
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতা উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
নতুন সরকার এমন সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে যখন বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মেরুকরণ নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এবারের বাজেটে স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং ন্যায্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল তিনটায় জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতা উপস্থাপনকালে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের এটি প্রথম বাজেট। একই সঙ্গে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরুর মাহমুদ চৌধুরীরও প্রথম বাজেট এটি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিএনপি বরাবরই জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে।
তিনি বলেন, ২০১৬ সালের ভিশন-২০৩০, ২০২২ সালের রাষ্ট্র মেরামতের ২৭ দফা এবং ২০২৩ সালের যুগপৎ আন্দোলনের ৩১ দফার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনই ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ভিত্তি তৈরি করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের ঘোষণা ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থপাচারের মাধ্যমে অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে এবং তথাকথিত উন্নয়নের আড়ালে অর্থনৈতিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে দেশকে পুনরুদ্ধার করে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব বর্তমান সরকার গ্রহণ করেছে।
আমির খসরু বলেন, জাতীয় বাজেটকে কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা ও দেশের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার একটি রোডম্যাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা।
আশাবাদ ব্যক্ত করে আমির খসরু বলেন, সরকারের পরিকল্পনা ও কৌশল বাস্তবায়িত হলে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। একই সঙ্গে জনমিতিক লভ্যাংশ, দীর্ঘায়ু লভ্যাংশ এবং গণতান্ত্রিক লভ্যাংশ অর্জনের সুযোগও তৈরি হবে।
আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন।
বাজেটে সরকার ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে। এগুলো হলো— সবার জন্য উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানভিত্তিক অর্থনীতি, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশ, পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এছাড়া সৃজনশীল অর্থনীতি, ক্রীড়া অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি এবং সুনীল অর্থনীতিকে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় আনার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
আমির খসরু বলেন, বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে ‘ভ্যালু ফর মানি’, বিনিয়োগের বিপরীতে সুফল, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত ভারসাম্য—এই চারটি নীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, সরকার ইতোমধ্যে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে একটি প্রতিযোগিতামূলক, উৎপাদনশীল, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। প্রস্তাবিত বাজেট সেই উদ্যোগেরই প্রতিফলন।
আশা প্রকাশ করে আমির খসরু বলেন, এই বাজেট উন্নয়নকে বৈষম্যহীন, কর্মসংস্থানকে নিরাপদ, রাষ্ট্রকে আরও জবাবদিহিমূলক এবং নাগরিক অংশগ্রহণকে আরও শক্তিশালী করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
এর আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সংসদ ভবনে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। জাতীয় সংসদ ভবনের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশেষ বৈঠকে বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়।












































