শুক্রবার । জানুয়ারি ১৬, ২০২৬
মাহমুদ নেওয়াজ জয় ফিচার ৪ জানুয়ারি ২০২৬, ৭:৩২ অপরাহ্ন
শেয়ার

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বেঁচে থাকলে এই সময়ে যা লিখতেন


আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে আমরা সাধারণত স্মরণ করি তাঁর নির্মোহ, তীক্ষ্ণ, প্রায় নিষ্ঠুর বাস্তববোধের জন্য। তিনি গল্প বা উপন্যাসে কখনোই নায়ক বানাতে চাননি কাউকে; বরং সমাজের ফাঁকফোকর, ভাঙন, শ্রেণি-সংঘাত আর মানুষের ভেতরের ভয়–লোভ–কাপুরুষতাকে তিনি আলোয় এনে দাঁড় করিয়েছেন। আজ যদি ইলিয়াস বেঁচে থাকতেন—এই প্রশ্ন আসলে তাঁর সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি আজকের বাংলাদেশ ও বিশ্ববাস্তবতায় কীভাবে কাজ করত, সেটাই জানতে চাওয়া।

প্রথমেই বলা দরকার, ইলিয়াস আজ বেঁচে থাকলে তিনি ফেসবুক-টুইটার নিয়ে গল্প লিখতেন—এটা খুব সরলীকরণ হয়ে যায়। তিনি কখনোই প্রযুক্তিকে বিষয় বানাতেন না সরাসরি। প্রযুক্তি তাঁর লেখায় আসত ক্ষমতার নতুন হাতিয়ার হিসেবে। আজকের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর আড়ালে যে নজরদারি, আত্মনিয়ন্ত্রণ, স্বেচ্ছা-নীরবতা আর ভয় কাজ করে—সেগুলোই তাঁর গল্পের মূল সুর হতো।

ইলিয়াস হয়তো লিখতেন ভয়ের রাজনীতি নিয়ে। খোলা চোখে সেন্সরশিপ না থাকলেও কীভাবে মানুষ নিজেই নিজেকে সেন্সর করে—কথা বলার আগে ভাবে, লিখবার আগে থামে, প্রতিবাদ করার আগে হিসাব কষে—এই মানসিক গলিপথগুলো তাঁর জন্য হতো উর্বর জমি। “খোয়াবনামা”-র গ্রামের মানুষ যেমন ইতিহাসের চাপে পিষ্ট, আজকের শহুরে মধ্যবিত্ত তেমনি অদৃশ্য চাপে নুয়ে পড়া। পার্থক্য শুধু—এখন শাসক অনেক বেশি নিঃশব্দ।

Illias inner 2

ইলিয়াস হয়তো লিখতেন একজন সাংবাদিককে নিয়ে—যিনি জানেন কী ঘটছে, কিন্তু সবসময় হয়তো সব লিখতে পারেন না। প্রতিদিন খবরের ঘরে ঢুকে নিজের নীরবতাকে যুক্তি দিয়ে ঢেকে রাখেন: ‘এটা লিখলে চাকরি যাবে’, ‘এটা লিখলে পরিবার বিপদে পড়বে’। এই নীরবতা একসময় তার চরিত্র হয়ে যায়। ইলিয়াসের গল্পে এই মানুষটি নায়ক হতেন না, আবার সরাসরি খলনায়কও না। তিনি হতেন আমাদেরই একজন।

ইলিয়াস আজ লিখতেন এনজিও, উন্নয়ন আর ক্ষমতার ভাষা নিয়ে। উন্নয়নের পোস্টার, স্লোগান, প্রেজেন্টেশনের আড়ালে যে বাস্তব মানুষগুলো হারিয়ে যায়—সেই মানুষদের তিনি তুলে আনতেন। গ্রামের রাস্তা পাকা হয়েছে, কিন্তু সেই রাস্তা কার জন্য? স্কুল হয়েছে, কিন্তু শিক্ষক নেই। হাসপাতাল আছে, কিন্তু ডাক্তার নেই। এই ফাঁকগুলোই ইলিয়াসের গল্পে কথা বলত।

