
ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বিস্তার ঘটায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ইরানের পাল্টা হামলার পর উদ্ভূত এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে। এর ফলে বাংলাদেশের জ্বালানি, কৃষি ও বাণিজ্য খাতে বড় ধরনের বহুমুখী সংকটের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে কেবল তেল সংকট নয়, বরং খাদ্য উৎপাদন, রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্সের ওপরও প্রচণ্ড চাপ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান অবশ্য জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৩৬ হাজার টন জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিকল্প বাজার খোঁজা হচ্ছে। ইতিমধ্যে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে ৭টি জাহাজের এলসি সম্পন্ন হয়েছে।
বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ আসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে, যার পরিবহনপথ এই হরমুজ প্রণালি। সৌদি আরবের বৃহত্তম তেল টার্মিনাল রাস তানুরাতে ড্রোন হামলার পর সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে দেশে ডিজেলের যে মজুত আছে, তা দিয়ে মাত্র ১৪ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব। সামনে বোরো মৌসুমে সেচের জন্য ডিজেলের ব্যাপক চাহিদা বাড়বে, এমন সময় সরবরাহ বিঘ্নিত হলে কৃষি উৎপাদনে বড় ধাক্কা লাগার আশঙ্কা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার পর ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলার ছাড়িয়েছে। এতে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জ্বালানি বিল বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বার্থ ও টার্মিনাল অপারেটরদের সংগঠন ‘বোটসোয়া’র সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী জানান, জ্বালানির দাম বাড়লে অপারেশনাল ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে, যা সামাল দিতে সরকারের বড় অঙ্কের ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে।
জ্বালানির পাশাপাশি এলএনজি ও বিদ্যুৎ খাতেও শঙ্কা বাড়ছে। কাতার ও ওমান থেকে আসা এলএনজি কার্গো যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিলম্বিত হলে দেশে লোডশেডিং বাড়তে পারে। এছাড়া লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালি অনিরাপদ হওয়ায় জাহাজগুলো এখন আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ ঘুরে চলাচল করছে। এতে যাতায়াত সময় ১০ থেকে ১৫ দিন বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি কন্টেইনার প্রতি কয়েক হাজার ডলার বাড়তি ‘ওয়ার রিস্ক সারচার্জ’ গুনতে হচ্ছে।
এই অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের রপ্তানি ও রেমিট্যান্স খাতেও। তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাড়তি শিপিং খরচ বিদেশি ক্রেতাদের ওপর চাপানো সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রায় ৭০ লাখ বাংলাদেশির কর্মসংস্থান ও আয়ও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সরকার বলছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় মজুত নিশ্চিতের চেষ্টা চলছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বল্পমেয়াদি মজুত দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলা করা কঠিন। তাই বিকল্প জ্বালানি উৎস, সরবরাহ বৈচিত্র্য এবং কৌশলগত মজুত বাড়ানোর মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।







































