cosmetics-ad

হালাল কসমেটিকসের বাজারে জায়ান্টদের চোখ

base_1482752005-global-cosmetics-news

গত শরতের কথা। জার্মান কেমিক্যাল জায়ান্ট বিএএসএফের কারখানায় গিয়েছিলেন আবদুল্লাহ হিতো। ডুসেলডর্ফে কয়েক মাইল বিস্তৃত এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অনেকগুলো কেমিক্যাল প্লান্ট পরিদর্শন করেন তিনি। প্রডাকশন লাইন পরিদর্শনের পাশাপাশি তিনি ম্যানেজারদের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাবান, শ্যাম্পু, কন্ডিশনারসহ নানা সামগ্রীর উপকরণ সম্পর্কে এ সময় তিনি ম্যানেজারদের প্রশ্ন করেন।

না, আবদুল্লাহ হিতো কোনো প্রকৌশলী নন। স্বাস্থ্য বিভাগের পরিদর্শকও নন তিনি। কুয়েত ইউনিভার্সিটিতে তিনি ইসলামিক স্টাডিজে পিএইচডি করেছেন। জার্মান কেমিক্যাল জায়ান্টের ব্যবহূত উপকরণগুলো মুসলমানদের ব্যবহারোপযোগী ও হালাল কিনা, তা যাচাই করতে গিয়েছিলেন তিনি।

আবদুল্লাহ হিতো বলেন, ‘প্রথম ধাপ থেকে সবকিছু আমরা নিয়ন্ত্রণ করি; কাঁচামাল কেনা থেকে পণ্য প্রস্তুত হওয়া পর্যন্ত সবকিছু। ম্যানুফ্যাকচারাররা আমাদের না জানিয়ে কাঁচামাল পাল্টাতে অথবা নতুন কোনো সরবরাহকারীর সঙ্গে চুক্তি করতে পারেন না।’

আবদুল্লাহ হিতোর কোম্পানির নাম হালাল কোয়ালিটি কন্ট্রোল। ইউরোপে এ রকম আরো কয়েক ডজন কোম্পানি রয়েছে, যারা পণ্যের হালাল সনদ ইস্যু করে থাকে। হালাল মানে হলো, পণ্যে কোনো অ্যালকোহল অথবা প্রাণিজ সংযোজন থাকতে পারবে না। উত্পাদন পর্বেও এমন কোনো উপাদানের সংস্পর্শে আসা যাবে না, যা শরিয়া আইনে বৈধ নয়।

প্রসাধনী সামগ্রী উপকরণের জন্য চার বছর আগে প্রথম হালাল সনদ পেয়েছে বিএএসএফ। জার্মান প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ১৪৫টি হালাল রাসায়নিক উপকরণ প্রস্তুত করে থাকে। ফেসিয়াল ক্লিনজার, বাবল বাথ, ডিটারজেন্টসহ বিভিন্ন সামগ্রী প্রস্তুতে এসব উপকরণ ব্যবহূত হয়। হালাল কেমিক্যাল উপকরণ বিক্রিতে বিএএসএফের সবচেয়ে বড় বাজার ইন্দোনেশিয়া ও অন্যান্য মুসলিম দেশ। পাশ্চাত্য দেশগুলোতেও এসব উপকরণের চাহিদা বাড়ছে বলে বিএএসএফ জানিয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ সমমনা রাজনীতিকরা পশ্চিমের দেশগুলোয় মুসলিম অভিবাসন বন্ধের হুমকি দিচ্ছেন। কিন্তু কেমিক্যাল কোম্পানি বিএএসএফ থেকে স্যান্ডউইচ প্রস্তুতকারক সাবওয়ে অথবা ফ্যাশন হাউজ ডিকেএনওয়াই— সবাই মুখিয়ে আছে মুসলিম ভোক্তাদের বর্ধিষ্ণু বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে।

বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ অর্থাত্ ১৬০ কোটি হচ্ছে ইসলাম ধর্মাবলম্বী। পিউ রিসার্চ সেন্টারের মতে, চলতি শতকের শেষে মুসলিম জনগোষ্ঠী সংখ্যায় খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীকে ছাড়িয়ে যাবে।

গবেষণা সংস্থা টেকনাভিওর হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর হালাল কসমেটিকসের জন্য ভোক্তারা ২ হাজার ৭০০ কোটি ডলার ব্যয় করবেন। ২০১৯ সাল নাগাদ হালাল কসমেটিকসের বাজার হবে ৩ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মুসলিম মার্কেটিংয়ের এমডি শফিক শাফি বলেন, হালাল পণ্যসামগ্রীর বাজার আরো বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

হালাল কসমেটিকস
হালাল কসমেটিকস

হালাল মানে শুধু যথাযথভাবে জবাই করা প্রাণীর মাংস নয়। হালাল ফই গ্রা, হালাল পানীয়, হালাল পর্যটনসহ অনেক সামগ্রী এরই মধ্যে বাজারে এসেছে। ব্রিটিশ রিটেইলার জন লিউয়িস একটি স্কুল ইউনিফর্ম লাইন বাজারে এনেছে, যাতে হিজাবও অন্তর্ভুক্ত থাকছে। ডিজাইনার হানা তাজিমার নকশায় ছাপা ও রঙিন হিজাব লাইন বিক্রি করছে পোশাক চেইন ইউনিক্ল।

