্রত্যাবর্তনের প্রবাহ পর্যবেক্ষণের জন্য কোনো রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ড বা সুনির্দিষ্ট পুনর্বাসন মডিউলও তৈরি করা হয়নি। ফ্লাইটের টিকিট কেনার পূর্বশর্তের কারণে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ঋণ বিতরণও কার্যত বন্ধ রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে কর্মীদের সুরক্ষায় রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার ড. তাসনিম সিদ্দিকী বেশ কিছু জরুরি সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে প্রধান সুপারিশগুলো হলো:

১) বিশেষ সংকট সেল: জিসিসিভুক্ত প্রতিটি দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের অধীনে বিশেষ অভিবাসী সংকট মোকাবেলা সেল এবং সার্বক্ষণিক বাংলা ভাষার হটলাইন চালু করা।

২) জরুরি তহবিল ও ঋণ: সরকারের রাজস্ব বাজেট থেকে জরুরি তহবিল বরাদ্দ করা এবং ফ্লাইটের টিকিট ছাড়াই প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক (পিকেবি) থেকে প্রবাসীদের অস্থায়ী ঋণ দেওয়া।

৩) জাতীয় পুনর্বাসন নীতি: ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরত আসা বাংলাদেশিদের পুনর্বাসনে কাউন্সেলিং ও দক্ষতার সনদ প্রদানের ব্যবস্থা করা।

৪) নারীদের বিশেষ সহায়তা: নারী কর্মী, বিশেষ করে গৃহকর্মীদের বকেয়া বেতন আদায়, আইনি ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার জন্য সহজ ভাষায় বিশেষ গাইডলাইন তৈরি করা।

৫) নতুন বাজার অনুসন্ধান: যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক শ্রমবাজার বদলে দিতে পারে, তাই এখন থেকেই নতুন শ্রমবাজার খোঁজা এবং কর্মীদের ভাষা ও কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া।