আজকের বাংলাদেশে ধর্ম ইলিয়াসের লেখায় খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিত—কিন্তু প্রচলিত অর্থে ‘ধর্মীয়’ গল্প হিসেবে নয়। বরং ধর্ম কীভাবে রাজনৈতিক অস্ত্র হয়, কীভাবে ব্যক্তিগত বিশ্বাস ক্ষমতার ভাষায় রূপ নেয়, কীভাবে ভয় ও পবিত্রতার মিশ্রণে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়—এই প্রশ্নগুলো তিনি তুলতেন। তাঁর ভাষা হতো ঠান্ডা, প্রায় রিপোর্টের মতো, কিন্তু ভেতরে জমে থাকত বিস্ফোরক বারুদ।

ইলিয়াস আজ বেঁচে থাকলে নারীর অভিজ্ঞতা নিয়ে আরও কঠিনভাবে লিখতেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় নারীর দৃশ্যমানতা বেড়েছে, কিন্তু নিরাপত্তা কি বেড়েছে? স্বাধীনতার ভাষা আর বাস্তব জীবনের শাস্তির মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব তাঁর গল্পে ধরা পড়ত। হয়তো তিনি লিখতেন এমন এক নারীকে নিয়ে, যিনি অনলাইনে সাহসী, কিন্তু অফলাইনে প্রতিদিন আপস করেন—নিজের শরীর, ভাষা, পোশাক নিয়ে।

Illias inner 1

তিনি আজ লিখতেন স্মৃতি ও বিস্মৃতি নিয়ে। রাষ্ট্র কী মনে রাখতে দেয়, আর কী ভুলিয়ে দিতে চায়—এই রাজনীতি ইলিয়াসের খুব প্রিয় বিষয় হতো। মুক্তিযুদ্ধ তাঁর লেখায় আবার আসত, কিন্তু উৎসবের ভাষায় নয়। আসত প্রশ্ন হয়ে—এই ইতিহাস কার? কে এর মালিক? কে এর সুবিধাভোগী? “খোয়াবনামা”-র মতোই ইতিহাস এখানে হতো বিভক্ত, অসম্পূর্ণ, সন্দেহে ভরা।

আজকের ইলিয়াস হয়তো লিখতেন প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে—যারা ডলার পাঠান, কিন্তু নিজেরা দেশে ফিরতে ভয় পান। অথবা যারা ফিরে এসে বুঝতে পারেন, দেশ আর তাদের নয়। এই বিচ্ছিন্নতা, এই অচেনা হয়ে যাওয়া—ইলিয়াসের গল্পে গভীর বেদনার জায়গা পেত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা—ইলিয়াস আজ বেঁচে থাকলে তিনি আমাদের মন রক্ষা করে লিখতেন না। তিনি জনপ্রিয় হওয়ার চেষ্টা করতেন না, ভাইরাল হওয়ার চিন্তা করতেন না। তিনি লিখতেন অস্বস্তিকর সত্য। যে সত্য পড়ে পাঠক নিজেকে প্রশ্ন করে—আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? আমি কী করছি, বা কী করছি না?

আজকের সময়েও ইলিয়াসের লেখা হতো ধীর, ভারী, মনোযোগ দাবি করা। তিনি হয়তো বছরে একটি গল্প লিখতেন, কিন্তু সেই গল্প নিয়ে কথা হতো বছরের পর বছর। কারণ ইলিয়াস কখনোই মুহূর্তের উত্তেজনা ধরতে চাননি; তিনি ধরতে চেয়েছেন কাঠামো—যে কাঠামোর ভেতরে মানুষ আটকে যায়।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আজ বেঁচে থাকলে তিনি আমাদের আয়না ধরিয়ে দিতেন—ফিল্টারহীন, নির্মম আয়না। আমরা হয়তো সেই আয়নায় তাকাতে চাইতাম না। কিন্তু ইলিয়াসের কাজ ছিল তাক করানো। তিনি আজও বেঁচে থাকলে, আমাদের সবচেয়ে বড় অস্বস্তির নামই হতেন—আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।