বৃহস্পতিবার । এপ্রিল ৩০, ২০২৬
ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক আন্তর্জাতিক ১ মার্চ ২০২৬, ১০:৩৫ অপরাহ্ন
শেয়ার

হরমুজ প্রণালি কি? বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ


Harmuz

সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে এর প্রস্থ মাত্র প্রায় ৩৩ কিলোমিটার এবং জাহাজ চলাচলের পথ দুই দিকে প্রায় ৩ কিলোমিটার করে

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। এর জবাবে ইরান ইসরায়েলসহ কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান, সৌদি আরব, ইরাক ও ওমানে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রণালিটি বন্ধ হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা লাগতে পারে।

হরমুজ প্রণালি কোথায়
হরমুজ প্রণালি ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক পাশে এবং ইরানের অন্য পাশে অবস্থিত একটি সংকীর্ণ জলপথ, যা পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে এর প্রস্থ মাত্র প্রায় ৩৩ কিলোমিটার এবং জাহাজ চলাচলের পথ দুই দিকে প্রায় ৩ কিলোমিটার করে। সংকীর্ণ হওয়ায় এটি সামরিক হামলা বা অবরোধের ঝুঁকিতে থাকে।

মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহের জন্য এই পথের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

harmuz 2

জাহাজ চলাচলে শঙ্কা
ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক কর্মকর্তা জানান, প্রণালি অতিক্রমকারী জাহাজগুলো ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কাছ থেকে উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির বার্তা পাচ্ছে, যেখানে বলা হচ্ছে—‘কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেতে পারবে না।’

তবে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করেনি। তা সত্ত্বেও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বিভিন্ন কোম্পানি অনেক তেলবাহী জাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে।

জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৫০টি তেল ও তরলীকৃত গ্যাসবাহী জাহাজ প্রণালির বাইরে উপসাগরীয় জলসীমায় নোঙর করে অপেক্ষা করছে।

কত তেল ও গ্যাস যায় এই প্রণালি দিয়ে
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের হিসাবে, ২০২৪ সালে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ। বিশ্বের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশও এই পথ দিয়ে হয়, যার বড় অংশ আসে কাতার থেকে।

ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়।

প্রধান ক্রেতারা কারা
এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত তেল ও গ্যাসের বেশিরভাগই এশিয়ার বাজারে যায়। হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৮৪ শতাংশ তেল এবং ৮৩ শতাংশ এলএনজি এশিয়ায় রপ্তানি হয়।

মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৬৯ শতাংশ যায় চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায়। ফলে তেলের দাম বাড়লে এসব দেশের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়তে পারে।

তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, প্রণালি বন্ধ হলে বিশ্ববাজারে লেনদেন হওয়া তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ রাতারাতি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বন্ধ হওয়ার আশঙ্কাই তেলের দাম দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে। ইতোমধ্যে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে গেছে এবং অনেক জাহাজ অপেক্ষমাণ রয়েছে।

ওমান উপকূলে একটি তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনাও সংঘাতের বিস্তার এবং জ্বালানি অবকাঠামোর ঝুঁকি বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব
হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন ঘটলে শুধু তেলের দাম নয়, বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেলের দাম যদি ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে দীর্ঘ সময় স্থির থাকে, তাহলে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ০.৬ থেকে ০.৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

এতে জ্বালানি ও উৎপাদন খরচ বাড়বে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলো মন্দার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।

আল জাজিরা অবলম্বনে