ফরাসি প্রতিষ্ঠান গ্রুপে বাতাঁ গত বছর কুইক হ্যামবার্গার চেইন কিনে নেয়। কুইক হ্যামবার্গারের ৫০০ আউটলেট ছিল। সিংহভাগ আউটলেটকে বার্গার কিংয়ে রূপান্তর করলেও ৫০টি আউটলেটে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। ফ্রান্সের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় এসব আউটলেট এখনো কুইক ব্র্যান্ডের আওতায় হালাল খাবার বিক্রি করছে।

কিছু কোম্পানি হালাল পণ্য বিক্রি করলেও নিজেদের সেভাবে পরিচিত করতে ভয় পায়। অমুসলিম জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ থেকে বাঁচতে কোম্পানিগুলো এ পন্থা অবলম্বন করে। ইসলামিক ব্র্যান্ডিং এজেন্সি অগলিভি নুরের ভাইস প্রেসিডেন্ট সেলিনা জানমোহাম্মাদ এ কথা জানিয়েছেন। শতাব্দীর সন্ধিক্ষণের মুসলিম প্রজন্মকে নিয়ে জেনারেশন এম শিরোনামে একটি বই লিখেছেন তিনি।

সেলিনা জানমোহাম্মাদ বলেন, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এ কথা প্রচার করা কষ্টকর হয়ে পড়ে যে, তারা মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাঙ্ক্ষিত পণ্য ও সেবা বিক্রি করছেন।

বুরকিনি বিক্রি করায় ব্রিটিশ রিটেইলার মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সারকে অনেকের তোপের মুখে পড়তে হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ভিত্তিক কোম্পানি মায়া কসমেটিকস এক ধরনের নেইল পলিশ বিক্রি করে, যার ভেতরে তরল পদার্থ প্রবাহিত হতে পারে। নেইল পলিশের ভেতরে পানি প্রবাহিত করতে পারা মুসলিম ভোক্তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ওজুর সময় হাত-পায়ে পানিপ্রবাহ প্রতিরোধী কোনো আবরণ রাখা যায় না।

ভোক্তাদের মুখে মুখে, বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও ফেসবুকে প্রচারণার মাধ্যমে ব্রিটেন ও মধ্যপ্রাচ্যে মায়া কসমেটিকসের বিক্রি বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্রে সেভাবে বাড়েনি। কোম্পানির সহপ্রতিষ্ঠাতা জাভেদ ইউনিস এ কথা জানিয়ে বলেন, গড়পড়তা মার্কিন নাগরিক হালাল শুনলেই এক ধরনের আড়ষ্টতা বোধ করে।

২০১৯ সাল থেকে ইন্দোনেশিয়ায় বিক্রীত সব খাবার, পানীয় ও অন্যান্য ভোক্তাসামগ্রী হালাল সনদপ্রাপ্ত হতে হবে। ফরাসি কোম্পানি লরিয়েল জানিয়েছে, ইন্দোনেশিয়ায় প্রস্তুতকৃত গার্নিয়ার ব্র্যান্ডের সব পণ্য এরই মধ্যে হালাল মানোত্তীর্ণ হয়েছে।

ব্রিটেনে মেকআপ ফাউন্ডেশনের নতুন একটি লাইন বাজারজাত করছে লরিয়েল। ট্রু ম্যাচ নামে এসব ফাউন্ডেশনের প্রচারণায় মুসলিম মডেল নিয়োগ করছে লরিয়েল। ট্রু ম্যাচের ২৩টি শেডের প্রতিটির বিজ্ঞাপনেই একেকজন স্বতন্ত্র মডেল হাজির হয়েছেন। ৪ নম্বর কালার ন্যাচারাল গোল্ড। এ কালারটির ফেস নিযুক্ত হয়েছেন মাথায় ওড়না পরিহিত মডেল আমেনা।

ব্রিটিশ মেকআপ আর্টিস্ট জুুকারাত নাজার মনে করেন, বিষয়টি মুসলিম নারীর জন্য গুরুত্ববহ। জুকারাত নাজার খ্লো কারদেশিয়ানসহ অনেক সেলিব্রিটির সঙ্গে কাজ করেছেন। ইউটিউবে তার আড়াই লাখের বেশি ফলোয়ার রয়েছেন।

অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে অনুষ্ঠিত মুসলিম লাইফস্টাইল এক্সপোয় ১২০টির বেশি প্রতিষ্ঠান যোগ দেয়। নেইল পলিশ প্রস্তুতকারক মায়ার পাশাপাশি কসমেটিকসের প্রায় অর্ধডজন কোম্পানি এ প্রদর্শনীতে যোগ দেয়। ওয়াল মার্টের ব্রিটিশ ইউনিট আসডার প্রতিনিধিরা এখানেই মায়া কসমেটিকসের জাভেদ ইউনিসের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। আগামী রমজানের আগেই ব্রিটেনে ওয়াল মার্ট স্টোরগুলোয় মায়া কসমেটিকসের পণ্য পাওয়া যাবে। সূত্র: ব্লুমবার্গ